কবি বিহারীলাল [ Poet Bihari Lal ] – আহমদ শরীফ [ Ahmed Sharif ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

কবি বিহারীলাল [ Poet Bihari Lal ] – আহমদ শরীফ [ Ahmed Sharif ] : প্রতীচ্য-প্রভাবিত আধুনিক সাহিত্যে গীতিকবিতা একটি প্রধান শাখা। রবীন্দ্রনাথের আগে যাঁরা ইংরেজির আদলে গীতিকবিতা রচনা করেছিলেন তাঁদের কারো রচনায় গীতিকবিতার প্রাণপ্রতিষ্ঠা পায়নি। ঐসব কবিতায় অনুকৃতি ছিল, অনুসৃতি ছিল, কিন্তু কাম্য আমেজটি ছিল না। মধুসূদন, হেমচন্দ্র কিংবা নবীনসেন অনেক কবিতাই লিখেছেন, কিন্তু মেজাজে তাঁরা যেন গীতিকবি ছিলেন না। অথচ তাঁরা সবাই ছিলেন প্রতীচ্য বিদ্যায় উচ্চশিক্ষিত।

কবি বিহারীলাল - আহমদ শরীফ
কবি বিহারীলাল – আহমদ শরীফ

 

বাঙলায় আধুনিক গীতিকবিতার আমেজ প্রথম যিনি সৃষ্টি করলেন, তিনি বিহারীলাল চক্রবর্তী-জন্ম ১৮৩৪ সনে আর মৃত্যু ১৮৯৪ সনে। বিহারীলাল ইংরেজি বিদ্যায় পটু ছিলেন না। তবে রামকমল ভট্টাচার্য, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ সেকালের জ্ঞানী-গুণী-বিদ্বানের ঘনিষ্ঠ সঙ্গ পেয়েছিলেন তিনি। তাঁদের কাছে শুনে শুনে তিনি পাশ্চাত্যের সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে একটি মোটামুটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করেন। ফলে তিনি মেজাজে ও জীবন-চেতনায় একজন পুরোপুরি আধুনিক য়ুরোপীয় মানুষ হয়ে ওঠেন। সেই মেজাজ ও চেতনার প্রসূন হচ্ছে তাঁর কাব্য। মধুসূদন কিংবা হেম-নবীনের কাব্যে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল না। বিহারীলালের মধ্যেই কিশোর রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মার আহার ও আনন্দ খুঁজে পান। কবি রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক বিকাশে বিহারীলালের প্রভাব তুচ্ছ নয়। বিহারীলালের রূপলক্ষ্মী সারদা আর রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’ মূলত অভিন্ন।

বিহারীলাল ছিলেন জীবনবাদী কবি এবং সে-জীবনের অবলম্বন ছিল প্রেম ও সৌন্দর্য। আর সে-জীবন-চেতনার মূলে ছিল পার্থিব জীবনের মাহাত্ম্য-মুগ্ধতা। জীবনটা যে একটা ঐশ্বর্য এবং সে ঐশ্বর্য যে মাটি ও মানুষের প্রতিবেশেই ভোগ করতে হবে—এ চেতনা বিহারীলাল গোড়াতে লাভ করেছিলেন। যা ভালো লাগে তা-ই ভালোবাসার বস্তু এবং ভালোবাসার দৃষ্টিতে সবই সুন্দর। বিহারীলাল আমরণ এই জগৎ ও জীবনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ ও দিশেহারা ছিলেন। বৈষয়িক জীবনকে তুচ্ছ জেনে, বাস্তবজীবনকে আড়াল করে বিহারীলাল রূপ ও সৌন্দর্যের, প্রেম ও পৃথিবীর স্বরূপ উপলব্ধির প্রয়াসী ছিলেন।

পৃথিবীর রূপে মুগ্ধ জীবন-রসের রসিক কবি জাগতিক রূপ ও রসের উৎস যে সৌন্দর্যস্বরূপা তাঁকেই জানবার-বুঝবার প্রয়াসে, তাঁর অনুধ্যানে আমৃত্যু রত থাকেন। এভাবে প্রেম ও সৌন্দর্যলিপ্সু কবি অবশেষে তাত্ত্বিক ও মরমীয়া সাধক কবিতে পরিণত হলেন। তাঁর সারদামঙ্গল ও সাধের আসন’ কাব্যদুটিতে ভূমি ও ভূমা, প্রিয়া ও পৃথিবী, রূপ ও রূপসী একাকার হয়ে গেছে। তাই বিহারীলাল দুর্বোধ্য, তাত্ত্বিক ও মরমী। নইলে বিহারীলালও এ জীবনের ও জগতের কবি। অধ্যাত্ম্য তত্ত্ব-চিন্তা কখনো তাঁর প্রশ্রয় পায়নি।

 

কবি বিহারীলাল - আহমদ শরীফ
কবি বিহারীলাল – আহমদ শরীফ

 

প্রথমজীবনে রচিত ‘বঙ্গসুন্দরী’, ‘বন্ধুবিয়োগ’, ‘নিসর্গ সন্দর্শন’, ‘প্রেম প্রবাহিনী’ প্রভৃতি কাব্যে বিহারীলালের চেতনা একান্তই ভূমি-নির্ভর, সরল ও ঘরোয়া জীবন-ঘেঁষা। ঘুমন্ত স্ত্রীর সুন্দর মুখের পানে তাকিয়ে উল্লসিত কৰি লিখেছেন :

আহা এই মুখখানি

প্রেম-ভরা মুখখানি

ত্রিলোক সৌন্দর্য আমায় কে দিল আনিয়া! মানুষকে ভালোবেসে, নারীকে প্রেম করেই বিহারীলাল বিশ্ব-প্রকৃতির ও নিসর্গের এবং ব্রহ্মাণ্ডের সৌন্দর্য-লক্ষ্মীর ধারণা বোধগত করেন। সারাজীবন রূপ-তৃষ্ণা তাঁকে বিচলিত ও উৎকণ্ঠিত রেখেছে। তাই তিনি পরলোককে অস্বীকার করেছেন, স্বর্গসুখকে জেনেছেন তুচ্ছ বলে। বলেছেন— স্বরগে অনন্ত সুখ, অহো এ কি যাতনা! অতএব দুঃখ-সুখের এই পার্থিব জীবনকেই তিনি বিচিত্রভাবে অনুভব, উপভোগ ও উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। অবিকৃত ও একঘেঁয়ে স্বর্গসুখকে যন্ত্রণাকর বলে জেনেছেন।

এই নরজন্মকেই তিনি দুর্লভ ও সার্থক বলে মেনেছেন এবং বলেছেন, এজন্যই স্বর্গের দেবতাও দুনিয়ায় রাখালরূপে নর-লীলার আনন্দ-ভোগে ধন্য হতে চেয়েছেন। জীবনে যে একবার এই রূপরসের সন্ধান পেয়েছে, তার মতো সার্থকজন্মা আর কে! তাই কবি সৌন্দর্যস্বরূপার উদ্দেশে বলতে পেরেছেন :

তুমি লক্ষ্মী সরস্বতী

আমি ব্রহ্মাণ্ডের পতি

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif

 

হোক গে বসুমতী যার খুশি তার। আগেই বলেছি, প্রতীচ্য আদলে প্রথম সার্থক গীতিকবি ছিলেন বিহারীলাল। কিন্তু তবু তাঁর মধ্যেও আমরা গীতিকবিতার বিশুদ্ধ নমুনা পাইনে। তার কারণ বোধহয়, একদিকে যেমন ইংরেজিটা তাঁর পুরো শেখা ছিল না বলে ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ যোগ হতে পারেনি, অন্যদিকে তেমনি স্বদেশী ও স্বশাস্ত্রীয় অধ্যাত্মতত্ত্ব এবং তাত্ত্বিকতাও তাঁর অজ্ঞাতেই তাঁকে প্রভাবিত করেছে। ফলে জীবনবাদী কবি প্রাণের কথা সহজভাবে বলতে যেয়ে আকস্মিকভাবে রহস্যময় হয়ে উঠেছেন। তাঁর কাব্যও তাই তাত্ত্বিকতার মরুতে দিশা হারিয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথের কাব্যেও এই আধ্যাত্মিকতার অরণ্য অপ্রত্যক্ষ নয় । অতএব, তাত্ত্বিকতা প্রাচ্য কবিদের স্বভাব।

বিহারীলালের গৌরব অম্লান থাকবে। এই মাটি ও মানুষের পৃথিবীকে তিনি সত্য ও তবু কাব্যে নতুন জীবন-চেতনার প্রবর্তক হিসেবে বাংলাসাহিত্যের ক্ষেত্রে সুন্দর বলে জেনেছিলেন। পারত্রিক সুখ-স্বর্গ তাঁকে প্রলুব্ধ করেনি। প্রিয়া ও পৃথিবীর রূপে তিনি ছিলেন মুগ্ধ, জীবনের মাধুর্যরসে ছিলেন অভিভূত। তাই বলতে পেরেছেন:

ভালোবাসি নারীনরে ভালোবাসি চরাচরে

মনের আনন্দে রই।

এর আগে যখন হৃদয়ে এই প্রীতি জাগেনি, তখন বলেছেন

সর্বদাই হুহু করে মন

বিশ্ব যেন মরুর মতন।

এভাবে বিহারীলাল কাব্যের ক্ষেত্রে আত্মভাব সাধনার একটি স্বকীয় জগৎ আবিষ্কার করেছিলেন। স্বাতন্ত্র্য ও বলিষ্ঠতায় তাঁর কাব্য আজো উজ্জ্বল। বিহারীলালের জীবনবাদ ও মর্ত্যপ্রীতি এবং সৌন্দর্য-চেতনা আধুনিক মানববাদের স্বগোত্রীয়। মানবজীবনের মাধুর্য, সৌন্দর্য ও সম্ভাবনাময় মহিমাই তাঁর কাব্যে পরিব্যক্ত হয়েছে। এ জীবন-দর্শন বাংলাসাহিত্যে সেদিন ছিল একাধারে নতুন ও বিস্ময়কর।

 

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature

 

সহজ করে বলতে গেলে, বিহারীলালের কাব্যে তত্ত্ব বা তথ্য যা আছে, তা এই— ‘রূপসীরে করে পূজা, প্রেয়সীরে ভালোবাসে কবি। তবে রূপ ও রূপসী, প্রিয়া ও পৃথিবী, ভূমি ও ভূমা, কায়া ও ছায়া কখনো স্বতন্ত্র হয়ে, কখনো একাকার হয়ে কবিকে কখনো বিচলিত, কখনো উল্লসিত এবং কখনো বা দিশেহারা করেছে। কায়া, ছায়া ও মায়া তাঁকে সমভাবে প্রলুব্ধ ও অস্থির রেখেছে। বাঙালী-চিত্তে নতুন জীবন-চেতনা ও জগৎ-ভাবনা সৃষ্টিতে বিহারীলালও একজন পথিকৃৎ। তাই বাঙলার সাহিত্য, মনন ও সংস্কৃতিক্ষেত্রে বিহারীলাল চিরকাল একটি সগৌরবে স্মরণীয় নাম হয়ে থাকবে। জয়তু বিহারীলাল!

 

[ কবি বিহারীলাল – আহমদ শরীফ ]

 

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন