খুলনা জেলার গুণী ব্যক্তিত্ব [ Renowned personalities of Khulna district]

This post is also available in: বাংলাদেশ

খুলনা জেলার গুণী ব্যক্তিত্ব [ Renowned personalities of Khulna district] নিয়ে আজ আলাপ করবো। খুলনা জেলায় অনেক গুনি মানুষ জন্মেছেন। তাদের প্রত্যেক কে নিয়ে এই আর্টিকেলে লেখা সম্ভব নয়। তবে যারা বিগত শতাব্দিতে যারা তাদের অবদানের জন্য সর্বজনের শ্রদ্ধেও হয়ে আছেন, তাদের নিয়ে আজ লিখবো।

খুলনা জেলার গুণী ব্যক্তিত্ব [ Renowned personalities of Khulna district]

 

সতীশচন্দ্র মিত্র :

ইতিহাসবিদ হিসেবে খ্যাত সতীশচন্দ্র মিত্র। জন্ম ১৮৭২ সালের ১৪ই ডিসেম্বর খুলনা জেলার পাইকপাড়ায়। পিতা প্যারীমোহন মিত্র ছিলেন খুলনা আদালতের পেশকার। খুলনা সতীশচন্দ্র মিত্র জেলা স্কুল, কলকাতা মেট্রোপলিটন কলেজ, কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যয়ন করেন। স্কুল শিক্ষক হিসেবে ১৮৯৯ সালে কর্মজীবন শুরু করেন।

 

খুলনা জেলার গুণী ব্যক্তিত্ব - সতীশচন্দ্র মিত্র, লেখক
সতীশচন্দ্র মিত্র, লেখক, খুলনা

 

তিনি ১৯০৪-১৯৩১ সাল পর্যন্ত খুলনার দৌলতপুর হিন্দু একাডেমিতে অধ্যাপনা করেন। শিল্প ও সাহিত্য’ নামক সাময়িকপত্র সম্পাদনা করে (১৯০৪-১৯০৫) স্থানীয় ইতিহাস রচনায় প্রতিভার স্বাক্ষর তুলে ধরেন। তিনি বহুল আলোচিত ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ (১ম খণ্ড ১৯১৪ ও ২য় খণ্ড ১৯২২) গ্রন্থ রচনা করে বিপুল প্রশংসা লাভ করেন।

সতীশচন্দ্র মিত্র পুরো সুন্দরবন অঞ্চলের দুই হাজার বছরের ইতিহাস, ২ খণ্ডের বইএর দেড় হাজার পাতার ভেতর সাজিয়ে গেছেন পাঠকের জন্য। অনেক রকম করে খুলনা-যশোর অঞ্চলের ইতিহাস লেখা হলেও, এখন পর্যন্ত সতীশচন্দ্র মিত্রর কাজটিই আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মীর্জানগরের কামানের উপর উপবিষ্ট সতীশচন্দ্র মিত্র
মীর্জানগরের কামানের উপর উপবিষ্ট সতীশচন্দ্র মিত্র

 

খুলনা-যশোর অঞ্চলের ইতিহাস, ভূগোল নিয়ে শিশুদের জন্য বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করলেও তাঁর বড় কাজ ইতিহাস নিয়েই। আর ওই একটি কাজই তাকে ইতিহাসে অসামান্য জায়গা দিয়েছে।

তাঁর অন্যান্য প্রকাশনার মধ্যে কাব্যগন্থ ‘মা’, পাঠ্যপুস্তক ‘প্রাথমিক বাঙ্গালার ইতিহাস’, ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’, ‘ঐতিহাসিক পাঠ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৩১ সালের ৭ই জুন তিনি খুলনার দৌলতপুরে মৃত্যুবরণ করেন।

 

কাজী ইমদাদুল হক :

সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ কাজী ইমদাদুল হক ১৮৮২ সালের ৪ঠা নভেম্বর খুলনা জেলার গদাইপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। খুলনা জেলা স্কুল, কলকাতা মাদ্রাসা, প্রেসিডেন্সি কলেজ, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯০৩ সালে কলকাতা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। আসামের শিলং শিক্ষা বিভাগ, ঢাকা মাদ্রাসা, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও ঢাকা বিভাগে চাকুরি করেন।

সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ কাজী ইমদাদুল হক [ Kazi Imdadul Haque ]
সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ কাজী ইমদাদুল হক [ Kazi Imdadul Haque ]

১৯২১ সালের মে মাসে ঢাকা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড স্থাপিত হলে প্রথম সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। আবদুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। তৎকালিন মুসলিম সমাজের প্রতিচ্ছবি হিবেসে উপন্যাসটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। বাঙালি মুসলমান সমাজের কল্যাণ সাধনই ছিল তাঁর সাহিত্য-সাধনার মূল লক্ষ্য।

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অন্যতম স্থপতি ছিলেন তিনি। সম্পাদনা করেছেন মাসিক পত্রিকা ‘শিক্ষক’। প্রকাশিত অন্যান্য গ্রন্থাবলির মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ‘আঁখিজল’, ‘লতিফা’, প্রবন্ধগ্রন্থ ‘প্রবন্ধমালা’, শিশুতোষ গ্রন্থ ‘নবীকাহিনী’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ১৯২৬ সালে তিনি ‘খাঁন বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন। ১৯২৬ সালের ২০শে মার্চ তিনি পরলোক গমন করেন।

 

শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত :

বাংলা সাহিত্যে অন্যতম নাট্যকারশচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের জন্ম ১৮৯২ সালে খুলনা জেলার সেনহাটিতে। স্বদেশি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। কিছুকাল জাতীয় কলেজে অধ্যাপনা করেন। ‘কৃষক’ ও ‘ভারত’ নামক দুটি পত্রিকার সহসম্পাদক ছিলেন। সম্পাদনা করেছেন ‘হিতবাদী’, ‘বিজলী’, ‘আত্মশক্তি’ প্রভৃতি সাময়িকপত্র।

 

শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

 

ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক নাটক রচনায় তিনি দক্ষতা ও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন। এসব নাটকে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে দেশাত্ববোধ। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও হিন্দু-মুসলমানের মিলনের বাণী তাঁর নাটকের অপর বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস নিষ্ঠার কাহিনির দৃঢ় সংবদ্ধতায় ও শক্তিশালী সংলাপে ঋদ্ধ তাঁর নাটকসমগ্র।

উল্লেখযোগ্য নাট্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক নাটক ‘সিরাজুদ্দৌলা’, ‘গৌরিক পতাকা’, ‘রাষ্ট্রবিপ্লব’, ‘কামাল আতাতুর্ক’, ‘এই স্বাধীনতা’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য; সামাজিক নাটক ‘রক্তকমল’, ‘ঝড়ের রাতে’, ‘নার্সিং হোম’, ‘তটিনীর বিচার’ প্রভৃতি। এ সকল নাট্যচর্চায় দেশাত্মবোধের অনুপম ইঙ্গিত স্পষ্ট প্রতীয়মান। এই বরেণ্য সাহিত্যিক ১৯৬১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

 

এ এফ এম আব্দুল জলিল :

এ এফ এম আব্দুল জলিলের জন্ম খুলনার তেরখাদার পানতিতা গ্রামে ১৯১৬ সালে। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক। ১৯৪৫ সালে ল পাস করেন। ১৯৪৭-এ চেম্বারশিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা হাইকোর্টে অ্যাডভোকেটের সনদ লাভ করেন। দেশ বিভাগের পর খুলনায় আগমন করেন।

নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। ১৯৫৪-তে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪-তে খুলনা জেলা বার সমিতির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ এ খুলনা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত হন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় সভ্যতায় ইসলামের গান (১৯৪৭), ইবনে খালদুন (১৯৪৭), পারস্য সাহিত্য (১৯৪৯) মুসলিম সংস্কৃতি (১৯৪৯), মুসলিম আইন ও সমাজ ব্যবস্থা (১৯৪৯), আমার কথা (১৯৭০), আইয়ুব আমলে ভূত (১৯৭০), পূর্ব বাংলার কৃষক বিদ্রোহ (১৯৭৫), সুন্দরবনের ইতিহাস (তিন খণ্ড, ১৯৭৬), পাঁচ হাজার বছরের বাংলা ও বাঙালী প্রভৃতি।

তিনি ১৯৬৮-তে বাংলা একাডেমির স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড ও ১৯৬৯ এ ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৮ সালের ২রা নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

দেবু ভট্টাচাৰ্য:

দেবু ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৩০ সালে মুরাদনগরে। পৈতৃক নিবাস খুলনা। খুলনা জেলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাস ও কলকাতা আর্ট ইনস্টিটিউশন থেকে ডিগ্রি পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সংগীত পরিচালক তিমিরবরণের অর্কেস্ট্রায় বংশীবাদক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৫৪ সালে তিমিরবরণের সহকারী হিসেবে করাচি যান। পরবর্তীকালে করাচি, লাহোর ও রাওয়ালপিণ্ডির চিত্রপুরী সংগীত পরিচালক হিসেবে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালে করাচি ত্যাগ করে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

দেড়শতাধিক ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন। তিনি আধুনিক বাংলা গানের একজন দক্ষ সুরকার। আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’ কিংবা ‘নোটন নোটন পায়রাগুলো’ প্রভৃতি গানে তিনি সুর সংযোজন করে সংগীত জগতে অমর হয়ে আছেন। তিনি ১৯৯৪ সালের ৩০শে জুন ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

 

এ. কে. এম. আবদুল রউফ :

চিত্রশিল্পী, কূটনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা, আর্কিডিস্ট এ. কে. এম আবদুর রউফের জন্ম ১৯৩৫ সালে খুলনার বয়রা নূরনগরে। ১৯৫৯ সাল ঢাকা চারু ও কারুকলা কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের করাচি কার্যালয়ে উপ-পরিচালক পদে যোগ দেন।

১৯৭০-৭১ এ সরকারি মনোনয়নে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য লন্ডন যান এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক দপ্তরে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে লন্ডনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৭১ এর ৭ই মার্চ তার ডিজাইনকৃত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা লন্ডনে অস্থায়ী দূতাবাসে উত্তোলন করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি হাতে লিখে ‘বাংলাদেশ সংবাদ পরিক্রমা’ প্রকাশ করেন এবং জনসভা, মিছিল, সম্মেলনের প্রচ্ছদ-পোস্টার অংকন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ দুতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮-এ দেশে ফিরে সরকারের নবগঠিত ‘বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যান্ড আর্কাইভ’র প্রতিষ্ঠাতা কিউরেটরের পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯২ সালে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের পরিচালক পদে যোগ দেন। এ সময় দেশ-বিদেশের মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য চলচ্চিত্র নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লাল সালু’, আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ প্রভৃতি প্রায় তিন হাজার বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন তিনি। আবদুর রইফ ১৯৭২-এ প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের মূল হস্তলিপিকর। ২০১০ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। এই গুণি ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন ২০০০ সালের ১লা এপ্রিল।

তথ্যসূত্র

১. শেখ আব্দুল জলিল, ডুমুরিয়ার ইতিহাস, ২৯৩, আরণ্যক, খুলনা।

২. মুনতাসির মামুন (সম্পাদিত), ১৯৭১ চুকনগর গণ ত্যা, মে ২০০২, ইউপিএল, ঢাকা। ৩. পরিসংখ্যান অফিস, ডুমুরিয়া উপজেলা, খুলনা ৪. আঞ্চলিক ইতিহাস সিরিজ : খুলনা, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি, কলেজ শিক্ষক ইতিহাস সমিতি, খুলনা ।

৫. সতীশ চন্দ্র মিত্র, যশোর খুলনার ইতিহাস, ২০০১, রূপান্তর, খুলনা।

৬. বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ৭. বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, ২০১১ ঢাকা।

৮. শেখ গাউস মিয়া, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ খুলনা জেলা, ২০০৮, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

আরও পড়ুন:

খুলনা জেলা

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন