কবি কায়কোবাদ – আহমদ শরীফ

This post is also available in: বাংলাদেশ

কবি কায়কোবাদ [ Poet Kaykobad ] – আহমদ শরীফ [ Ahmed Sharif ] : কবি-সাহিত্যিক-দার্শনিকরাও স্বকালের মানুষ। দেশ-কালের প্রভাব এড়িয়ে তাঁরাও স্বতন্ত্র জগৎ তৈরি করতে পারেন না। সাধারণ শক্তির আঁকিয়ে লিখিয়ের তো কথাই নেই, এমন কি প্রতিভাবানেরাও কালান্তরের জগৎ জীবন-সম্ভাবনা সম্পর্কে স্পষ্ট অনুমান করতে অক্ষম। কাজেই যাঁদের আমরা যুগোত্তর প্রতিভা বলি, তাঁরাও আসলে চমকপ্রদ ভাবজগৎই সৃষ্টি করেন, নতুন জগৎ নয়। ফলে দেশান্তরে বা কালান্তরে কারো ভাব চিন্তা-কর্মের তেমন কোনো প্রয়োগ সম্ভব উপযোগ থাকে না। নতুন দিনে নতুন মানুষের প্রয়োজন কেবল সমকালীন মানুষই মিটাতে পারে। কেননা আদিকালের এই পুরনো পৃথিবী নতুন মানুষের কাছে নবরূপে ও নবরসে বিস্ময়করভাবে প্রতিভাত হয় বলেই পৃথিবী জীর্ণতামুক্ত।

 

কবি কায়কোবাদ - আহমদ শরীফ
কবি কায়কোবাদ – আহমদ শরীফ

 

পৃথিবী চির নতুন ও সুন্দর। প্রতি নতুন মানুষ নতুন করে এই জগৎ ও জীবনকে আবিষ্কার করে। নতুন মনের নতুন চোখের নব-আবিষ্কারই পৃথিবীকে বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য দান করে একে ভালোবাসার যোগ্য করে রাখে। তবু মানুষমাত্রই ইতিকথার অনুরাগী। সেই অনুরাগবশেই আমরা অতীতের দিকে ফিরে তাকাবার প্রেরণা পাই। এক বেদনা মধুর অনুভবে আমরা শিহরিত হতে ভালোবাসি। কল্পনা ও স্বপ্নময় কুয়াশা-ঘেরা অতীত যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে সে-ডাক নিশির ডাকের মতো মোহময়। সে আহ্বানে সাড়া না দিয়ে মানুষ সাধারণত পারে না।

কায়কোবাদের রচনায় ভাব-চিন্তার ক্ষেত্রে রয়েছে সমকালীনতা আর দৃষ্টি ও কামনার জগৎ হয়েছে ফেলে আসা সুদূর ও অদূর অতীত। মহাশ্মশান, মহম শরীফ, শিবমন্দির কাব্যাদি আমাদের ঐ ধারণার সাক্ষ্য। মহরম শরীফ দূর অতীতের মুসলিম-জীবনের বিপর্যয়ের ইতিকথা, মহাশ্মশান নিকট-অতীতের মুসলিম-জীবনের দুর্যোগের কাহিনী । শিবমন্দির সমকালীন স্বদেশী মুসলিমদের দুর্ভাগ্য-দুর্দশার চিত্র।

 

কবি কায়কোবাদ - আহমদ শরীফ
কবি কায়কোবাদ – আহমদ শরীফ

 

উনিশ শতকে এবং বিশ শতকের প্রথম পাদ অবধি যেসব মুসলমান সাহিত্যক্ষেত্রে লেখনী ধারণ করেন, তাঁদের কেউ উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। অসম্পূর্ণ ও স্বল্পশিক্ষা তাঁদের জ্ঞান-মনীষা ও প্রজ্ঞা-প্রতিভা বিকাশের বিশেষ অন্তরায় ছিল। জ্ঞানের স্বল্পতা বড় প্রতিভার বিকাশেও প্রবল বাধাস্বরূপ। পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে মুসলিম লিখিয়েদের প্রত্যক্ষ পরিচয় ছিল না। প্রতীচ্য জীবন-ভাবনা ও জগৎ-চেতনার সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ছিল পরোক্ষ হিন্দু লিখিয়েদের বাঙলা রচনার মাধ্যমে। কাজেই চিন্তা ও চেতনার বদ্ধতা ছিল দুর্লঙ্ঘ্য। এই সীমিত শক্তি ও চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে কায়কোবাদের সাহিত্যেও। কাজেই এতে যদি আমরা আমাদের প্রত্যাশার পুর্তি খুঁজি, তাহলে আমাদের হতাশ হতেই হবে।

সেকালের মুসলিম লিখিয়েদের কৃতিত্ব কিংবা গুরুত্ব উচ্চমানের সাহিত্য-সৃষ্টিতে নয় বরং সমকালের জীবনপ্রবাহে তাঁদের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনে। প্রতীচ্য বিদ্যা ও জীবন থেকে প্রেরণা পেয়ে শিক্ষিত হিন্দুরা যেমন স্বাজাত্যে ও স্বাদেশিকতায় উদ্বুদ্ধ হবার প্রয়াসী ছিলেন, স্বল্পশিক্ষিত মুসলিমরাও ওঁদের অনুকরণে স্বজাতির ও স্বসমাজের প্রতি আসক্তি প্রকাশ করেন। তখন বাঙালী মাত্রই স্বজাতির অতীত ঐতিহ্য ও গৌরবাশ্রয়ী। হিন্দুর অনুধ্যানে এল আর্য, রাজপুত ও মারাঠা গৌরব-বৃত্ত।

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature

 

মুসলিমের চিত্ত-পরিক্রমার ক্ষেত্র হল আরব, ইরান ও মধ্যএশিয়া। কায়কোবাদেও এই চেতনা প্রকট। উনিশ-বিশ শতকের শিক্ষিত বাঙালীর রচনায় স্থানিক জীবনচেতনা দুর্লভ। অতীতমুখী স্বধর্মীর গৌরব-গর্বী বাঙালী শিক্ষিত কেবল হিন্দু কিংবা শুধু মুসলমান হয়েছে কখনো বাঙালী হয়নি। এই বিড়ম্বনামুক্ত হতে আমাদের বিশ শতকেরও ষাট সত্তর বছর লেগেছে।

অতএব কায়কোবাদকে বিচার করব উনিশ শতকী বাঙালী মনের নিরিখে, যদিও তিনি জৈবজীবনে ছিলেন স্বকালোত্তর। ১৮৫৮ সনে তাঁর জন্ম, আর ১৯৫২ সনে মৃত্যু। কালের দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সমকালীন আর মনের দিক দিয়ে রঙ্গলাল-হেমচন্দ্র ও নবী নিসেনের সমধর্মী। স্বজাতি, স্বসমাজ ও স্বদেশহিতৈষণাই হচ্ছে কায়কোবাদের তথা সে-যুগের লিখিয়েদের লক্ষ্য। তাঁদের ভ্রান্ত জাতীয়তাবোধ, ত্রুটিপূর্ণ হিতচিন্তা ও অতীতাশ্রয়ী জীবনচেতনা পরবর্তীকালে আমাদের অনেক দুর্ভোগের কারণ হয়েছে বটে, কিন্তু তাঁদের সততায়, আন্তরিকতায় ও সীমিত মানবতাবোধে সচেতন ফাঁকি ছিল না।

 

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature

 

কাজেই উনিশ শতকী ও বিশ শতকের গোড়ার দিককার সাধারণ বাঙালীর জীবন ভাবনার ও জগৎ-চেতনার সাক্ষ্য হিসেবে কিংবা দেশের সাধারণ ও সামগ্রিক জীবনপ্রবাহের আদর্শিক আলেখ্য হিসেবে অন্যান্যদের রচনার মতো কায়কোবাদের রচনাও ঐতিহাসিক মূল্য বহন করে। সেদিনকার নির্জিত স্বসমাজের জন্য তাঁর দরদ, আকুলতা, হিতৈষণ্য আমাদের মুগ্ধ করে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধান্বিত করে।

কায়কোবাদের কাব্যবস্তু প্রায়ই বেদনার, বিরহের, বিচ্ছেদের ও পরাজয়ের। কারুণ্য ও হতাশ্বাসই মূল সুর। করুণই প্রধান রস। দুনিয়ার তাবৎ মহৎ সাহিত্যের উপকরণ-উপাদান ঐ Tragic রসাশ্রিত। সেদিক দিয়ে কায়কোবাদ যথার্থ রুচিবোধের পরিচয় রেখে গেছেন। কবিভাষার ক্ষেত্রে কায়কোবাদ ছিলেন নবীন সেনের অনুসারী। নবীন সেনও ছিলেন মহৎভাবের ও বৃহৎ তত্ত্বের সাধক। তবে তাঁর সাধ ও সাধ্যে সমতা ছিল না। তেমনি কায়কোবাদেরও লক্ষ্যে এবং সামর্থ্যে ফাঁক ছিল বিস্তর। তাই কায়কোবাদ মহৎ কিংবা বিশিষ্ট কবি নন। আবার তিনি ছিলেন রবীন্দ্রপূর্বযুগের কবিগোষ্ঠীর ও কাব্যধারার অনুসারী। কিন্তু কালের দিক দিয়ে ছিলেন রবীন্দ্রযুগের। তাই তাঁর কাব্য হচ্ছে অতিক্রান্ত ঋতুর ফসল—মৌসুমী নয়।

 

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature

 

কাজেই কালান্তরে ভিন্ন ঋতুর ফল পাঠকসমাজে আদর-কদর পায়নি। তখন বাঙালী রবীন্দ্রকাব্যরসে অভিভূত এবং প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর জীবন-ভাবনায় বিচলিত, আর ত্রিশোত্তর লিখিয়েদের বদৌলত জীবন-তত্ত্ব ও জগৎ-চেতনা রূপান্তরিত। কাজেই কায়কোবাদ ঠাঁই কিংবা স্থিতি পেলেন না কোথাও। রইলেন প্রায় না ঘাটকা না ঘরকা হয়ে। তাঁর প্রাপ্য সম্মান রইল অপ্রাপনীয় হয়ে। তবু প্রাক্তন পাকিস্তানে স্বদেশী-স্বভাষীরা তাঁকে জিইয়ে তুলবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাঁচা ও টিকে থাকা—–দুটোই নির্ভর করে প্রাণশক্তি ও আত্মশক্তির ওপর। কায়কোবাদের কাব্যে ঐ দুটোরই অভাব। কায়কোবাদ সুদীর্ঘ পঁচানব্বই বছর বেঁচেছিলেন। বারো বছর বয়েস থেকেই শুরু করেছিলেন কাব্যরচনা। অতএব তাঁর সুদীর্ঘ তিরাশি বছরের সাধনার ফসল তুলনায় বেশি নয়। ঐ কদরের অভাবেই হয়তো তাঁর শেষ ত্রিশ বছরের রচনা তাঁর জীবৎকালেই অনাদরে অমুদ্রিত অবস্থায় পড়েছিল।

তবু সেদিন কায়কোবাদ এক নির্জিত সমাজের প্রতিনিধি-প্রতিভূ কিংবা মুখপাত্র হিসেবে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বসমাজের মুখরক্ষা করেছিলেন সাহিত্যের আসরে ও আধুনিক জীবন-চেতনার চত্বরে। একান্তে জ্বলেছিলেন খদ্যোতের মতো। তাতেও তাঁর স্বসমাজের লোক পেয়েছিল প্রাণের প্রেরণা ও পথের দিশা। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিলেন বলেই আমরা এই মুহূর্তেও শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি মহাশ্মশানের কবিকে। তাঁর জাতিক ও দৈহিক জীবনে তিনি যে মহাশ্মশান ও শ্মশানভস্ম দেখে নৈরাশ্যে ও বেদনায় বুকফাটা নিশ্বাস ফেলেছেন, যে কারবালা তাঁকে কাঁদিয়েছে, তাঁর জীবৎকালেই পাকিস্তান রাষ্ট্র দেখে তিনি নিশ্চয়ই সেসব শোক ভুলেছিলেন, আজ দেশ ও জাতি সে-অভিশাপও মুক্ত হয়ে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এতে কি তাঁর কোনো পরোক্ষ দান নেই। যদি আত্মা থাকে, তাহলে আজ অক্রমালার কবির কান্না থামবে। তাঁর আত্মা খুশি হবে।

[ কবি কায়কোবাদ – আহমদ শরীফ ]

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন