খুলনা জেলার রাজনৈতিক ঐতিহ্য [ Political Heritage of Khulna District ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

খুলনা জেলার রাজনৈতিক ঐতিহ্য [ Political Heritage of Khulna District ] দীর্ঘ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে খুলনা জেলার জনগণের ব্যাপক অবদান রয়েছে। সেসব বিষয়ে কিঞ্চিৎ তুলে ধরার চেষ্টা করা হল এই আর্টিকেলে।

খুলনা জেলার রাজনৈতিক ঐতিহ্য

খুলনা জেলার রাজনৈতিক ঐতিহ্য, Khulna District Logo, খুলনা জেলার লোগো, বাঘের গর্জন, সমৃদ্ধি ও অর্জন
Khulna District, খুলনা জেলা, বাঘের গর্জন, সমৃদ্ধি ও অর্জন

 

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন:

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ আন্দোলনকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়ে বিপ্লবী আন্দোলন এবং পরবর্তী পর্যায়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। দু পর্যায়ের আন্দোলনেই খুলনা জলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। ১৮৮৩ সালের ২৮ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অ্যালবার্ট হলে ভারত সভার জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের বিভিন্ন স্থানের মতো দীঘলিয়ার সেনহাটি থেকেও প্রতিনিধিরা এ সম্মেলনে যোগ দেন।

ভারতের বহু স্থানে ‘ভারত সভার’ শাখা প্রতিষ্ঠা না করা হলেও প্রথমে এ সমিতির শাখা সেনহাটিতে স্থাপিত হয়। এ সভার নাম ছিল ‘সেনহাটি সভা’ (Senhati Peoples Association)। পরবর্তীকালে এটি ভারত সভার অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্যান্য সভার মতো এ সভারও কাজ ছিল ব্রিটিশ সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ও সরকারের কাছে নিজেদের অভাব অভিযোগ তুলে ধরা।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় তথা অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯২১ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতায় ছাত্র দিবস পালিত হয়। এ দিবস পালন উপলক্ষে খুলনার বহু ছাত্র স্কুল ত্যাগ করে আন্দোলনে যোগ দেয়। এর মধ্যে সেনহাটি স্কুলের ছাত্র প্রফুল্ল চন্দ্র সেনও ছিলেন। পরে তিনি ‘আরামবাগের গান্ধী’ নামে পরিচিত হন এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবার গৌরব অর্জন করেন।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এক পর্যায়ে বিপ্লবী আন্দোলনে রূপ নেয়। এর মধ্যে ফকির বিদ্রোহ, ওহাবী আন্দোলন, ফরায়েজি আন্দোলন এবং খেলাফত আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। এসব আন্দোলন একই সাথে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও আঘাত হানে। তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। সেনহাটিতে কমিউনিস্ট পার্টির কিছু সদস্য ছিল।

১৯০৫ সালের ১৫ নভেম্বর দৌলতপুর হিন্দু একাডেমি ও সেনহাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্ররা দৌলতপুর বাজারে হানা দেয় এবং প্রতি দোকান থেকে বিলেতি কাপড়, চিনি, লবণ নষ্ট করে। বিদেশি কাপড় জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১৯৩০ ও ১৯৩২ সালে খুলনার বিপ্লবীদের উদ্যোগে দুইটি দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটে। এর একটি হলো ১৯৩০ সালের ২৫ আগস্ট সংঘটিত কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে পুলিশ কমিশনার টেগার্ডের উপর বোমা নিক্ষেপের ঘটনা।

 

ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বধ্যভূমিতে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ
ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বধ্যভূমিতে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ

 

এ অভিযানের নায়ক ছিলেন সেনহাটি নিবাসী অনুজা চরণ সেন। তিনি সেনহাটি স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বোমাটি ছোড়ার পূর্বে বিস্ফোরিত হলে তিনি শহিদ হন। অপর দিকে ১৯৩২ সালের ৫ আগস্ট কলকাতার যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র সেনহাটির অশ্বিনী কুমার সেনের পুত্র অতুল কুমার সেন রিভলবারের গুলি চালিয়ে ওয়ার্টসনকে হত্যার চেষ্টা করেন। তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পুলিশের হাতে ধরা না দিয়ে তিনি পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

সেনহাটি কাটানিপাড়া নিবাসী শশধর আচার্য মাস্টারদা সূর্য সেনের দলের সদস্য ছিলেন। সেনহাটি গ্রামের বিপ্লবী রতিকান্ত দত্ত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত হন। স্ত্রীর আবেদনে পরবর্তীতে তিনি অবশ্য মুক্তিলাভ করেন।

ব্রিটিশ আমলে যারা কংগ্রেস রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে এ অঞ্চলে নেতৃত্ব দেন, তাঁদের মধ্যে সেনহাটির দেবেন গাঙ্গুলী, সুকলাল মিত্র ও বারাকপুরের হরিপদ বিশ্বাস উল্লেখযোগ্য। জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন সেনহাটির প্রফুল্ল চন্দ্র সেন যিনি পরবর্তীকালে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন।

ভাষা আন্দোলন :

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সারা দেশে ধর্মঘট পালিত হয়। এ-আহ্বানে সাড়া দিয়ে খুলনার মানুষও ধর্মঘট পালন করে। শহর ছাত্র-জনতার প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। এ সময় অন্যদের মধ্যে দৌলতপুর কলেজের ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন গ্রেফতার হন। পরে তিনি রাজশাহী জেলার খাপরা ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

পুলিশ দৌলতপুর কলেজের ছাত্র ডুমুরিয়ার স্বদেশ বসুকে গ্রেফতার করে। পাক-সরকার ৭ বছর রাজবন্দি করে রাখে। বিভিন্ন জেলে দীর্ঘ কারাবাসের পর তিনি ১৯৫৫ সালে মুক্তি পান।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে নিহতের ঘটনায় মিছিল, মিটিং ও পোস্টারিংয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে খুলনা। নেতৃত্ব দেন তাহমিদউদ্দীন আহমদ, জিল্লুর রহমান, নুরুল ইসলাম, এ এফ এম আব্দুল জলীল, মমিনউদ্দীন আহমদ, এসএম আমজাদ হোসেন, সমীর আহমদ, আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস, আফিলউদ্দিন প্রমুখ।

দৌলতপুর কলেজ হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এ-ক্ষেত্রে খুলনার তৎকালীন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নয়া সাংস্কৃতিক সংসদ’ অনুপ্রেরণা সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। ২৩ ফেব্রুয়ারি শহরে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। বিকেলে তৎকালীন গান্ধী পার্কে এম এ গফুরের সভাপতিত্বে বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রের নির্দেশে পরদিন এম এ গফুরকে আহ্বায়ক করে খুলনায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।

আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস, এম এ বারী, আবুল কালাম সামসুদ্দিন, আলতাফ হোসেন প্রমুখ সদস্য নির্বাচিত হন। ২৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রের নির্দেশে ধর্মঘট পালিত হয়। বিকেলে খোন্দকার আব্দুল হাফিজের সভাপতিত্বে গান্ধী পার্কে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এখানেও ভাষা সৈনিকদের উপর নির্যাতন চালানো হয়।

আবু মোহাম্মদ সামসুদ্দিন গুপ্তা কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক আহন, নিগৃহীত হন এসএমএ জলিল ও অবুল কালাম সামসুদ্দিন। মামলার শিকারে পরিণতদের বিনা ফি-তে মামলার দায়িত্ব নেন আব্দুল জব্বার, এ এফ এম আব্দুল জলীল, আব্দুল হাকিম, এ এইচ দেলদার আহমদ প্রমুখ।

ঊনসত্তরের গণআন্দোলন:

১৯৬৯-এর ২০ জানুয়ারি ধর্মঘট চলাকালে ঢাকায় মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে ছাত্রনেতা আসাদ নিহত হলে সারাদেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। খুলনাতেও ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। সারাদেশের মতো খুলনাতেও মিউনিসিপ্যাল পার্কে গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় শহরে এক বিরাট মিছিল বের হয়। ২৪ জানুয়ারি ছাত্ররা ‘মহাগণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ-দিন খুলনায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়।

২৫ জানুয়ারির হরতাল তীব্রভাবে পালিত হয়। দোকান-পাট বন্ধ থাকে। সমগ্র শহর পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। পুলিশি হামলায় দৌলতপুর ও খালিশপুরে ঐ দিন তিনজন নিহত হয়। শহরে কার্য্য জারি করা হয় ও ৩১ ঘণ্টা বলবৎ থাকে। ২৫ জানুয়ারি ডিফেন্স মিনিস্টার এ আর খানের খুলনা আগমনের প্রতিবাদে প্রায় তাৎক্ষণিক ঘোষণায় মংলা বন্দরে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা তোফায়েল আহমদের খুলনা আগমন উপলক্ষে সার্কিট হাউস ময়দানে এক বিরাট জনসভার আয়োজন করা হয়। সভায় জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দও বক্তৃতা করেন।

Khulna Gollamari Sritisoudho, গল্লামারী বধ্যভূমি
Khulna Gollamari Sritisoudho, গল্লামারী বধ্যভূমি

 

১৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সামসুজ্জোহা পাক সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হলে সারাদেশের মতো প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের ছাত্র শিক্ষকসহ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। স্থানে স্থানে জনতার সাথে পুলিশ ও ইপিআর এর সংঘর্ষ বাধে।

গণআন্দোলনের ইতিহাসে খুলনায় সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এ-দিন মিছিলে হাজী মহসিন রোডের পৌর চেয়ারম্যানের কোয়ার্টার থেকে গুলি করা হলে হাদিস ও আলতাফ নিহত হয়। আহত হন অনেকে।

শহর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বেলা একটার দিকে খালিশপুর কলকারখানার হাজার হাজার শ্রমিক মিছিল করে পৌরপার্কে এসে সমবেত হয়। এখানে নিহতের জানাজা পড়ানোর কথা ছিল। উপছে পড়া জনসমাগমের কারণে তা স্থানান্তর করে সার্কিট হাউস ময়দানে নেওয়া হয়। জানাজা শেষে মিছিলের একটি অংশ খান এ সবুরের বাড়িতে ঢুকে পড়ে ও আগুন ধরিয়ে দেয়।

এখানে ইপিআর বাহিনীর গুলিবর্ষণে প্রদীপ নিহত হন। খালিশপুরে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেনের বাড়িতেও জনতা আগুন ধরিয়ে দেয়। ২২ ফেব্রুয়ারি ৪২ ঘণ্টার কার্ফু জারি হয়। উল্লেখ্য নিহত হাদিসের নামে পৌরপার্কের নামকরণ করা হয় হাদিস পার্ক।

 

মুক্তিযুদ্ধ :

মুক্তিযুদ্ধে জেলার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমন এখানে ঘটেছে যা বিশেষ স্বাতন্ত্র্যের বহন করে। এ জেলার এক বড় অংশ ছিল সেক্টরভুক্ত। কমান্ডার মেজর এম এ জলিল। নয়মাস অনবরত চলে। তেমনি সমর। প্রলয়ংকরী যুদ্ধও হয়। বেশকিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘটনা যেমন:

১. বৃহত্তর অন্তর্গত সাতক্ষীরা থেকে ব্যাংক অপারেশনের মাধ্যমে উদ্ধারকৃত কোটি পঁচাত্তর লক্ষ টাকা নিয়েই বাংলাদেশ সরকারের শুরু হয়।

২. ১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলেও একদিন পর ১৭ই ডিসেম্বর।

৩. শিরমনিতে সংঘটিত ঐতিহাসিক ট্যাংক যুদ্ধ এক অনন্যসাধারণ ঘটনা।

৪. ভারতীয় বিমানের আঘাতে ধ্বংশ হয় পাকিস্তান সরকারের যুদ্ধ জাহাজ। এক্ষেত্রে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন। রূপসা নদীর অপর তীরে তাঁর কবর রয়েছে।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ কেন্দ্রের নির্দেশ অনুসারে খুলনায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম গঠিত হয়। এদিন এক বিশাল মিছিল কমার্স কলেজ চত্বর থেকে শুরু হয়ে শহর মিছিল পার্কে বিশাল জনসমাবেশ হয়।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও মিছিলে অংশগ্রহণ বক্তৃতা করেন।  জনসভায় বক্তৃতা করেন – শেখ আব্দুল আজিজ, সালাহউদ্দিন ইউসুফ, মোঃ এনায়েত আলী, এম গফুর, মমিনউদ্দিন আহমদ, মুনসুর হাবিবুর রহমান মীর্জা খায়বার হোসেন, কামরুজ্জামান টুকু, ম বাবর আলী, হুমায়ুন জাহিদ, ইসলাম, শরীফ খসরুজ্জামান, ইউনুস আলী ইনু, হাসিনা বানু শিরীন, শেখ কাইয়ুম,, বিনয়ভূষণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

৩ মার্চ অবস্থা গুরুতর ওঠে। স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালনকালে সমাবেত ছাত্র- শ্রমিক-জনতার বিশাল মিছিলে পুলিশের গুলিতে জয়নাল আবেদীন, মুজিবর, আমজাদ, মুসা প্রমুখ ৭ জন নিহত ও ২২ জন আহত হয়। ৪ ও ৫ মার্চ বহু লোক নিহত ও আহত হয়।

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে সারাদেশের মতো খুলনার মানুষও সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ ও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলন চলতে থাকে। ২৩ মার্চ সকাল ৯টায় নেতৃবৃন্দ হাদিস পার্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।

প্রতিরোধ ২৭ মার্চের খুলনার বৈকালী যুদ্ধে একটা স্বরণীয় ঘটনা ঘটে। পুর্ব থেকে খুলনা শহর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান বিশিষ্ট আওয়ামী নেতা খায়বার হোসেনের নেতৃত্বে প্রতিরোধ প্রস্তুতি চলছিল। পাক বাহিনীর কনভয় খুলনায় প্রবেশের পথে ওইসব স্থানে প্রস্তুতি অনুসারে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে। প্রচুর গোলাগুলির পর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে যায়। ঐদিন সিপাই মুন্সি মোজাম্মেল হকসহ ৭/৮ জন শহিদ হয়।

পরদিন ২৮ মার্চ মুক্তিবাহিনী পুনরায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়। নিউজপ্রিন্ট মিলের কর্তব্যরত ইপিআর সদস্যরা মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগ দেয়। পরিকল্পিত আক্রমণে আতঙ্কগ্রস্ত পাকসৈন্য দ্রুত পশ্চাৎপসারণ করে। যুদ্ধে বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ কিছু যুবকের এই সাহসিকতা পরবর্তীকালে জনগণের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

২৮ মার্চ যুদ্ধ শেষে পাকসৈন্যরা ফুলতলা বাজারে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। ৩১ মার্চ শহর থেকে ৮ জনকে আটক করে। এরা সকলেই ছিল হিন্দু। এরমধ্যে ৭ জনকে গুলি করে হত্যা করে। কেবল অরুণ নামের একজন সেযাত্রা রক্ষা পায়। এই হত্যাকে খুলনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

 

ডুমুরিয়া উপজেলার ১২ নং রংপুর ইউনিয়নের শলুয়া বধ্যভূমি
ডুমুরিয়া উপজেলার ১২ নং রংপুর ইউনিয়নের শলুয়া বধ্যভূমি

 

খুলনার মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বের বড় একটি ঘটনা বেতার কেন্দ্র আক্রমণ। ৪ঠা এপ্রিল বেতার কেন্দ্রটি দখলের জন্য মেজর জলিলের নির্দেশ মতো প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ, আনসার, ছাত্র-যুবক স্বাধীনতা সংগ্রামী হামলা চালায়। তুমুল লড়াইয়ের পর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। বেশ কয়েকজন যোদ্ধা শহিদ হন।

খুলনা হিন্দু প্রধান এলাকা। দাকোপ ও বটিয়াঘাটা থানায় হিন্দুদের বসবাস একচেটিয়া। পাকিস্তানপন্থি সুবিধাবাদীদের হত্যা, নির্যাতন লুটপাটের ফলে এসব এলাকার হিন্দুরা মে মাসের গোড়া থেকে ভারতে পালিয়ে যেতে শুরু করে।

মার্চ থেকে জুনের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সারাদেশের মতো খুলনাতেও অপরিকল্পিতভাবে পাকবাহিনীকে প্রতিহত করার প্রয়াস চলে। ১১টি সেক্টর গঠনের পর সেক্টর কমান্ডাররা দ্রুত নিজ এলাকায় গিয়ে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মেজর জলিল দায়িত্ব গ্রহণের পর নবম সেক্টরের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয় ভারতের ২৪ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার হাসনাবাদে।

পরে তা স্থানান্তরিত হয় টাকিতে। খুলনাসহ সমগ্র ৯ নম্বর সেক্টর নদী-নালায় ভর্তি থাকার কারণে খুলনার গেরিলারা নদীপথে টাকির সাথে যোগাযোগ রাখতো। টাকি ছাড়াও হিজলগঞ্জ ও সমশের নগরেও নবম সেক্টরের পক্ষ থেকে ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। টাকির নিকটবর্তী তকিপুরেও ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়।

১৯৯৬ সালে ২৭ ডিসেম্বর মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতাযুদ্ধ গবেষণা ফাউন্ডেশন গল্লামারিতে শহিদ স্মৃতিসৌধ চত্বরে এক পুনর্মিলনীর আয়োজন করে। সেখানে প্রদর্শিত তালিকা অনুসারে নবম সেক্টরের অন্তর্গত বৃহত্তর খুলনা জেলার মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকবৃন্দ হলেন:

১. এম. এ গফুর

২. মেজর জলিল

৩. শাজাহান মাস্টার

৪. জাহিদুর রহমান জাহিদ

৫. মোশারফ হোসেন

৬. আবুল কাসেম ইঞ্জিরিয়ার

৭. মীর্জা খায়বার হোসেন

৮. মোঃ তোরাব আলী

৯. নিখিল চন্দ্র সাহা

১০. শামসুল আলম হীরা

১১. এম. এ বারী

১২. আব্দুর রশীদ

১৩. এস এম হাবিব দুলাল

১৪. জি এম রেজাউল করিম

১৫. ক্যাপ্টেন ফোহামউদ্দিন

১৬. গাজী আকরাম আলী

১৭. স ম আলাউদ্দিন

১৮. আব্দল লতিফ সরদার

১৯. রাজেন্দ্রনাথ মণ্ডল

২০. মাস্টার আফছার আলী

২১, গাজী আর মুসা

২২ সোলাইমান সরদার

২৩. মোল্লা আকবর আলী

২৪. অমল মণ্ডল

২৫. মোঃ জাহাবক্স

২৬. চিত্তরঞ্জন

২৭. অজয় চরণ দত্ত

২৮. ডা. মুনসুর আলী

২৯. আবু তালেব ইমদাদুল ইসলাম

৩০. এম. এমদাদুল হক

৩১. বুলবুল

৩২. অধ্যাপক আবু সুফিয়ান

৩৩. গোলাম রসুল আদম

৩৪. আবদুস সামাদ

৩৫. শাহ মোঃ আফজার শাহীন

৩৬. মুকুল প্রমুখ।

খুলনার বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আব্দুল আজিজকে নয় নম্বর সেক্টরের লিয়াজো অফিসার নিযুক্ত করা হয়। সেক্টর কমান্ডারের সাথে মতানৈক্য হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করে সহায়ক সমিতির সাহায্য নিয়ে ধলচিতা, নৈহাটি, পাকুন্দিয়া ও পাকসেনায় চারটি ক্যাম্প স্থাপন করে যুবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

খুলনা সাব-সেক্টরের প্রধান করা হয় পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী সামরিক কর্মকর্তা মেজর এ এস এম সামছুল আরেফিনকে। নয় নম্বর সেক্টরে অন্য যে-সব পক্ষত্যাগকারী সামরিক কর্মকর্তা যোগদান করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মেজর এম এ জলিল, লে. এ এইচ জিয়াউদ্দিন, মেজর শাহজাহান, মেজর মেহেদী আলী ইমাম, মেজর আহসানউল্লা, ক্যাপ্টেন শচীন কর্মকার, মেজর সৈয়দ কামালউদ্দিন, মেজর সৈয়দ নুরুল হুদা প্রমুখ।

খুলনার মুক্তিযুদ্ধে বহুল আলোচিত মুজিব বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বৃহত্তর খুলনায় এর প্রধান করা হয় শেখ কামরুজ্জামান টুকুকে। সদস্য রিক্রুট করা হতো পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট শহরস্থ ক্যাম্পে। বৃহত্তর খুলনায় ২২টি ক্যাম্প ও প্রধানের নাম পাওয়া যায়। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট ক্যাম্প ছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়। এ-সব ক্যাম্পে ৮-১০ থেকে ২৫-৩০জন পর্যন্ত যোদ্ধা অবস্থান করতো।

খুলনায় স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠে মধুর বাহিনী, মানসের বাহিনী, খালেদ রশীদ বাহিনী, তেরখাদার ফোহামের বাহিনী প্রভৃতি। ফোহাম বাহিনীর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য। এদের দলে বহু ১৩-১৪ বছরের কিশোর ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধের মাঝ পর্যায়ে আগস্ট মাসে খুলনায় স্থলবাহিনীর সাথে যোগ দেয় নৌ কমান্ড দল। ১৫ আগস্ট নৌ-কমান্ড দল মংলা পোর্ট অভিযানে অংশগ্রহণ করে। নেতৃত্ব দেন নৌ-কমান্ড নেতা সাবমেরিনার আহসান উল্লাহ। মংলা-খুলনা নৌপথের যুদ্ধ সমন্বয়কারী ছিলেন এ এস এম সামছুল আরেফিন।

খুলনায় বহু যুদ্ধ সংগঠিত হয়। শহরে পাকসেনারা বহু স্থানে ঘাঁটি স্থাপন করে। উল্লেখযোগ্য ছিল সার্কিট হাউস, ইউ এফ ডি ক্লাব, বাংলাদেশ ব্যাংক, গল্লামারি বেতার কেন্দ্র, লায়ন্স স্কুল, নেভাল বেস, গোয়ালখালি অন্ধ স্কুল, বি এল কলেজ, ফুলবাড়ি প্রভৃতি। শহরের বাইরে বড় ঘাঁটি ছিল চালনা বাজার, মংলা ও পাটকেলঘাটায়।

শহরে রাজাকারদের প্রধান ঘাঁটি ছিল ভূতের বাড়ি, পান চাষি ভবন, বয়রা সার্কিট হাউস, লায়ন্স স্কুল ও বিভিন্ন মিলে। খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন মিলের রাজাকারদের নিয়ন্ত্রণ করতো বিহারীরা।

শহরের বাইরের উল্লেখযোগ্য রাজাকার ঘাঁটিগুলো ছিলো কপিলমুনি, বুধহাটা, কেয়ারগাতি, বড়দল, চালনা, বাজুয়া, দাকোপ, পাইকগাছা, পাটকেলঘাটা, চুকনগর, ঝাউডাঙ্গা, ফুলতলা, মংলা, বারোআড়িয়া, জলমা, বটিয়াঘাটা প্রভৃতি।

এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি আতংক সৃষ্টিকারী ছিল কপিলমুনি বাজারে রায় সাহেব বিনোদ সাধুর পরিত্যক্ত প্রাসাদোপম দ্বিতল বাড়িতে স্থাপিত কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্প। এই ক্যাম্প থেকে বহুদূরের অন্যান্য ক্যাম্পও নিয়ন্ত্রণ করা হতো।

খুলনা জেলায় সংঘটিত সম্মুখ সমর ও সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যে ১৫ আগস্টের কপিলমুনি যুদ্ধ অন্যতম। এই আক্রমণে নেতৃত্ব দেন প্রাক্তন তথ্যমন্ত্রী দিদার বখতের ভাই সৈয়দ কামাল বখত। ইতিপূর্বে একাধিকবার মুক্তিযোদ্ধারা এই রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করেছিল। এই ক্যাম্পটি আশেপাশের মানুষের কাছে মৃত্যুর বিভীষিকা হয়ে উঠেছিল। এই ক্যাম্পে ১৫১ জন রাজাকারের শোচনীয় মৃত্যু ঘটে।

খুলনার নদীপথের কেয়ারগাতি যুদ্ধ, বোয়ালিয়া যুদ্ধ; আলাইপুর যুদ্ধ, বটিয়াঘাটা থানা আক্রমণ, নলেন ফরেস্ট আক্রমণ, বয়ারভাঙ্গা যুদ্ধ, কাপালিডাঙ্গা যুদ্ধ, লক্ষ্মীখালি যুদ্ধ, চালনা বাজার যুদ্ধ, বারোআড়িয়ার যুদ্ধ, বাজুয়া যুদ্ধ, শিরোমনি যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া অসংখ্য ছোটবড় যুদ্ধের কথা জানা যায়।

সারা দেশের মতো খুলনাতেও মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবময় ভূমিকা হলো নৌযুদ্ধের সার্থকতা। নৌকমান্ডো আক্রমণের বেশ কয়েকটি ঘটে খুলনার মংলা বন্দরে। মংলা বন্দরকে পুরোপুরি অকেজো করে দেওয়া হয় ‘অপারেশন জ্যাকপট’ অভিযানে। ১৩ জন বাঙালি নৌসেনার মধ্য থেকে যে ৮ জন ফ্রান্স থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তাদের মধ্যে রহমতউল্লাহ ছিলেন খুলনার অধিবাসী।

১৯৭১-এর মধ্য আগস্ট থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন আক্রমণে প্রায় ১৩২ টি ছোটবড় জাহাজ ধ্বংস করে মুক্তিযুদ্ধের নৌকমান্ড। অনেকের মতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নৌ অভিযানে নৌকমান্ডরা যে কৃতিত্ব দেখিয়েছে বিশ্বে তার তুলনা মেলা ভার।

১৭ই ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী সার্কিট হাউস ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় দলের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার দলবীর সিং, মেজর মঞ্জুর, মেজর জলিল, মেজর জয়নাল আবেদীনের সম্মুখে আত্মসমর্পণ করে।

মুক্তিযুদ্ধকালে পাকবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা খুলনা অঞ্চলে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। খালিশপুরস্থ মুন্সিবাড়ি গণহত্যা, রংপুর গণহত্যা, পাটকেলঘাটা হত্যাকাণ্ড, হত্যাকাণ্ড, ফুলতলা হত্যাকাণ্ড, চরেরহাট গণহত্যা, বাজুয়া গণহত্যা, কাটাখাল গণহত্যা, বিপ্র আজোপাড়া গণহত্যা, বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিস গণহত্যা, তেরখাদা গণহত্যা, চালনাবাজার গণহত্যা, ঝিলেখালি গণহত্যা, বাদামতলাবাজার গণহত্যা, চুকনগর গণহত্যা, শিরোমনি গণহত্যা, আলাইপুর গণহত্যা ইতিহাসে দুঃখজাগানীয়া হয়ে আছে।

পাকিস্তানি সৈন্য ও দোসররা গণহত্যার জন্য তাদের সুবিধামতো জায়গায় বধ্যভূমি গড়ে তুলতো। বহু বধ্যভূমির মধ্যে খুলনার ফরেস্ট ঘাট বধ্যভূমি, চুকনগর বধ্যভূমি, গল্লামারি বধ্যভূমি, খুলনা রেলস্টেশন বধ্যভূমি, গোয়ালপাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র বধ্যভূমি, ক্রিসেন্ট জুটমিল বধ্যভূমি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসবের মধ্যে চুকনগর বধ্যভূমি ইতিহাসে বিশেষ স্থানের মর্যাদা পেয়েছে। কত শত-সহস্র মানুষকে দেশের স্বাধীনতার জন্য এই বধ্যভূমিতে বলিদান করতে হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন:

দাকোপ উপজেলা, খুলনা

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন