খুলনা জেলার দর্শনীয় স্থান – ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বিখ্যাত স্থান [ Historical Sites and Famous Places of Khulna district ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

খুলনা জেলার দর্শনীয় স্থান [ Historical Sites and Famous Places of Khulna district ] : ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বিখ্যাত স্থান: খুলনাতে প্রচুর ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বিখ্যাত স্থান রয়েছে। তবে জায়গাগুলো প্রচারের অভাবে এখনো পর্যটকদের দৃষ্টির বাইরে রয়েছে। এই জায়গাগুলোর তথ্য ও চিত্র পর্যটকদের সামনে ভালো ভাবে তুলে ধরলে তারা অবশ্যই আগ্রহী হবে এবং খুলনা জেলার পর্যটন খাত এগিয়ে যাবে।

 

শিববাড়ি শিব মন্দির :

খুলনা শহরের অধুনালুপ্ত শিব মন্দির একটা প্রাচীন শিব মন্দির। এর থেকেই কেডিএ ভবন সংলগ্ন এলাকার নাম হয়েছে শিববাড়ি সংলগ্ন মোড়ের নাম হয়েছে শিববাড়ির মোড়। এ যে খুব প্রাচীন তাতে সন্দেহ নেই। অনেকের মতে অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে জনৈক প্রসেস সার্ভেয়ার উমাচরণ দে এ মন্দির নির্মাণ করেন। বর্তমানে তার সংস্কার করে মূর্তি প্রতিষ্ঠাপূর্বক নিয়মিত পূজা-অৰ্চনা হচ্ছে।

 

কয়লাঘাটা কালীবাড়ি:

শহরের কেন্দ্রস্থলে সাউথ সেন্ট্রাল রোড ও গগনবাবু রোডের সংযোগস্থলে ১০ কাঠা জমির উপর এ মন্দিরটি অবস্থিত। এ মন্দিরটি স্থাপিত হয় ১৯৩৪ সালের জুন মাসে। ঐ সময় এ মন্দির নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রভাসচন্দ্র চ্যাটার্জী, প্রসন্নরায় চৌধুরী, কুণ্ডুবিহারী মুখার্জী, পূর্ণচন্দ্র চ্যাটার্জী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। এ মন্দিরে দক্ষিণা কালী স্থাপন করা হয়। ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে এ মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের পরে ধর্মপ্রাণ অক্ষয় চন্দ্র দত্তের উদ্যোগে ও স্থানীয় হিন্দুদের সহযোগিতায় এ মন্দিরের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে।

 

নীলকর চার্লির বাড়ি :

শহরের প্রাচীন বাড়ি হিসেবে প্রথমে নীলকর চার্লির বাড়িটি উল্লেখযোগ্য। এটা শহরের প্রথম পাকা বাড়ি। রেলওয়ে এলাকার মধ্যে অবস্থিত এ বাড়িটি বর্তমানে রেল কর্মচারীদের বিশ্রামাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা নির্মিত হয় জনৈক চোলেট সাহেব বা চার্লির হাতে। তিনি ছিলেন খুলনার একজন নামকরা নীল কুঠিয়াল। অনেকের মতে তিনি ছিলেন স্থানীয় লবণ এজেন্সির প্রধান মি. ইওয়ার্টের সহযোগী।

খুলনা জেলার দর্শনীয় স্থান - ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বিখ্যাত স্থান, Charlie Nilkuth, নীলকর চার্লির বাড়ি

 

তিনি রেল স্টেশনের পূর্বদিকে এ বাড়ি নির্মাণ করেন। ঐ সময় অবশ্য রেল স্টেশন নির্মিত হয়নি। কলকাতা-খুলনা রেল লাইন চালু হয় ১৮৮৪ সালে। তারপরই নির্মিত হয় এ রেল স্টেশন। এটাই ছিল শহরে নির্মিত প্রথম ইস্টক নির্মিত পাকাবাড়ি যা এখনও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে রয়েছে। চার্লি এ বাড়ির পূর্বদিকে একটা হাট বসান। এটাই ছিল প্রাচীন টালিগঞ্জের হাট যা পরে সাহেবের হাট নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

 

লাল দালান :

‘লাল দালান’ বলে পরিচিত খুলনা জেলা স্কুলের প্রধান ভবনটিও শহরের আর একটি প্রাচীন ভবন। জেলা স্কুল খুলনা বিভাগের সবচেয়ে পুরানো সরকারি বিদ্যালয়। খুলনা শহরের দ্বিতীয় স্কুল। এখন এর বয়স প্রায় ১৩০ বছর। ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত তা বেসরকারি স্কুল হিসেবে চালু ছিল।

১৮৮৩ সালে হান্টার কমিশনের রিপোর্ট মোতাবেক ১৮৮৫ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন সরকার এর দায়িত্বভার গ্রহণ করে। তখন থেকে এর নাম হয় খুলনা জেলা স্কুল। ভিক্টোরিয়ান রীতিতে নির্মিত ‘লাল দালান’ বলে পরিচিত এ ভবনটি স্কুলের আদি ভবন। এ ভবন নির্মাণে অর্থ সাহায্য করেন বেলফুলিয়া নিবাসী বাবু সাতুরাম মজুমদার। তিনি ছিলেন স্থানীয় কয়লাঘাটা নিমক চৌকীর দারোগা।

 

লাল দালান, খুলনা জিলা স্কুল
লাল দালান, খুলনা জিলা স্কুল

 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে অষ্টাদশ শতকের শেষ দিক হতে সুন্দরবন রায়মঙ্গল বিভাগের লবণচৌকী স্থাপিত হয় শহরের কয়লাঘাটা নামক স্থানে। একে বলা হত ‘নিমক মহল’ বা লবণচৌকী। ঐ সময় এ লবণচৌকীর দারোগা ছিলেন পূর্বোক্ত সাতুরাম মজুমদার। এ ভবন নির্মাণে তিনি অনেক অর্থ সাহায্য করেন বলে জানা যায়।

এখন ‘ভূতের বাড়ি’ নাম নিয়ে বাড়িটি আছে তবে ভূত নেই। সিটি কলেজ বর্তমানের রিকুউজিশন করা বাড়িতে যাওয়ার আগে এখানে কিছুদিন ছিল। পরে সেখানে স্থাপন করা হয় আনসার ক্যাম্প। সেজন্য এ ভবনটি একটা দুঃখের স্মৃতির স্মারকও।

সারাদেশের মধ্যে এ ভবনেই প্রথম রাজাকার ক্যাম্প স্থাপিত হয়। ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনার এ আনসার ক্যাম্পেই ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থি যুবককে নিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়। প্রথম পর্যায়ে এ রাজাকার বাহিনী ছিল শান্তি কমিটির নেতৃত্বাধীন।

পরে ঐ সালের ১ জুন জেনারেল টিক্কা খান ‘পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স ৭১’ জারি করে আনসার বাহিনীকে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন। এর পরেও খুলনা শহরের রাজাকারদের সদর দফতর ছিল এই ভূতের বাড়ি। বর্তমানে এ ভবনে বিভাগীয় আনসার ক্যাম্প অবস্থিত। দেশের অন্যত্রও এ ধরনের ভূতের বাড়ির অস্তিত্বের কথা শোনা যায়।

 

চট্টোপাধ্যায় ব্রাদার্স :

বাড়ি নয় এই দোকানটি বিশেষ কারণে ঐতিহাসি গুরুত্বের দাবিদার। বর্তমানে এর নাম ফাতেমা জুয়েলার্স হলেও একসময় এর নাম ছিল চট্টোপাধ্যায় ব্রাদার্স। আর সে দোকানের উদ্বোধন ঘটে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর হাতে। শুধু উদ্বোধন নয়, দোকানটিও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দাবিদার।

ত্রিশের দশকে কিছু আক্রমণাত্মক ঘটনায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে এদেশের ইংরেজ শাসকেরা নানাবিধ দমননীতির মাধ্যমে বিপ্লবীদের অভ্যন্তরে নিক্ষিপ্ত হন। এ সময় আত্মগোপন করার জন্য কিছু কর্মী ব্যবসায়ী সেজে খুলনা শহরে ব্যবসা বাণিজ্য আরম্ভ করেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়। নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন খুলনার এক অসাধারণ বিপ্লবী নেতা।

এখানকার চট্টোপাধ্যায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তিনি বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। একসময় তিনি খুলনা কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক ছিলেন। পরে নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের নেতৃত্বে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠিত হলে তিনি তাতে যোগ দেন। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষ্ঠুর দমননীতি শুরু হলে তিনি (নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়) হেলাতলার মোড়ে একটা বইয়ের দোকান খুলে নাম দেন ‘চট্টোপাধ্যায় ব্রাদার্স’।

১৯৩৯ সালে সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁর নবপ্রতিষ্ঠিত ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রচারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জেলা সফরের যে কর্মসূচি গ্রহণ করেন তার অঙ্গ হিসেবে ৩০ ডিসেম্বর তিনি বরিশাল হয়ে খুলনা আসেন। সুভাষ বসু একটি কর্মব্যস্ত দিন খুলনায় কাটান। এরমধ্যে চট্টোপাধ্যায় ব্রাদার্স-এর উদ্বোধন ছিল একটা সাড়া জাগানো ঘটনা। তবে সে দোকানটি আজও আছে সেই অনন্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে।

 

খুলনার নাট্য নিকেতন :

খুলনা থিয়েটার খুলনাবাসীর কাছে একটা অতি পরিচিত নাম। এটি খুলনার নাট্যামোদী ও সংস্কৃতিকর্মীদের একটা মিলন তীর্থ, পুরাতন ঐতিহ্যবাহী নাটকপাড়া। ১৯০০ সালে এর যাত্রা শুরু হয়। সে হিসেবে এর বয়স হবে প্রায় ১১২ বছর। ১৯০৯ সালে খুলনা অঞ্চলে এক প্রলয়ংকরী ঝড় হয়। এ ঝড়ে খুলনা থিয়েটারের অস্থায়ীভাবে নির্মিত সেমিপাকা ঘরটি বিধ্বস্ত হয়।

 

খুলনার নাট্য নিকেতন
খুলনার নাট্য নিকেতন

 

শুরুতে এর নাম ছিল খুলনা থিয়েটার, তবে পরে তা আর এ নামে থাকেনি। ১৯২৪ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘নাট্য মন্দির’। ১৯৬৬ সালে আবারও এর নামের পরিবর্তন করা হয়। ঐ সময় থেকে এর নাম হয় ‘নাট্য নিকেতন’ এবং এখনও পর্যন্ত এই নামই বহাল আছে।

 

গান্ধী পার্ক / শহিদ হাদিস পার্ক :

খুলনার অধুনালুপ্ত গান্ধী পার্কের নামের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ১৮৮২ সালে জেলা সদর হিসেবে যাত্রা শুরুর পর পৌরসভার উদ্যোগে শহরে মিউনিসিপ্যাল পার্ক নামক একটি ক্ষুদ্র পার্কের প্রতিষ্ঠা ঘটে।

এ পার্ক স্থাপন করা হয় ব্রিকফিল্ড ট্যাংকের পাশে, করোনেশন হলের উল্টো দিকে। ঘটনাচক্রে একসময় তা গান্ধী পার্ক নাম ধারণ করে। ১৯২৫ সালে কংগ্রেসের বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে মহাত্মা গান্ধী বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা সফরের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের উদ্যোগে বরিশাল থেকে কলকাতা ফেরার পথে তাঁকে দু’দিনের জন্য খুলনা নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়।

ঐ বছরের ১৭ জুন সকালে তিনি স্টিমার যোগে খুলনা পদার্পণ করেন। এটি ছিল খুলনায় তাঁর দ্বিতীয়বার আগমন। তাঁর সাথে আসেন কংগ্রেস নেতা তালার জালালউদ্দিন হাশেমী এবং ডুমুরিয়ার মাওলানা আহমদ আলী। ঐ দিন বিকেলে তিনি পূর্বোক্ত পার্কে ভাষণ দেন। তখন এ পার্কের নাম ছিল মিউনিসিপ্যাল পার্ক। এ পার্কে গান্ধীর ভাষণ দেওয়ার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য এর নামকরণ করা হয় গান্ধী পার্ক।

 

Shahid Hadis Park, গান্ধী পার্ক, শহিদ হাদিস পার্ক
Shahid Hadis Park, গান্ধী পার্ক, শহিদ হাদিস পার্ক

 

কালের বিবর্তনে এখন তার নাম শহিদ হাদিস পার্ক। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে নানা আন্দোলনের স্মৃতি বহন করছে পার্কটি। একসময় এটি ‘শহিদ পার্ক’ ও ‘জিন্নাহ পার্ক’ বলেও চিহ্নিত করার চেষ্টা চালানো হয় বলে জানা যায়। তবে এ নামকরণ প্রতিষ্ঠা পায়নি। পাকিস্তান আমলে পুনরায় একে মিউনিসিপ্যাল পার্ক বলে উল্লেখ করা হতে থাকে। এরপর আসে ৬৯-এর গণআন্দোলন।

ঐ বছর ২১ ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরের হাজী মহসিন রোডে এক মিছিলের উপর গুলি বর্ষিত হয়। এতে যে তিনজন শহিদ হন, তার একজন ছিলেন হাদিস। তিনি ছিলেন শহরের একটি লন্ড্রির কর্মচারী। বাড়ি ছিল বাগেরহাট জেলার সদর থানার রণবিজয়পুর গ্রামে। অন্য দুজনসহ হাদিসের জানাজা ঐ দিন বিকেলে এ পার্কেই অনুষ্ঠিত হয়।

এ জানাজা অনুষ্ঠানেই হাদিস পার্কের নামকরণের ঘোষণা দেয়া হয়। তবে কারো কারো মতে এ ঘোষণা দেওয়া হয় পরদিন, ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি এবং স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটির সদস্য কাজী ওয়াহিদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সার্কিট হাউস ময়দানের সর্বদলীয় ছাত্র সম্মেলনে। সেই থেকেই তা শহিদ হাদিস পার্ক নামে পরিচিত।

 

জাতিসংঘ পার্ক :

ব্যতিক্রমধর্মী নাম হলেও এটি কোনো আন্তর্জাতিক বিষয় নয়। খুলনা শহরের শান্তিধামের মোড়ে অবস্থিত একটি পার্কের নাম জাতিসংঘ পার্ক। এ নামকরণের পেছনে এক ইতিহাস রয়েছে। আগে এখানে একটি পুকুর ছিল যার নাম ছিল তারের পুকুর। তার দিয়ে ঘেরা ছিল বলেই তার ঐ নাম হয়ে যায়।

পরে সে পুকুর ভরাট করে একটি বাজার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তবে বাজার প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। পরিবেশ দূষণের কথা চিন্তা করে এবং এ এলাকায় কোনো শিশুপার্ক না থাকায় সেখানে একটি পার্ক স্থাপনের দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। এমতাবস্থায় বাজার উঠিয়ে পৌরসভা কর্তৃক সেখানে একটি পার্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

 

জাতিসংঘ পার্ক
জাতিসংঘ পার্ক

 

১৯৯৪ সালে এ পার্ক তৈরির কাজ সমাপ্ত হয়। প্রথমে এর নাম দেওয়া হয় ‘মহানগর শিশুপার্ক’। এর এক বছরের মধ্যে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান এসে যায়। খুলনাবাসী জাতিসংঘের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব-অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য একে ‘জাতিসংঘ পার্ক’ নামকরণের সিদ্ধান্ত নেয়।

এ উপলক্ষে ১৯৯৫ সালের ২০ নভেম্বর এ পার্কে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নামফলক উন্মোচন। এ নামফলক উন্মোচন করেন তদানীন্তন সিটি মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমান। এ অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাশিয়ান ফেডারেশন দূতাবাসের মিনিস্টার কাউন্সিলর ড. সার্গেই ভি ভেলিচগিন। ফলে খুলনা শহরের ইতিহাসে ‘মহানগর’ এর পরিবর্তে ‘জাতিসংঘ’ শব্দটি স্থায়ী হয়ে যায়।

 

ডেলটা ঘাট :

ডেলটা ঘাটের নামকরণ করা হয়েছে জনৈক শ্বেতাঙ্গ স্টিমার কর্মচারী মি. ডেলটার নামানুসারে। একসময় এসব এলাকায় নৌপথের গুরুত্ব ছিল খুব বেশি। মাল ও মানুষের ওঠানামা তথা নৌচলাচলের সুবিধার্থে খুলনা শহর সংলগ্ন ভৈরব নদীতে যেসব ঘাট গড়ে ওঠে ডেলটা ঘাট তারমধ্যে একটি। ১৮৮০ সালে খুলনা থেকে নিয়মিত স্টিমার চলাচল শুরু হয়। ক্লে রোডের উত্তর সীমানায় তৈরি হয় স্টিমার ঘাট।

পরে এ ঘাটের পাশেই গড়ে ওঠে রেল এলাকা। ১৮৮৪ সালে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও এর পূর্বে ১৮৮০ সাল থেকেই রেলওয়ে তাদের নিজস্ব কর্মকাণ্ড শুরু করে। এজন্য নদীতীরের সামান্য অংশ বাদ দিয়ে সমস্ত চার্লিগঞ্জ, হেলাতলার পশ্চিমাংশ মিয়াবাগ শিববাড়ি এবং শেখপাড়ার এক বিরাট অংশ হুকুমদখল করে তারা তাদের কাজকর্ম আরম্ভ করে দেয়। তখন স্টিমার ঘাটকে সরিয়ে নিতে হয়।

রেলের পাশাপাশি স্টিমার সার্ভিস রাখার জন্য নদীর পাড়ে একটি ঘাট গড়ে ওঠে। এটিই স্টিমার ঘাট। পাশে নির্মাণ করা হয় গুদাম ও যাত্রী ছাউনি। ঐ সময়কার একজন স্টিমার কর্মকর্তা মি. ডেলটার নামানুসারে এ ঘাটের নাম হয় ডেলটা ঘাট। শহরে এখন কোন বিদেশি নেই। বিদেশিদের নামে যেসব স্থান বা রাস্তাঘাট তৈরি হয় তার অনেকগুলিরই নামান্তর ঘটেছে। তবে এ ডেলটা ঘাটের মধ্য দিয়ে শ্বেতাঙ্গ স্টিমার কর্মকর্তা ডেলটার নামটি এখনও স্থায়ী হয়ে আছে।

 

রুজভেল্ট জেটি:

রুজভেল্ট জেটি খুলনা শহরে ভৈরব নদী-তীরের একটি ঘাট। ঘাটটি বর্তমানে মংলা বন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন। আমদানিকৃত দ্রব্যসামগ্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণের জন্য একে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ জেটি নির্মাণ করা হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৪২ সালে জাপান বার্মা দখল করে নেয়।

এ বছরের ডিসেম্বর মাসে জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলে। তখন পূর্বদিক থেকে তাদের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার যশোর ও খুলনা শহরে সেনা ছাউনি নির্মাণ করে। পরে যশোরে একটি পুরো ক্যান্টনমেন্টই তৈরি হয়ে যায়। এ সৈন্যের একটি বড় অংশ খুলনা জোড়াগেটের উত্তরে অবস্থান নেয়।

এই ছাউনির সন্নিকটে ভৈরব নদীর তীরে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ একটি জেটি নির্মাণ করে। ঐ সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। ১৯৩৩ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

এই দিনগুলোতে তিনি আমেরিকান জাতিকে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নামে এ জেটির নাম রাখা হয় রুজভেল্ট জেটি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেমে গেছে, উপমহাদেশ আজ আর ব্রিটিশ উপনিবেশ নয়; সবই আজ ইতিহাস। তবে ঘাটটি আজও আছে এবং সেই নামেই তা রয়ে গেছে।

 

রূপসা :

খুলনা শহরের পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত নদীর নাম রূপসা। এ নদীর নাম সম্প্রসারিত হওয়ায় নদীর দু পাশের এক বিস্তৃত এলাকার নাম হয়ে গেছে রূপসা। বলা হয় রূপসা শব্দটির উৎস রূপচাদ সাহা নামক একটি ব্যক্তিনাম। তিনিই রূপসা নদীর আদি স্রষ্টা বলে মনে করা হয়ে থাকে। ইতিহাস পাঠে জানা যায় উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রূপচাঁদ সাহা নামক জনৈক লবণ ব্যবসায়ী নৌকায় লবণ আনা নেয়ার সুবিধার্থে খাল কেটে ভৈরব ও কাজিবাছার সঙ্গে মিলিয়ে দেন।

তা না হলে নদীপথে পশুর থেকে ভৈরবে পৌঁছতে দীর্ঘপথ ঘুরে যাত্রাপুর হয়ে আসতে হতো। এর জন্য এক-দেড় দিন সময় বেশি লাগতো। পথ সংক্ষিপ্ত করার জন্যই এ খাল কাটা হয়। পরে ভৈরবের মূল স্রোত ঐ খাল দিয়ে পশুর নদীতে পড়তে থাকায় কালক্রমে তা পরিণত হয় বিরাট নদীতে।

আবার কারো কারো মতে রূপসা শব্দের উৎস রউফ শাহ নামক একজন সাধক পুরুষ। এই রউফ শাহ্ ছিলেন একজন কামেল অলি প্রকৃতির মানুষ। রূপসার ওপারে তার সমাধি রয়েছে বলে কথিত আছে। অনেকের ধারণা এই ‘রউফ শাহ’ থেকেই এসেছে ‘রূপসা’ শব্দটি।

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন