আজকের সাহিত্যের পরিধি [ The scope of today’s literature ] – আহমদ শরীফ [Ahmed Sharif ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

আজকের সাহিত্যের পরিধি [ The scope of today’s literature ] – আহমদ শরীফ [Ahmed Sharif ] : সাহিত্য হচ্ছে জীবন ও জীবন-ভাবনার প্রতিরূপ বা প্রতিচ্ছবি, তবু তা’ স্থূল জীবনালেখ্য নয় জীবনের উদ্ভাস। কেননা, দৃশ্যমান জীবন আচরণে-বিচরণে সীমিত। তাতে সমাজ-সদস্য মানুষরূপে কিংবা সমাজ-নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাকে পূর্ণ অবয়বে দেখা যায় না। বহু যুগসঞ্চিত ও কালান্তরে বিবর্তিত ও রূপান্তরিত বিশ্বাস-সংস্কার, নিয়ম-রীতি-নীতি, রেওয়াজ-প্রথা-পদ্ধতি ও বৃত্তি প্রবৃত্তি দিয়ে নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত জীবনের বক্র-বিচিত্র, জটা-জটিল ও বিকার-বিকৃত বিকাশ ও প্রকাশ শাদাচোখে সাধারণে অনুধাবন করতে পারে না।

 

আজকের সাহিত্যের পরিধি - আহমদ শরীফ
আজকের সাহিত্যের পরিধি – আহমদ শরীফ

 

জীবনের ঐ বক্র-বিচিত্র বিকার-বিকাশও কারণ ক্রিয়া নিরূপণ-বিশ্লেষণ মাধ্যমে চিত্রিত করার দায়িত্ব পালন করেন জীবন-শিল্পী। জগৎ চেতনার প্রতিবেশে যে-জীবন ভাবনা চিত্রলোকে মুকুলিত ও কর্মপ্রয়াসে পুষ্পিত এবং সাফল্যে কিংবা নিষ্ফলতায় অবসিত, সে-জীবনের ইতিকথা আনন্দ-যন্ত্রণার নিরিখে যাচাই করতে হয় কালগত ও স্থানগত আপেক্ষিক তাৎপর্যে।

আদিকালের মানুষের জীবন ছিল দৈবনির্ভর। তখন আসমানী দেবতা তার দেহ মন, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তখন রিজিকের মালিক ছিলেন রাজ্জাক, প্রতিষেধকবিহীন রোগের নিরাময় ছিল দৈব-কৃপানির্ভর, রোদ-বৃষ্টি ছিল দেব দয়ার দান। ফলে জীবনে সমস্যা-শঙ্কা-ত্রাস ছিল বটে, কিন্তু কোনোটারই প্রতিকার কিংবা সমাধানের উপায় ছিল না আয়ত্তে। দারুণ দেবতাকে করুণ করার, বিরূপ বিরক্ত দেবতাকে অনুরক্ত করার, অরি দেবতাকে মিত্র করার উপায় উদ্ভাবনে ও সাধনায় নিরত থাকত তখনকার অসহায় ভীত মানুষ। পূজা-শিন্নি, তুক-তাক, মন্ত্র-তন্ত্র সে-প্রয়াসের প্রসূন।

নিয়তির শিকার মানুষের হাতে তখনো একটা গুরু দায়িত্ব ছিল। তা হচ্ছে যৌথ জীবনে পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে সমস্বার্থে সহযোগিতা ও সহাবস্থানের অঙ্গীকারে গোত্রীয় সংহতি রক্ষার দায়িত্ব। তারই জন্য জরুরি ছিল ন্যায়-নীতি, পাপ পুণ্য, ঘৃণা-লজ্জা-ভয়, প্রীতি-মৈত্রী-করুণা, মান-যশ-খ্যাতি প্রভৃতির প্ররোচনায় ও প্রেরণায় নিয়মনিষ্ঠ সংযত জীবনধারণের পরিণাম-মাধুর্যে আসক্তি দান। তাই আমরা প্রাচীন সাহিত্যে সম্বৃত্ত-সদাচারী ও দুর্বৃত্ত-দুরাচারী মানুষের পরিণাম-চিত্রই কেবল পাই। সেখানে মানুষ হয় অতি ভালো অথবা অতি মন্দ।

 

আজকের সাহিত্যের পরিধি - আহমদ শরীফ
আজকের সাহিত্যের পরিধি – আহমদ শরীফ

 

সেখানে মানুষ ও মানবিক অনুভূতি গৌণ, মুখ্য হচ্ছে নীতিনিষ্ঠা ও নীতিহীনতার পরিণাম প্রদর্শন। জীবন-যে স্থান-কাল ও প্রতিবেশ-প্রয়োজনগত, মানুষ যে শুধু ভালো কিংবা কেবল মন্দ নয়, কখনো ভালো কখনো মন্দ, কারো কাছে ভালো কারো কাছে মন্দ, কারো প্রতি দারুণ আর কারো প্রতি করুণ এবং সবটাই যে আপেক্ষিক তা ইদানীং-পূর্বকালে কখনো কোথাও কারো কাছে ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি পায়নি। ফলে হাজার হাজার বছর ধরে লক্ষ কোটি মানুষ শাস্ত্র সমাজ-সরকারের নিয়ম-নীতি-ন্যায়ের খড়গে বলি হয়েছে। “To know all is to pardon all” তত্ত্বটি তার যথার্থ তাৎপর্যে কখনো সম্মানিত হয়নি।

বৃত্তচ্যুতি মাত্রই শাস্ত্রীয়, সামাজিক ও সরকারি বিপর্যয় সৃষ্টি করে—এ প্রত্যয়বশে নিয়ম-নীতি-ন্যায়ের দোহাই উচ্চারণ করে শাস্ত্রী, সমাজপতি ও শাসক গণস্বার্থে চিরকালই গণহত্যা চালিয়েছে। এমনি করে নিয়মের খাঁচায় নিবদ্ধ মানুষ যান্ত্রিক জীবনে ও মননে অভ্যস্ত হয়ে পীড়ক-পীড়িত রূপে স্থানুর জীবনে নিশ্চিত ও আশ্বস্ত থাকতে চেয়েছে, ব্যতিক্রম সহ্য করেনি, কিংবা বিবর্তন কামনা করেনি।

তবু জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা সমন্বিত প্রয়াসে মানুষ ক্রমে ক্রমে প্রকৃতির প্রভু হয়ে বসেছে। কুশল মানুষ সর্বপ্রকার প্রতিকূল প্রতিবেশকে জীবনের অনুকূল করে তুলেছে। আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যখানে যা-কিছু রয়েছে, সেগুলোকে জীবন-জীবিকার অনুগত করে জীবন-জীবিকাকে স্বায়ত্তে আনতে সমর্থ হয়েছে মানুষ। আত্মশক্তিপুষ্ট আজকের আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ জগৎ-চেতনা ও জীবন-ভাবনার ক্ষেত্রে একান্তই ভূমিলগ্ন— আকাশচারী নয়। অন্ন-আনন্দ প্রাপ্তি জন্য কিংবা অভাব-অস্বস্তি অসুস্থতা। বিমোচনের তাগিদে এখন কেউ আর আসমানী দেবতার কৃপার প্রতীক্ষায় থাকে না।

প্রতিকার প্রতিরোধ কামনায় সরকারি অফিসের তৎপরতাই প্রত্যাশা করে। মড়ক-ঝঞ্ঝা-প্লাবন ভূকম্প-লাভাস্রাব কিংবা ভাত-কাপড়-রোগ-অভাব-অনটন প্রভৃতি জীবন জীবিকাসংপৃক্ত সর্বপ্রকার আপদ-অভাব-বিপর্যয় থেকে আত্মরক্ষার ও আত্মত্রাণের উপায় উদ্ভাবনে বহুলাংশে সফল হয়েছে জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞাপ্রবুদ্ধ উদ্যোগী কৌশলী মানুষ।

 

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আজকের সাহিত্যের পরিধি – আহমদ শরীফ – আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif

 

তাই আজকের সাহিত্যে দেবতা-নিয়তি, পাপ-পুণ্য প্রভৃতি গুরুত্ব পায় না। পায় জীবন-জীবিকাসংপৃক্ত সমস্যাবলি। অন্য কথায় শাস্ত্র-সমাজ-সরকার-শাসিত ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক ও রাষ্ট্রিক জীবনে অনুকূল ও প্রতিকূল প্রতিবেশে মানুষ কীভাবে দুঃখ-বেদনা, অভাব-অনটন, বঞ্চনা-লাঞ্ছনা, রোগ-শোক-বুভুক্ষা-দুর্দশা-দুর্ভোগ প্রভৃতির শিকার হচ্ছে অথবা সুখ-আনন্দ-প্রাচুর্য-স্বাচ্ছন্দ্য, প্রভাব-প্রতাপ-প্রতিপত্তি ও উপচিকীর্ষার প্রসাদ পেয়ে ধন্য হচ্ছে; কিংবা দয়া-দাক্ষিণ্য, সেবা-সহানুভূতি, প্রীতি |

মৈত্রী, করুণা, সৌজন্য অথবা ঈর্ষা-অসূয়া-ঘৃণা-বঞ্চনা-প্রতারণা-কার্পণ্য-নির্দয়তা লিপ্সা-রিরংসা-জিগীষা-জিঘাংসা প্রভৃতি মানুষের জীবনে যে কল্যাণ অথবা বিপর্যয় প্রসূত যে যন্ত্রণা ও বিনষ্টির অভিশাপ বয়ে আনছে, তা দেখা-দেখানো জানা-জানানো বোঝা বোঝানোই সাহিত্যশিল্পীর কাজ। শ্রেয়সের সন্ধান এভাবেই মেলে। শ্রেয়সের প্রতি আকর্ষণ এমনি করেই জাগে। কল্যাণ কামনা এ পথেই প্রবল হয়। দৃষ্টির প্রসারও ঘটে এভাবেই। তাই মানুষের প্রতি অনুরাগ, ক্ষমার আগ্রহ, ন্যায়ের প্রতি আসক্তি। সাহিত্যের মাধ্যমেই সহজে বৃদ্ধি পায়।

শাস্ত্র-সমাজ-সরকার তিনটিই শাসনসংস্থা। মানুষ আত্মকল্যাণেই শাসিত হতে চায়, শাস্ত্র-সমাজ-সরকার যখন পোষণের জন্য শাসন করে, তখন মানুষ স্বেচ্ছায় আনুগত্য ও সহযোগিতা দান করে। এবং যখন শোষণের জন্য শাসন চালায়, তখনই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। শাসনসংস্থা যৌথজীবনে আবশ্যিক। কেননা, শাসনের প্রতাপে ও প্রভাবেই মানুষ সংযত জীবন যাপন করে। মানুষের অসংযম ও অনিরুদ্ধ লিপ্সা নিয়ন্ত্রণ করে ব্যক্তিজীবনে নিরাপত্তাদানই শাসনের লক্ষ্য।

মানুষ স্বেচ্ছায় যে শাসন চায়, তা সোহাগের শাসন; শাস্ত্র-সমাজ-সরকার যে শাসনপ্রবণ তা হচ্ছে শোষণের শাসন, শাসক-শাসিতের দ্বন্দ্ব তাই প্রায় চিরন্তন হয়েই রয়েছে। আর মানুষের হাতে মানুষের পীড়ন-লাঞ্ছনা-বঞ্চনাও তাই আজো অশেষ। অনুরাগবশে যে আনুগত্য তা-ই অকৃত্রিম ও স্থায়ী; ভীতিবশে যে আনুগত্য তা নিষ্ফল। জোরে অনুগত করা চলে, অনুরাগী করা চলে না। ভালোবেসে ও ভরসা দিয়েই অনুরাগী ও অনুগত করা সম্ভব।

 

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আজকের সাহিত্যের পরিধি – আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif

 

মানুষ মাত্রই হয়তো প্রাণীমাত্রই শাক্ত। শক্তির প্রতি আসক্তিই দুর্বলকে শাক্ত করে। কাজেই প্রতি মানুষেরই শক্তিধর ও শাক্ত হবার বাসনা সুপ্ত থাকে। সুযোগ পেলেই দুর্বলও শক্তিচর্চা করে আত্মপ্রতিষ্ঠায় ও আত্মপ্রসারে উদ্যোগী হয়ে ওঠে। লাভের লোভ তার বৃত্তচ্যুতি ঘটায়। তখন মানুষ পরস্বাপহরণে হাত বাড়ায় এবং সে মুহূর্তেই মানুষ পরপীড়ক। প্রবল মাত্রই পরপীড়ক ও শোষক। প্রবলে প্রশ্রয় না দিয়ে সংযত রাখাই প্রবলতর শাস্ত্র-সমাজ-সরকারের লক্ষ্যগত দায়িত্ব ও কর্তব্য। সুযোগই শক্তির উৎস। লিপ্সু মানুষকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখার উপায়ের নামই হচ্ছে শাস্ত্রীয় বিধি, সামাজিক নীতি ও সরকারি শাসন। এ তাৎপর্যেই ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ আপ্তবাক্যটি আজো চালু রয়েছে।

নিয়ম-নিয়ন্ত্রিত চলমান জীবনে বৃত্তচ্যুতি মাত্রই অন্যায়-অপরাধ নয়, শ্রেয়াসের সন্ধিৎসায় পুরোনোর পরিহার বাঞ্ছনীয়। এভাবেই আসে মানবিক অগ্রগতি। কিন্তু লোভ লালসাবশে ব্যক্তিক বৃত্তচ্যুতিই অন্যায়, অনর্থকর ও অমার্জনীয় অপরাধ। আশ্চর্য, ব্যক্তিস্বার্থে যে বৃত্তচ্যুতি, মানুষ তা উদারতার সঙ্গে ক্ষমা করতে রাজি, কিন্তু মানবকল্যাণে ভাব-চিন্তা-নীতি-রীতির পরিবর্তন ও বিবর্তনকামী মানুষকে কেউই সহা করতে চায় না। মানবিক দুঃখ-যন্ত্রণার কারণ এমনি রক্ষণশীলতায় নিহিত। বলা চলে মানব জীবনের অধিকাংশ Tragedy-র জন্য সংস্কারদুষ্ট ঐ রক্ষণশীল কর্মপ্রবৃত্তিই দায়ী। শাস্ত্র-সমাজ-সরকার স্ব স্ব স্বার্থে ঐ কূর্মপ্রবৃত্তিরই সংরক্ষক।

শাস্ত্র-সমাজ-সরকার-শাসিত প্রতিবেশে ব্যক্তিক, ঘরোয়া, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক জীবনে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মূলে রয়েছে বহু জনহিত লক্ষ্যে সামগ্রিক সদিচ্ছা ও কল্যাণ বুদ্ধির অভাবপ্রসূত জটিলতা। কর্তার হৃদয়ে নির্বিশেষ মানুষের মঙ্গলকর সদিচ্ছা না জাগলে, খণ্ডদৃষ্টি ও ক্ষুদ্র স্বার্থের শিকার যে-কর্তা, তার শাসনে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়ে, সমস্যা হয়ও বিচিত্র, মন-মানস হয় ক্রুর ও জটিল। তারপরে বহু বহু বছর পরে একদিন ভূকম্পের মতো, মড়কের মতো, ঝঞ্ঝার মতো, জলোচ্ছ্বাসের মতো, লাভাস্রোতের মতো, বৈনাশিক শক্তি দ্বন্দ্ব-দ্রোহ, উপদ্রব উপসর্গ, বিপ্লব-উপপ্লবরূপে নব সৃষ্টিসন্তুব প্রলয় ঘটায় । ইতিহাসের এ-ই সার কথা।

 

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আজকের সাহিত্যের পরিধি – আহমদ শরীফ , Ahmed Sharif

 

রাষ্ট্র (state), শাসন সংস্থা ( govt.) এবং শাসক (regime) যে অভিন্ন নয়, তা আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী ও জনসাধারণকে যেমন বোঝানো যায় না, তেমনি নাগরিকদের দুঃখের কথা, অভাবের কথা, প্রয়োজনের কথা, দাবির ও অধিকারের কথা প্রকাশ করা ও রাজনীতি (politics) যে ভিন্ন বিষয় তাও তাদের উপলব্ধির বাহিরে। তাই তারা কখনো প্রকাশ্যে তাদের চাহিদার কিংবা দুর্দশা-দুর্ভোগের কথা নিজেরা বলতে সাহস পায় না, পাছে তা পলিটিক্স হয়ে যায় এবং সরকার বা শাসক গোষ্ঠীর হাতে মার খায়, এই ভয়ে। তাদের হয়ে কোনো শাসক-বিরোধী দল তাদের অভাব দুর্ভোগের প্রতিকার দাবি করুক, কোনো অন্যায়ের তাদের হয়ে প্রতিরোধ করুক, কোনো অবিচারের তাদের হয়ে প্রতিবাদ করুক, এমনি কুলবধূসুলভ অসহায়তা ও প্রত্যাশা আমাদের জনসাধারণের।

তাই কোনো রাজনৈতিক দলভুক্ত বেকার মানুষ ছাড়া কেউ কোনো সরকারি স্বেচ্ছাচারিতা, অসামর্থ্য, অবহেলা কিংবা দুর্বুদ্ধি, অযোগ্যতা ও ত্রুটির কথা ঘরের বাইরে উচ্চারণ করতে ডরায়। পূর্বকালের প্রকৃতি-নির্ভর মানুষ যেমন খরায় ক্ষেত জ্বললে কিংবা প্লাবনে মজলে অসহায় হয়ে ঘরে বসে আফসোস ও ছটফট করত, তেমনিভাবে আজো অজ্ঞ ভীরু মানুষ ঘরে বসেই ক্ষোভ প্রকাশ করে। তাই অনুন্নত দেশে লৌকিক বিশ্বাসে শাসকদলই একাধারে সরকার ও রাষ্ট্র। ফলে অনুন্নতদেশে শাসকগোষ্ঠী বিনা দ্বিধায় ও বাধায় স্বৈরাচারী প্রভু হয়ে দাঁড়ায়।

অথচ ব্যক্তিক ও সামষ্টিক জীবনে সরকারসৃষ্ট ভাত-কাপড়ের অভাবের কথা, দুর্মূল্যের কথা, ক্ষতির কথা, অন্যায়ের কথা, নির্যাতনের কথা আবেদন-নিবেদন অভিযোগ বা প্রতিকার প্রার্থনার আকারে কিংবা প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মাধ্যমে শাসককে জানিয়ে দেয়া প্রত্যেক মানুষেরই যে নাগরিক অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য, সে-বোধ যতদিন গণমনে জাগ্রত না হবে, ততদিন গণতন্ত্র নিষ্ফল ও নিষ্প্রাণ শাসনযন্ত্র মাত্র।

 

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আজকের সাহিত্যের পরিধি – আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif [ সঙ্গে আহমদ সফা ]

 

শাসনের পদ্ধতি ও লক্ষ্য সম্পর্কিত কোনো বিশিষ্ট মতাদর্শ নিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্য যে দল গঠিত হয়, তা-ই কেবল রাজনীতিক দল। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এবং ন্যায্য দাবি আদায়ের ও সংরক্ষণের প্রয়োজনে যদি কোনো জনতা প্রতিকার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করবার জন্য, এমনকি প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে উদ্যোগী হয়, তখনো তাকে পলিটিক্স বলা যাবে না। ঘরোয়া জীবনে যেমন স্ব-স্বার্থে মানুষ আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে কোন্দল করে, স্ব ক্ষতিতে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিবাদ ও মামলা করে, তেমনি সামষ্টিক ক্ষতিতে, দুর্ভোগে অভাবে শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কণ্ঠে ধ্বনিত করে তোলা, প্রতিকারের দাবি উচ্চারণ করা, প্রতিরোধ করা কিংবা প্রতিশোধ চাওয়া নিশ্চয়ই রাজনীতি নয়।

লোকজীবনের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানের জন্যই সরকার। কাজেই যে-কোনো অভাব-অসুবিধার কথা জানানো, ঐগুলো বিমোচনের জন্য তাগিদ-ভাগাদা দেয়া ও প্রয়োজন হলে দ্রোহ করা নাগরিক অধিকার। আজকের সাহিত্য বাস্তবজীবনের আলেখ্য বলেই আজকের সাহিত্যে শাস্ত্র, সমাজ, ডাত, কাপড়, গৃহ, চিকিৎসা, অর্থ, বিত্ত, দারিদ্র্য, রাস্তাঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজারদর, বেচাকেনা, আইন-শৃঙ্খলা, যান-বাহন, রাজনীতি, কূটনীতি প্রভৃতি আলোচ্য বিষয়ক কথায়। জীবন ও জীবিকাসংপৃক্ত সব ভাব, চিন্তা, কর্ম ও বস্তুই সাহিত্যের বিষয়বস্তু। কেউ কেউ সাহিত্যে শিল্পই মুখ্য, কাজেই বত্ত গৌণ গুরুত্ব পাওয়া বাঞ্ছনীয়।

জীবনের কথা বলার জন্য, জীবনকে দেখানোর জন্য এবং জীবনের সমস্যার প্রতিকার বাঞ্ছাই যদি সাহিত্যসৃষ্টির মুখ্য কারণ হয়, তাহলে স্বীকার পেতেই হবে, যে জল ও তরঙ্গের মতো, রবি ও রশ্মির মতো বক্তব্যও শিল্প পরস্পর অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের। ত্বক মাংসের মতোই বক্তব্যময় শিল্প কিংবা শিল্পমণ্ডিত বক্তব্য একই তাৎপর্য দান করে। বক্তব্য সুবিন্যস্ত ও সুব্যক্ত হলেই শিল্প হয়। শিল্প বলে আলাদা কোনো বস্তু নেই–দেহের রূপের মতো বক্তব্যের লাবণ্যই শিল্প। অতএব বক্তব্য সুবিন্যস্ত ও সুব্যক্ত হলেই লাবণ্যময় হয়, ঐ লাবণ্য বক্তব্যকে শ্রোত্ররসায়ন করে এবং ঐ রসরূপের নামই শিল্প। তাই বক্তব্য ও শিল্পের সমন্বিত রূপই সাহিত্য।

শিল্পে বক্তব্য-নিরপেক্ষে কাব্যিক কিংবা সাঙ্গীতিক আনন্দস্বরূপের প্রত্যাশী যাঁরা, তাঁদের নান্দনিক রুচির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও বলা দরকার জীবন-জীবিকা-সঙ্কট উত্তরণের জন্যই আজ কেবল ‘ফলিত’ (applied) সাহিত্য চাই।

[ আজকের সাহিত্যের পরিধি – আহমেদ শরীফ ]

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন