চরমপত্র [ Chorompotro ], জুলাই মাস ১৯৭১ [ July 1971 ] – এম আর আখতার মুকুল [ M. R. Akhtar Mukul ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

চরমপত্র [ Chorompotro ], জুলাই মাস ১৯৭১ [ July 1971 ] – এম আর আখতার মুকুল [ M. R. Akhtar Mukul ] : জুলাই মাসে প্রকাশিত সকল চরমপত্রের সংগ্রহশালা। চরমপত্র ১৯৭১ সালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আওতায় স্থাপিত, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একটি বেতার অনুষ্টান। এই অনুষ্টানটিকে সেসময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান বলা যায়। সাংবাদিক এম আর আখতার মুকুল এই চরশপত্র রচনা করতেন ও রেডিওতে উপস্থাপন করতেন। চরমপত্র অনুষ্টানটি শুরু হয় ২৫শে মার্চ থেকে। পুরো মুক্তিযুদ্ধের বছর জুড়ে অনুষ্টানটি প্রচারিত হয়। শেষ অনুষ্টিানটি হয় ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১।

চরমপত্র, এম আর আখতার মুকুল
চরমপত্র, এম আর আখতার মুকুল

 

এই অনুষ্টানে রনাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাবপক ভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সেই সাথে দেশের মানুষের মনোবল বাড়িয়েছে। অনুষ্টানে যোদ্ধাদের গোপনীয়তার স্বার্থে অনেক নাম এবং স্থানের নাম সংকেতে বা অন্য কোন নাম দিয়ে বলা হতো। চরমপত্র খ্যাত ব্যক্তি গেরিলা এম আর আক্তার মুকুল রাতারাতি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন সমস্ত দেশের মানুষের কাছে। এম আর আক্তার মুকুল এর পুরো নাম মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক পরিক্ষায় চরমপত্র নিয়ে প্রশ্ন আসে। সেসব প্রশ্নের মধ্যে থাকে – চরমপত্র কি, বা চরমপত্র কী ? চরমপত্র অর্থ কি ? চরমপত্র বলতে বোঝায় ?  চরমপত্র কে পাঠ করতেন? চরমপত্রে কি পাঠ করা হতো? চরমপত্র খ্যাত ব্যক্তি কে? চরমপত্রের শেষ দুটি লাইন কোন ভাষায় ছিল? মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বেতারের ভূমিকা, চরমপত্র পাঠ, চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার, ইত্যাদি। শিক্ষার্থীরা আমাদের এই সিরিজটি পড়লে গল্পের মাধ্যমে সেসব উত্তরও পরিস্কার হয়ে যাবে। তাছাড়া ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপুর্ন তথ্যও জানা হয়ে যাবে। চরমপত্র ডাউনলোড করা দরকার হলে, চরমপত্র pdf download খোঁজা দরকার নেই, এখান থেকেই কপি করতে পারবেন।

চরমপত্র, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

চরমপত্র জুলাই মাস ১৯৭১

১ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

এগুলা কি কারবার হইতাছে? আইজ আটানব্বই দিন ধইরা বাংলাদেশে তুফান Fight করতাছি, তবুও এ লড়াই-এর একটা হিল্লে হলো না? আমি ইয়াহিয়া খান একবারও কইতে পারলাম না যে, সমস্ত বাংলাদেশ অক্করে জয় কইর‍্যা ফেলাইছি। কেবল একটা কথাই বার বার কইরা চিল্লাইতাছি, Situation Normal-অবস্থা সম্পূর্ণ আয়ত্বের মধ্যে

এসে গেছে। কিন্তুক আমি তো Report পাইতাছি হেইখানে অহন কি করবারটা চলতাছে? পিআইএ-এর মধ্যেই ছয়শ’ একানব্বইডা অফিসারের লাশ ঢওয়াইছে। আর জোয়ানগো তো আল্লারওয়াস্তে লিল্লাহ কইরা দিছি। কত কষ্ট কইরা পাকিস্তানে এইসব খবর চাপিস্ করতাছি। এদিকে পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকটারে তো গাং করছি, একশ’ টাকা পাঁচশ’ টাকার নোট বেআইনী করছি, নতুন ট্যাক্স বহাইছি, ডাক মাশুল বাড়াইছি, চেক ভাঙ্গাইলে— ড্রাফট বানাইলে পহা লইতাছি, তবু তবুও কোনো কিনারা করতে পারতাছি না।

চরমপত্র এম আর আখতার মুকুল 3 চরমপত্র [ Chorompotro ], জুলাই মাস ১৯৭১ [ July 1971 ] - এম আর আখতার মুকুল [ M. R. Akhtar Mukul ]

 

সেনাপতি ইয়াহিয়ার অহন মনডা খুবই খারাপ। খালি ফিস্‌ফিস্ করে বলছেন, ‘এই কালু এলায় হাইরা যা, অনেকক্ষণ তো হইছে।’ কি কইলেন? কেইডা ঠিক মতন বুঝতে পারলেন না? তয় কইত্যাছি হনেন।

একবার বরিশাল গিয়েছিলাম। শীতকাল। আলেকান্দায় পাড়ার ছেলেরা সব নাটক করছে। নিজেরাই লিখে একটা ঐতিহাসিক নাটক অভিনয়ের ব্যবস্থা করেছে। সময় কাটাবার জন্য একটা র‍্যাপার মুড়ি দিয়ে হাজির হলাম। একটা দৃশ্যে দেখলাম অক্করে তুফান কারবার। দর্শকদের কেউই আর সিটে বসে নেই। সব্বাই চিৎকার করতে শুরু করেছে। দৃশ্যটাতে সুন্দর হ্যাংলা চেহারার নায়ক বিরাট স্বাস্থ্যবান প্রতি-নায়কের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।

নাটকে লেখা আছে কিছুক্ষণ লড়াই-এর পর নায়ক তার প্রতিদ্বন্দ্বীর বুকের উপর চেপে বসে বিজয় উল্লাস করছে। কিন্তু নাটক অভিনয়ের সময় এক কুফা অবস্থার সৃষ্টি হলো। সুদর্শন নায়ক নিচে চিৎ হয়ে পড়ে আছে আর ফিস্ ফিস্ করে বলছে, ‘এই কালু এলায় হাইর যা। অনেকক্ষণ তো হইছে।’ আর মোটাসোটা লোকটা নায়কের বুকের উপর বইস্যা জোরে জোরে চিল্লাইতছে ‘পারলে ফালাও- কেমন বেডাখান দেখুম।’

বাংলাদেশের কেদো আর প্যাকের মধ্যে এখন এরকম একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিফৌজের কেচ্‌কা মাইরের চোটে হানাদার ফৌজ চিত্তর হইয়া ফিস্ ফিস্ কইরা কইতাছে, ‘এলায় হাইর‍্যা যা, অনেকক্ষণ তো হইছে।’ কিন্তুক ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের জানা উচিত এটা নাটকের অভিনয় নয়- এটা হচ্ছে বাস্তব সত্য।

১৯৫১ সনে যেখানে আধা ডিভিশন সৈন্য রাইখ্যা কাম হইছিল, ১৯৭১ সনে সেখানে পাঁচ ডিভিশনেও কোনো কাম হইতাছে না। কেমন বুঝতাছেন- মাসে কতদিন যাইতাছে? কোবানীর চোটে অহন কান্দলে কি অইবো? চিয়াংকাইশেকের তো ফরমোজায় জায়গা হইছিল, কিন্তু আপনাগো লাইগ্যা তো বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইতাছি না।

রেডিও 14 চরমপত্র [ Chorompotro ], জুলাই মাস ১৯৭১ [ July 1971 ] - এম আর আখতার মুকুল [ M. R. Akhtar Mukul ]

 

একদিনের রিপোর্ট দিতাছি। রংপুরে তিন জায়গা থনে মুক্তিফৌজ গেরিলাগো কোবানীর চোটে হানাদার সৈন্য ভাগছে। হেগো Moral খুব Strong কিনা? সে কি দৌড়? ঢাকার ইসলামপুরে ভীড়ের মধ্যে 2 (A) টাউন সার্ভিসের বাস আটকে গেলে যেতে কইর‍্যা বাসের কন্ডাকটর বাস থুইয়া দৌড়ে সদর ঘাট যাইয়া হাজির হইয়া কয়, ‘আইয়্যা পড়ছি’- ঠিক একইভাবে এই হানাদার সৈন্যরা এক দৌড়ে রংপুরের টাউনের কামাল কানায় হাজির হইছে। কিন্তুক যা গেছিল হেই নাম্বার ফেরৎ আইতে পারে নাই। বাকিগুলা পড়ল তুলছে।

রংপুরের অমরখানাতেও একই অবস্থা হয়েছে। আর রংপুর থনে মাত্রক তিরিশ মাইল উত্তরে হাতিবান্ধা আর বড়খাতাতে আহা-রে কি মাইর! মাইরের চোটে ভাগনের সময় গুলি- মেসিনগান, ট্রাংক, স্যুটকেস- এমন কি নীলো আর সাবিহার ফটো পর্যন্ত লওনের টাইম পায় নাইক্যা।

কথা নেই বার্তা নেই মুক্তিফৌজের গেরিলারা ঠাকুর গাঁ-এর পূর্ব দিকে হানাদার সৈন্যদের একটা ফাঁড়ি অক্করে ডাবিশ্ কইরা ফ্যালাইছে।

সিলেটের জাফলং আর সোনাপুরায় হানাদার বাহিনী একবারে তক্তা হয়ে গেছে। যশোর সেক্টরের কথা আর কওন যায় না। মুক্ত এলাকায় হামলা করণের লাইগ্যা হেগো চিরকিৎ হইছিল। মাত্র বারো ঘণ্টার লড়াই। তারপর হেরা আর ভাগোনেরও টাইম পাইলো না। হগ্‌গলেই রইয়্যা গ্যালো। হেগো আর দৌড়াইয়া ভাগোনের কষ্টডা করতে হয় নাই।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় হানাদার সৈন্যরা তিনটা মোটর বোটে ‘মউতের খোঁজে’ বেরিয়েছিল। হ-অ-অ ‘মউতের’ লগে হেগো মোলাকাত্‌ হইছে। অহন তিনডা মোটর বোটের মাইদ্দে জয় বাংলার ফ্ল্যাগ উড়তাছে।

এতো কইর‍্যা না করলাম। যাইস্ না। হেই রাস্তায় যাইস্ না। হাতি যেমন বরই গাছ তলায় যায় না- তোমরাও হেই রকম হেই রাস্তায় যাইয়ো না। নাঃ আমার কথা হুন্‌লো না। অহন মাইরের চোটে চোখে সর্ষে ফুল দেখতে শুরু করছে। কুমিল্লা, রাজশাহী, বগুড়া আর ফরিদপুরের কথা হুনলে বাকিগুলা ডরাইবো। তাই আজ আর বেশি খবর দিমু না। মাইর খাওনের আগেই যদি ভাগে?

সেই জন্য বলেছিলাম, সেনাপতি ইয়াহিয়া অহন চেইত্যা গেছেন আর চিল্লাইয়া কইতাছেন, ‘এগুলা কি কারবার হইতাছে? আইজ আটানব্বই দিন ধইরা বাংলাদেশে তুফান Fight করতাছি, তবুও এ লড়াই-এর একটা হিল্লে হলো না?

সেনাপতি ইয়াহিয়া অহন চিৎ হইয়া ফিস্ ফিস্ কইরা কইতাছেন, ‘এই কালু এলায় হাইরা যা, অনেকক্ষণ তো হইছে। এলায় হাইরা যা’।

 

৪ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

ফাতা-ফাতা। ওদিকে অহন ফাতা-ফাতা অবস্থা শুরু হয়ে গেছে। আর লুকোচুরির কারবার লাইক্যা। অহন দিনে দুপুরে ডাকাতি শুরু হয়েছে। রেডিও গায়েবী আওয়াজ থনে একটা জব্বর খবর বাইরাইছে। বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার হগল জুটমিল আর পাটের গুদামের যত পাট আছে তামাম জুট বোর্ডের সম্পত্তি।

 

এম আর আখতার মুকুল
এম আর আখতার মুকুল

 

এলায় বুঝছেন টিক্কা সা’বের রাজত্বে ক্যামন সোন্দর সব ব্যবস্থা হইতাছে। এতোদিন হুনছিলাম পাকিস্তানের বেবাক সম্পত্তি আল্লাহ্র সম্পত্তি। কিন্তু আইজকাইল মুক্তিফৌজের গাবুর মাইরের চোটে সব অক্করে গড়বড় হইয়্যা গ্যাছেগা। হগল সম্পত্তি অহন ইয়াহিয়া-টিক্কার সম্পত্তি। হ্যাগো যা খুশি তাই-ই করবো, আপনার তাতে কি? জানেন না, আগে আপ্ তার পরে বাপ্।

একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন। ঢাকায় আমাগো হুমায়ুন বশীর সা’বের লগে গোলাম কাদের সা’বের Fight হইতাছে। বশীর সা’বের লণ্ঠন আর কাদের সা’বের নৌকা। তুফান Fight। তখন আমি যোগীনগর লেইনের মাইদ্দে থাকি।

একদিন সন্ধ্যায় নারিন্দায় যুক্তফ্রন্টের এক জনসভা। যেয়ে দেখি এক ঢাকাইয়া লোক জোর বক্তৃতা করছেন, ‘বুঝছেন ভাই সা’বরা, বাপ মায়ে আমারে বেশি ল্যাহা-পড়া হিকায় নাইক্যা। তাই লেকচার দিতে পারুম না। তয় আপনাগো কিছু মেছাল হুনামু। অমাগো মহল্লার মাইদ্দে এক মওলবী সা’ব আছিল। একদিন মহল্লার লোকজনে সব সর্দার সা’বের কাছে আইস্যা নালিশ করলো। সর্দার সা’ব, এই মওলবী আমাগো মসজিদের মাইদ্দে উন্ডা-পান্ডা নামাজ পড়াইতাছে। সর্দার সা’বে লগে লগে মহা গরম । উল্টা-পাল্‌ডা নামাজ পড়াইতাছে, কারবারডা কি? পাড়ার পোলাপানে দৌড় দিয়া মওলবী সা’বরে ধইরা আনলো। সর্দার সা’বে কইলো, ‘আবে এই মওলবী সা’ব এলায় গাট্টি-বোচ্চ্কা বাধেন আর কি? আপনের কাটনের টাইম্ আইছে।’

মওলবী সা’ব হাত কচলাইয়া কইলো, দ্যাহেন সর্দার সা’ব আমার লগে যে কেতাব আছে, হেই কেতাব দেইখ্যাই তো নামাজ পড়াইতাছি।

সর্দার সা’বে কেতাবডা হাতে লইয়্যা দ্যাহে কি পয়লাই ল্যাখা আছে মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ, লবণের সের ষোল ট্যাহা, নারিয়েল তেল বারো ট্যাহা, কাপড়ের জোড়া পঞ্চাশ ট্যাহা, আর চাল কেরাসিন ব্যালাক্। সর্দার সা’বে কইলো আমাগো এহানে এই কেতাব চলবো না- এইডা তো লাহোরে ছাপা অইছে। আমাগো চক বাজারের ছাপা কেতাব লইয়্যা আহেন ।’ হেইডার মাইদ্দে লেখা রইছে যুক্তফ্রন্ট জিন্দাবাদ। এক আনা সের লবণ। দুই টাকা সের নারিকেল তেল। সাত টাকা মন চাল আর আট টাকা জোড়া শাড়ি।

সেই জন্য বলেছিলাম লাহোর-রাওয়ালপিণ্ডিতে ছাপা ইয়াহিয়া-টিক্কার ডাহিনা-মুড়া দিয়া লেখা কেতাবে তাজ্জব সব কারবার হইতাছে। বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় হানাদার সৈন্য দিয়ে পাবলিক ছাড়াও গবর্ণমেন্টের ২৬ কোটি টাকার বাড়ি-ঘর ভাঙ্গানোর পর এলায় ১৫ কোটি টাকা দিয়া মেরামত কইরা চুনা লাগাইতাছে।

রেডিও ২ চরমপত্র [ Chorompotro ], জুলাই মাস ১৯৭১ [ July 1971 ] - এম আর আখতার মুকুল [ M. R. Akhtar Mukul ]

 

বাঙালি পোলাপান Murder-এর পর মীরপুর-মোহাম্মদপুরের মক্তব-মাদ্রাসার থনে শেখ কালুগো পোলাপান ধইরা, নতুন ফুলপ্যান্ট পিন্দাইয়া, গাড়িতে কইরা আইন্যা স্কুলের কেলাসের মধ্যে বহাইয়া টেলিভিশনের ফিলিম তুলতাছে। পহেলা গ্রামের মধ্যে ঢুইক্যা খুন, জখম আর আগুন লাগাইয়া বেবাক মানুষরে খেদানোর পর অহন আবার Reception counter-এর লাইগ্যা হা-ডু-ডু খেইল্যা জ্যান্ত মানুষ ধরনের লাইগ্যা পেরেশান হইয়া উঠছে।

টঙ্গী তেজগাঁ, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, খুলনা-খালিশপুর আর চিটাগাং-হালি শহর থনে হগল মজদুরগো খুন আর খেদানোর পর অহন আবার মিল-ফ্যাক্টরি চালু করনের লাইগ্যা কয়েকদিন বাদ বাদই রেডিওর মাইদ্দে আম-দাওয়াত দিতাছে।

এতো সব কারবার করণের পরও যখন খালি No-reply হইতাছে, তখন মোক্ষম কাম শুরু করছে হেই যে কইছিলাম হেগো কাছে লাহোর-রাওয়ালপিণ্ডির কেতাব আছে। হেই কেতাব মোতাবেক অহন পাকিস্তান আর বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার হগ্গল সম্পত্তি আল্লাহর বদলে হেরাই দখল কইর‍্যা বইছে। ট্যাকা-পহা-ধনসম্পত্তি সব হেগো

কি সোন্দর এলান করছে। সমস্ত জুটমিল আর গুদামের পাট এখন জুট বোর্ডের সম্পত্তি জুট বোর্ড এ’সব কাঁচাপাট বিদেশে রফতানী কইর‍্যা বাঙালি মারণের জন্য গুলি বন্দুক কিনবো জুটমিলগুলো সমস্ত বন্ধ থাকনের জন্য দেশের মাইদ্দে আর কাঁচা পাটের দরকার নাইক্যা।

সেজন্য টিক্কা সা’বের মার্শাল ল’ গবর্ণমেন্টে এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, ব্যাংকের অধীনে গুদামে যেসব পাট রয়েছে সেগুলো জুট-বোর্ড রফতানী করে দিবে। আর এজন্য এই মুহূর্তে কোনো মাল-পানি দেওন সম্ভব না। সবই টিক্কা সাবে তাঁর নোট বইয়ের মাইদ্দে ঢুইক্যা থুইতাছেন।

কিন্তু ভাই সা’ব, অহন পাট, পাট কইর‍্যা চিল্লাইলে কি আইবো খুবই লেইট কইর‍্যা ফ্যালাইছেন। হগ্গল গুদাম খালি। হেই সব গুদামে অহন চামচিকা ঘুরতাছে। আর এই বচ্ছর পাট চাষ হয় নাইক্যা- সবই ঠন ঠন্।

 

মুক্তিযোদ্ধাদের পথচলা
মুক্তিযোদ্ধাদের পথচলা

 

আমি বলি কি, একটা কাম করবাইন পাকিস্তান থাইক্যা আরো কিছু সৈন্য আর গায়ের এলাকার ফৌজ এনে পাট বোননের লাইগ্যা duty দেন। হেরা তহন বুঝতে পারবো কত ধানে কত চাল হয়। আর এদিকে ফকা, ফরিদ, সবুর তো খালি হুইত্যা হুইত্যা টাইম কাডাইতেছে- হেগো এই পাট বোননে Advisor কইর‍্যা দেন। কামে দিবো। আর চা-বাগানগুলা?

অ-অ-অ হেইগুলাও তো জ্বালাইছেন। চা-গাছ বোননের ব্যাপারে হরিবল হক চৌধুরী খুবই ভালো Appointment। খালি হের হাতে নগদ টাকা দেবেন না। তা হইলেই এলনবেরির ড্রাম ফ্যাকটরি সেইজন্য বলেছিলাম ফাতা-ফাতা। ওদিকে অহন ফাতা-ফাতা অবস্থা শুরু হয়েছে।

হেরা নতুন কেতাব ছাপাইছে। এতোদিন হুনছিলাম পাকিস্তানের বেবাক্ সম্পত্তি আল্লাহর সম্পত্তি। কিন্তুক নতুন কেতাবে হগ্গল সম্পত্তি অহন ইয়াহিয়া-টিক্কার সম্পত্তি। তবুও হেগো রাইতের ঘুম ছুইট্টা গেছে।

 

৫ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

আধা-খ্যাড়া। এই একটা শব্দের উপরেই অহন মাইর-পিট চলতাছে। সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারের বড় বড় গোঁফ আর ভুঁড়িওয়ালা জেনারেলদের যাঁরা বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় মুক্তিফৌজের আকা আর গাবুর মাইরের চোটে ধানুধা মাইরা গেছেন, তাঁরা আধা-খ্যাড়া কাম করবো না বইল্যা এহনও চিল্লাইতাছেন।

 

চরমপত্র
চরমপত্র

 

হানাদার ফৌজের 9th Division-এর কম্যান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল শওকত রাজা বলেছেন যে, আমরা খামোখা এতো মাল-পানি খরচ কইরা এতো দূর থনে আহি নাইক্যা। আমরা একটা মিশন লইয়া আইছি। আর এই মিশনের কাম শ্যাষ না হওয়া পর্যন্ত আমাগো Action চলবোই। আমরা তো আর বার বার আইতে পারুম না? আধা খ্যাড়া কাম কইরা পলিটিশিয়ানগো হাতে এই মুলুক্টা দিয়া গেলে আবার গড়বড় শুরু হইবো। তাই দুমনগো পুরা খতম করণের পরই আমরা আবার দ্যাশে ফিইরা যামু।’

একটা ছোট্ট গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। একবার আমাগো ঢাকার মাইদ্দে হলু মিয়া আর মেরূহামত মিয়া মিল্যা রেস খেলবার গেছিলো। ময়দানে যাইয়া ছক্কুর মুখ দিয়া খালি খই ফুটতাছে রাজা-উজির মাইরা চলছে। মানে কিনা ছক্কু রেস খেলবার আইলেই খালি বাজি জিত্যা ফ্যালায়। হেই লাইগ্যা বেশি আহে না।

তা’ অইলে অন্য মাইনষে করবো কি? হ্যাষে হেই দিন ছক্কু মিয়া হীরামনের উপর টিকিট কিনলো। আর মোরহামত মিয়ারে কইলো, ‘বুঝছো নি, হীরামন অক্করে পঙ্খিরাজ। যহন রেস শুরু অইবো তহন দেখবা অক্করে উড়াল দিয়া যাইতাছে। আর হীরামনের জকি পবন বাহাদুররে তো তুমি চেনোই? আঃ হাঃ তুমি দেখি অক্করে কাউলা হইছো? পবন বাহাদুরের মেডেলের ওজন তো এক মনের মতে অইবো।

একবার করেছিল কি- এই পবন বাহাদুর দুলদুল লইয়া রেসে নামছে। পয়লা থনেই ফাস্ট যাইতাছে। খানিক দূর যাওনের পর আত্মা দুলদুল ঠ্যাং ভাইঙ্গা পইড়্যা গেল। হ্যাষে পবন বাহাদুর ঘোড়া ছাড়াই দৌড়াইয়া অক্করে পয়লা যাইয়া হাজির হইল। হের পর শুরু হইল মহা গ্যান্জাম। তারপর বুঝছোনি। ছয় মাস ঢাকায় রেস খেলাই বন্ধ।’

মেরূহামত মিয়া বগ সিগরেটটার মাইদ্দে একটা কড়া টান দিয়া কইলো, ‘হ-অ- বুঝছি। আইজ যহন তোমার লগে আইছি, তহন আমার কপালে না জানি কি আছে? যাউগ্গা, তোমার হীরামনে আইজ কার লগে Fight করবো?”

 

মুক্তিযুদ্ধে বিচ্ছুর দল
বিচ্ছুর দল

 

ছক্কু মিয়া একটা অবজ্ঞার হাসি দিয়া কইলো, ‘হুনতাছি কই থনে Diamond Queen বইল্যা একটা ঘোড়া আইছে। হেইডাই নাহি হীরামনের লগে টক্কর দিবো। আরে কিসের লগে কি?

মিনিট কয়েকের মধ্যেই সাত নম্বর রেস শুরু হয়ে গেল। তুমুল চিৎকার। আর বিকট হৈ চৈ। এর মধ্যে দেখা গেল Diamond Queen বাকি সবগুলো ঘোড়াকে বহু পিছনে ফেলে Victory Stand-এ পৌঁছে গেছে। আর বাকি ঘোড়াগুলোর মধ্যে কে সেকেন্ড হবে সেটা নিয়েই সাংঘাতিক Fight চলতাছে। হঠাৎ করে মেরহামত মিয়া লক্ষ্য করে দেখলো যে বাকি ঘোড়াগুলোর সবচেয়ে পেছনে মুখে ফেনা বের করে হীরামন হাঁপাতে হাঁপাতে আসছে। তাই মেরহামত মিয়া আর মন্তব্য না করে পারলো না।

‘আবে এই ছক্কু মিয়া, তোমার হীরামনরে লইয়া পবন বাহাদুর যে অক্করে লাস্টে আইতাছে? খেল্ শুরু হওনের আগে তো খুবই চোটপাট করতাছিলা? এলায়?

ছক্কু মিয়া তার সাদা দাঁতগুলো বের করে বললো, ‘আরে ধূর আইজ আমাগো পবন বাহাদুর হীরামনরে লইয়া নতুন কিসিমের খেল করতাছে। দেখছো কেমন সুন্দর বাকি হগ্গল ঘোড়াগুলারে খেদাইয়া আনতাছে? ব্যাড়া একখান আর কি? সেনাপতি ইয়াহিয়া অহন পবন বাহাদুর হইছে। আর হের হানাদার বাহিনী অহন হীরামন হইছে।

যে মুক্তিফৌজের লগে টক্কর লাগবো, তাগো তালাশ কইরাই পাইতাছে না। তাই দম্ খিচ্চ্যা হিয়াহিয়া সা’বে অহন হানাদার বাহিনী দিয়া গেরামের লোকগুলারে খালি ধাওয়াইয়া বেড়াইতাছে।

এদিকে ঢাকা থাইক্যা খুব জব্বর খবর আইছে। এসোসিয়েটেড প্রেস অব আমেরিকার প্রতিনিধি জানিয়াছেন যে, ২২শে জুন মঙ্গলবার যখন একদল বিদেশী সাংবাদিক ভোর রাতের দিকে Anti Aircraft Gun, ট্রেঞ্চ আর বাংকারে ঘেরা তেজগাঁ বিমান বন্দরে অবতরণ করছিলেন, তখন মুক্তি ফৌজ গেরিলাদের ডিনামাইট আর হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জের বিকট আওয়াজে সমস্ত শহরের পূর্ব দিকটা প্রকম্পিত হচ্ছিল।

অথচ প্লেনের মধ্যেই নাকি হানাদার বাহিনীর একজন অফিসার জোর গলায় সাংবাদিকদের বুঝাচ্ছিলেন যে, বাংলাদেশে আইজ-কাইল সব কিছুই আমাগো কন্ট্রোলের মধ্যে এসে পড়ছে। গেরিলা যুদ্ধের কথা যারা কয়, তারা ভোগাস্ মারতাছে। ঢাকার মাটিতে পা দিলেই বুঝতে পারবেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ

 

হ-অ-অ ঢাকার মাডিতে পা দিয়াই হেতাইনরা বুঝতে পারছে মাসে কয়দিন যাইতাছে। আর ইয়াহিয়া-টিক্কা সা’বের জোয়ানগো দিন অহন ক্যামৃত কাটতাছে। রয়টারের সংবাদদাতা হাওয়ার্ড হুইটেন ঢাকায় পৌঁছেই এক রিপোর্টে জানিয়েছেন যে, এর মধ্যেই আট দফায় মুক্তিফৌজরা খোদ ঢাকা শহরে হাতবোমা আর গ্রেনেড চার্জ করেছে।

জেনারেল টিক্কার অফিসাররা এর কোনো হদিসই করতে পারছে না। এ ছাড়া মুসলিম লীগ ও জামাতে ইসলামীর লোকজন ছাড়াও যেসব বেসামরিক কর্মচারী ইয়াহিয়া সরকারের সাথে সহযোগিতা করেছে তারা মুক্তিফৌজের মৃত্যু পরোয়ানা পাচ্ছে। এসব মৃত্যু পরোয়ানা সরকারি খামে করে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া ঢাকায় যে সামরিক হাসপাতাল রয়েছে, সেখানে প্রতিদিনই গড়ে ষাটজনের মতো গুরুতররূপে আহত পাকফৌজ ভর্তি হচ্ছে। বাকি হাসপাতালের হিসেব পাওয়া যায়নি।

হাওয়ার্ড হুইটেন ঢাকা থেকে আরো জানিয়েছেন যে, প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে টাঙ্গাইল থেকে যেসব লোক ঢাকায় পালিয়ে এসেছেন, তাদের মতে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা টাঙ্গাইল দখলের পর লাহোর-পিন্ডি থেকে আমদানী করা সশস্ত্র পুলিশের হাতে টাঙ্গাইলের শাসনভার দিয়ে কুমিল্লা সেক্টরের দিকে চলে গিয়েছিল। কিন্তু কাদেরিয়া বাহিনীর গাবুর মাইরের চোটে টাঙ্গাইল থনে অহন হেরা অক্করে সাফ হইয়া গ্যাছে। টাঙ্গাইল এখন মুক্ত।

এদিকে ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল-এর একজন সংবাদদাতা বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল সফর করে বলেছেন যে, ক্যান্টনমেন্ট আর শহরাঞ্চল ছাড়া পাকফৌজ বিশেষ দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য- এসব ফৌজরা মাঝে-সাঝে গ্রামের মধ্যে এসে অত্যাচার চালিয়ে সন্ধ্যার আগেই আস্তানার দিকে দৌড়াচ্ছে।

রেডিও 3 চরমপত্র [ Chorompotro ], জুলাই মাস ১৯৭১ [ July 1971 ] - এম আর আখতার মুকুল [ M. R. Akhtar Mukul ]

 

মুক্তিফৌজের আত্কা মাইরের ভয়ে এরা সব সময়ই আল্লাহ্ বিল্লাহ্ করতাছে। আবার লন্ডন টাইম্স কাগজে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের অনেকগুলো এলাকাই এখন মুক্তিফৌজের নিশানা দেখতে পেয়ে বেশ খানিকটা আশ্চর্য হয়েছেন।

সংবাদদাতা তাঁর রিপোর্টে আরো বলেছেন যে, মুক্তিফৌজ গেরিলারা তাকে পরিস্কার জানিয়েছে যে, ‘বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এ সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে আস্থা স্থাপন করে এ মুক্তি সংগ্রাম সফলতা লাভ করবেই করবে। লাখো বাঙালির লাশের নিচে আজ পাকিস্তান নামে দেশটার দাফন হয়ে গ্যাছে।

তাই কইছিলাম- আধা-খ্যাচড়া। এই একটা মাত্র শব্দের উপরেই অহন হগ্গল মাইর-পিট চলতাছে। হানাদার বাহিনীও কইতাছে, আধা-খ্যাড়া কাম কইরা যামু না। আবার মুক্তিফৌজও কইতাছে আধা-খ্যাচড়ার মধ্যে আমরা নাইক্যা। মুক্তিফৌজ গেরিলারা পয়লা থনেই এই একটা মাত্র কথাই কইতাছে আধা-খ্যাড়া কামে আমরা বিশ্বাস করি না। কাম অক্করে পাক্কা। হানাদার বাহিনীর মউত অহন ভাগো Call করতাছে। আর আজরাইলে তাগো উপর আছর করছে।

 

৬ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

গুনাহ। কবিরা গুনাহ্। সেনাপতি ইয়াহিয়া খান গুনাহ্-এ কবিরা করছেন। বিশ্বাসঘাতকতা, নরহত্যা, নারী নির্যাতন, গণহত্যা, আর মিছা কথার মাস্টার জেনারেল হয়ে ভদ্রলোক এখন সাধু সাজবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পাপ কোনোদিন চাপা থাকে না। তাই বাংলাদেশের আসল তথ্য বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশ হবার পর মাস্টার সা’বে অহন খুবই গরম হইছেন।

একাত্তরের শব্দযোদ্ধা চরমপত্র [ Chorompotro ], জুলাই মাস ১৯৭১ [ July 1971 ] - এম আর আখতার মুকুল [ M. R. Akhtar Mukul ]

 

শেষ পর্যন্ত তার পরাণের দোস্ত পাকিস্তানের প্রাক্তন ফরিন মিনিস্টার হরিবল হক চৌধুরীরে পশ্চিমী দেশগুলোতে জনমত গঠন আর টিভি, রেডিও সংবাদপত্রগুলোকে ব্রিফ করবার জন্য পাঠিয়েছেন। হরিবল হক চৌধুরী নিজেই নিজের পরিচয়। সারাজীবন ধরে পলিটিকস করছেন; কিন্তুক হগ্গল সময়েই Back-Door মানে কিনা পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকবার রাজনীতি।

মওলবী সা’বে আইজ পর্যন্ত পাবলিকের ভোটে মেম্বর হতে পারেননি। তাই পাবলিকের উপর তাঁর খুবই রাগ। কেউ কেউ কয়, এবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের বস্তি এলাকাগুলো নিশ্চিহ্ন করবার বুদ্ধিটা নাকি চৌধুরী সা’বই দিয়েছিলেন। কেননা রাস্তা দিয়ে মার্সিডিস গাড়িতে যাওনের সময় ‘গিধড়’ বস্তিগুলো তার কাছে খুবই খারাপ লাগতাছিল।

সেনাপতি ইয়াহিয়া ক্ষেমতায় আসার পর যখন এক মাথা-এক ভোটের কথা ঘোষণা করেছিলেন, তখন পাকিস্তানের এই প্রাক্তন ফরিন মিনিস্টার ঘৃণায় মুখ বেঁকিয়ে

ফেলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘রাজনীতির ব্যাপারে বুদ্ধি-টুদ্ধিগুলো আমাদের কাছ থেকে নিলেই পারে। দেশের অশিক্ষিত আর অর্ধশিক্ষিত লোকগুলো ভোটের কি দাম বুঝে? যত সব মাথা গরমের কাজ আর কি?’

এরপর থেকে চৌধুরী সাবে মাঝে মাঝেই সীলমোহর করা খামে লোক মারফৎ চিঠি পাঠিয়ে সেনাপতি ইয়াহিয়া সা’বকে Advice করতেন। তাঁর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে একগাদা খবরের কাগজ। ইংরেজি পাকিস্তান অবজার্ভার, বাংলা পূর্বদেশ আর উর্দু ওয়াতান পত্রিকা ছাড়াও উর্দু এবং বাংলা সিনেমা সাপ্তাহিক চিত্রালীর মালিক এই চৌধুরী সা’বে।

তাই মাঝে-সাঝে এসব কাগজে তার চেহারা মোবারকের মানচিত্র দিয়ে ফলাও করে বিবৃতি ছাপা হয়। আবার এ.পি.পি. এবং পি.পি.আই. এর মতো সংবাদ সরবরাহ সংস্থাকে বিবৃতির কপি দিয়ে তা সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের কাগজগুলোর কছে পাঠাবার জন্যে সে কি চোটপাট!

গত বছর নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপর দিয়ে সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড় হয়ে যাবার পর যখন সমস্ত জননেতাদের দুর্গত এলাকা সফর সমাপ্ত হলো, আর যখন গরু-ভেড়া আর মানুষের লাশ সরানো শেষ হয়েছে; তখন একদিন চৌধুরী সা’ব তার একজন রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফার নিয়ে নোয়াখালীর চর বাট্টায় যেয়ে হাজির হলেন।

পাকিস্তানের এককালীন ফরিন মিনিস্টার গামবুট পরে কর্পূর দেয়া রুমাল নাকে চেপে ধরে রাস্তার পাশে আঙ্গুল চারেক কাদার মধ্যে দাঁড়ালেন। অমনি বার কয়েক ক্লিক ক্লিক আর Flash Bulb জ্বলে উঠলো। ঢাকায় ফিরে এসে তিনি এক এফতার পার্টিতে তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা করলেন। অবশ্য ৭২ বছর বয়সেও তাঁর নামাজ-রোজার বালাই পর্যন্ত নেই। ইসলামের খুবই পায়েরবন্দ লোক কিনা!

পরদিন সকালে তার কাগজগুলোতে বিরাট ফটো সহকারে খবর ছাপা হলো, ‘দুর্গত অঞ্চলে হামিদুল হক। অবশ্য অন্যান্য খবরের কাগজে এই সংবাদটার নাম নিশানা পর্যন্ত নেই।

এহেনো চৌধুরী সা’ব আবার একটা Chance লইছেন। হেই দিন জেনারেল টিক্কার লগে আমাগো প্রাক্তন ফরিন মিনিস্টার একটা হেলিকপ্টারে বরিশাল গিয়েছিলেন। পরদিন পাকিস্তান অবজার্ভার, পূর্বদেশ আর ওয়াতান কাগজে চার কলাম করে দুটো ফটো ছাপা হলো। উপরেরটা হচ্ছে General Tikka in Barisal, কিন্তু নিচের ফডোেডা আমাগো হরিবল হক চৌধুরীর। বরিশালে হ-রি-বল।” কি রকম বেডা একখান। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার।

কিন্তুক হের উপায় নাইক্যা। হের মাল-পানির পরিমান খুবই বেশি কিনা। নিজের আইন ব্যবসা, দুইডা বাংলা, দুইডা উর্দু আর একটা ইংরেজি কাগজ ছাড়াও প্যাকেজেস ইন্ডাস্ট্রিজ, সদর ঘাটের এসোসিয়েটেড প্রিন্টিং প্রেস আর একটা চা-বাগান রইছে। এছাড়া আবার জাপান থনে চিটাগাং রিফাইনারি আর চিটাগাং স্টিল মিলের জন্য কেমিক্যালস ইমপোর্ট লাইসেন্স রইছে। এদিকে আবার কেমতে জানি পাকিস্তান অবজার্ভারের জাপান সাপ্লিমেন্টের কিছু টাকা ফরেন ব্যাংকে রইছে।

চৌধুরী সা’বের জামাই বিশিষ্ট সাংবাদিক এজাজ হোসেন ছিলেন পাকিস্তান অবজার্ভারের ইউরোপীয় সংবাদদাতা। কিন্তু দুরারোগ্য ক্যানসার ব্যাধিতে ভদ্রলোকের মৃত্যু হলে, চৌধুরী সা’ব নিজের বিধবা মেয়েকেই অবজারভারের সংবাদদাতা হিসাবে নিয়োগ করে বৈদেশিক মুদ্রায় বেতন দিতে শুরু করেছেন। হেনো চৌধুরী সা’ব অহন সেনাপতি ইয়াহিয়ার দূত হিসেবে বিদেশ সফরে বেরিয়েছেন। তাঁর কামডাই হইতাছে ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের সপক্ষে বিশ্বের জনমত সংগ্রহ করা ছাড়াও টিভি, বেতার সংবাদপত্রগুলোকে বাগে আনা। কেননা

ব্রিটিশ মার্কিন সংবাদপত্রগুলো জঙ্গী সরকারের ভাণ্ড অক্করে ফুটা করে দিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সংবাদদাতা মিঃ সিডনী সেনবার্গ ঢাকায় যেয়ে যে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন, তাতে সেনাপতি ইয়াহিয়া অক্করে হুইত্যা পড়ছেন। উনি খুবই সিনা চিতাইয়া Foreign Correspondent গো দাওয়াত করছিলেন। কিন্তুক সিডনী সা’বের ডোজ্‌টা খুবই কড়া অইছে। হেইর লাইগ্যা হেরে মাত্র বারো ঘণ্টার নোটিশে Get-out কইরা দিছেন।

এদিকে আবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি পার্টির চারজন সদস্য রয়্যাল এয়ার ফোর্সের প্লেনে বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকা আর সীমান্তের ওপরের শরণার্থী ক্যাম্প Visit কইর‍্যা যেটুকু বয়ান করেছেন, তাতেই জঙ্গী সরকারের কাম্ডা সারা হইছে। ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন দলের মেম্বর মিঃ টবি জেসেল বলেছেন, ‘হেই দিকের কারবার যা দেখছি, তাতে কইরা রিফিউজিগো দ্যাশে ফেরনের কথা কইতে পারি না।’ সঙ্গে সঙ্গে ইসলামাবাদ থেকে লন্ডনে Urgent মেসেজ গ্যাছে “Protest”।

লগে লগে লন্ডনের পাকিস্তানী হাইকমিশনার চিল্লাইয়া উঠছেন, ‘জেসেল সা’বে খুবই খারাপ কথা কইছেন। ইয়ে সব ঝুট্ হ্যায়।’ এদিকে ব্রিটেনের প্রাক্তন শ্রমমন্ত্রী মিঃ আর্থার বটমূলি বলেছেন, ‘দেখেশুনে যা বুঝেছি, তাতে শেখ মুজিবুর রহমান আর আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউই বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। কিন্তুক সেনাপতি ইয়াহিয়া কবিরা গুনাহ্ করার পরেও বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান করবার জন্য শ্যাষ পর্যন্ত একটা বাই-ইলেকশনওয়ালা মিলিটারি ডেমোক্রেসির ফর্মূলা দিছেন।

বেডাগো ধারণা দুনিয়ার মাইদ্দে কেউই এর ‘মজমাডা’ বুঝতে পারবো না। এদিকে বাংলাদেশ সরকার কইছে সেনাপতি ইয়াহিয়া ক্যান আমাগো ব্যাপারে ফুচি’ মারতাছে? মানে কিনা নাক গলাচ্ছেন। হেতাইনে কেডা? ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ জুমেরাতে পাকিস্তান নামে দ্যাশটার দাফন হয়ে গেছে। সবই কবিরা গুনাহ্র ফল।

৭ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

দিনা দুই আছিলাম না। হের মাইদ্দেই জেনারেল টিক্কা সা’বে চান্স লইছেন। হেতাইনে North Bengal-এর নাম কইর‍্যা মেহেরপুর, রাজশাহী, আর নওগাঁ Tour করেছেন। শরীলডা ম্যাজ ম্যাজ করতাছে বইল্যা ভোগা মাইরা রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, কুড়িগ্রাম এলাকায় যায় নাইক্যা। এইসব এলাকা আইজ-কাইল নাকি খুবই Risky হইয়া পড়ছে। হের কাছে ছিকরেট রিপোর্ট আইছে। খুবই খতরনাক্। তাই বেচারা টিক্কা North Bengal Tour এবেলা ওবেলার কারবার করছেন। মানে কিনা এবেলা ঢাকার থনে গেছেন, আর ওবেলা Back করছেন। কিন্তু ঢাকায় ফেরনের পর তার কি চোট্‌পাট।

একটা ঠ্যাং একটু খুড়িয়ে প্লেন থেকে নেমেই রেডিও গায়েবী আওয়াজের রিপোর্টাররে খুঁজলেন । কিন্তু আমাগো জিল্লুর সা’বে কাঁচা-কাম করে না। রেডিওর নিউজ এডিটরকে লইয়া পুরা স্যুট পিনধ্যা এয়ারপোর্টে হাজির। বহু চেষ্টা করণের পর ব্যাডায় আবার দোবারা রেডিও গায়েবী আওয়াজের রিজিওনাল ডিরেক্টর অইছেন। এর আগে সেন্ট্রাল মিনিস্টার হবিবুর রহমান বুলু মিয়ার প্রাইভেট সেক্রেটারি থাকনের সময় W.T. এর মানে কিনা বিনা পহায় ট্রেনে ট্যুর কইর‍্যা টি.এ.-র টাকা লওন আর রেডিওর Commercial প্রোগ্রামের টাকা গ্যাড়া মারণের লাইগ্যা পাকিস্তান কাউন্সিলে Executive Director হিসেবে ট্রান্সফার হইছিলেন।

হেরপর করাচীতে রেডিওর Director Transription থাকনের সময় ইলেকশন রেজাল্ট দেইখ্যা আওয়ামী লীগরে মাস্কা মারণের জন্যি আজাদ রহমানের জয় বাংলা গানের রেকর্ডডা প্রডিউস করছিলেন। কিন্তুক যখনই জিল্লুর সা’বে বুঝছেন কেইস খুবই খারাপ, তখনই একটা সেলাম ঠুইক্যা কইছেন, ‘মেরে মাদারি জবান’ উর্দু হ্যায়, হাম্‌কো ঢাকামে ভেজিয়ে। আমি হগ্গলরে সুফিয়া আমীনের গান হুনামু।

ব্যস। কাম্ ফতে। অর্ডার পাওনের লগে লগে ঢাকায় আইয়া এজাজ মিয়ারে কনুই মাইরা আউট কইরা দোতলার বড় চেয়ারডার মাইদ্দে বইয়া পড়ছেন। এহেনো জিল্লুর সা’বের কামের মাইদ্দে কোনোই গলদ পাওন সম্ভব না। তাই সা’বে কইছে কিসের ভাই, আহ্লাদের আর সীমা নাই। জেনারেল টিক্কার কথাবার্তা হুবহু লিখ্যা অফিসে দৌড়াইলেন।

যখন দুনিয়ার হগ্গল খবরের কাগজ, রেডিও আর টেলিভিশন কইতাছে বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকায় শান্তি ও শৃঙ্খল নাইক্যা, যাতায়াতের অবস্থা খুবই খারাপ, স্কুল-কলেজ, কোর্ট-কাচারী, হাট-বাজার আর ব্যবসা-বাণিজ্যের কারবার নাইক্যা আর অখনই দুর্ভিক্ষ দেখা দিছে, তহন রেডিওর মাইদ্দে টিক্কা সা’বের Statement আইলো, ‘সব কুচ্‌ ঠিক হ্যায়। খাদ্য পরিস্থিতি খুবই চমৎকার। পিস্ কমিটি সোন্দর কাম করতাছে।

কিন্তু লাহোরের পাকিস্তান টাইম্স পত্রিকা জেনারেল টিক্কাকে একেবারে পথে বসিয়েছেন। এ কাগজে ছাপা হয়েছে যে, পূর্ব বাংলার খাদ্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সেখানে যে Stock রয়েছে তা’তে দু’মাস চলবে কিনা সন্দেহ। এলায় ক্যামন বুঝতাছেন! পাকিস্তান টাইমস আউর লিখিস, ‘দু’বছর পর এবার পশ্চিম পাকিস্তান এক ভয়াবহ খাদ্য ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছে।

বেশি না, হেইখানে মাত্রক দশ লাখ টন গেই ‘শর্ট’ পড়ছে। তাই ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার এবার দেড়শ’ কোটি টাকা দিয়া একুশ লাখ টন খাদ্য আমদানী করবো।’ কিন্তু মাল-পানি?- নাইক্যা। কওনের লগে লগে স্টেট ব্যাংকের গবর্ণর রচিদ সা’বরে Shunting কইর‍্যা দিচে। আর সেনাপতি ইয়াহিয়া অহন থাইক্যা বাকিতে কারবার করবো। এইডা যেমন লাগে বেচারাম দেউড়ীর মুদীখানা আর কি? পোলাডারে পাডাইয়া বাকিতে দুই আনার কাড়ুয়ার তেল আনাইলাম, আর কী?

এদিকে ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকায় মার্টিন উলকট্ লিখেছেন, ‘একমাত্র ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলা হেড কোয়ার্টার্সে এখন কারফিউ চলতাছে। দিন কয়েক আগেই রাজশাহীতে মুক্তিফৌজ গেরিলারা তিনটা বোমা ফাটিয়েছে। যে ক’জন বেসামরিক অফিসার কাজ করছে তারা চিঠির মারফৎ মৃত্যু পরোয়ানা পেয়েছে। এর মধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১৫,০০০ সশস্ত্র পুলিশ আমদানী করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর অনেক জায়গায় মুক্তিফৌজের অস্তিত্ব রয়েছে।

হেইদিন আবার মেহেরপুর সেক্টরে এক জব্বর কাম হইছে। একজন শিক-কাবাব খাওইন্যা দারোগা একড়া অশান্তি কমিডি করণের লাইগ্যা মিটিং ডাকছিল। হেই মিডিং-এ শও খানেক লোক দেইখ্যা দারোগা সা’বে মুসলমান ভাই-ভাই কইয়্যা একটা লেকচার দিতাছিলেন। কিন্তুক যারা লেকচার হুনতাছিলেন তাগো মাইদ্দে যে অনেকগুলো মুক্তিফৌজের বিচ্ছু আছিল তা জানতো না। তারপর বুঝতেই পারতাছেন। নাঃ নাঃ নাঃ আমি কমু না।

হেই গাড়োল আর তার সাঙ্গোপাঙ্গো গো লাইগ্যা দুঃখে আমার পরাণডা Weep করতাছে। এদিকে সাতক্ষীরায় আবার অশান্তি কমিটির ২৯ জন কলে আম হইছে। আর দিনাজপুর-রংপুর সেক্টরে মুক্তিফৌজ গেরিলারা অহন কোবাইয়্যা সুখ করতাছে। বেশি না ১০৫ দিনের লড়াই-এ হানাদার বাহিনীর দশ হাজারের মতো জমি হইছে।

হেইর লাইগ্যা জেনারেল নিয়াজীর চান্দি অক্করে গরম হয়ে গেছে। অনেক SOS পাঠানোর পর জর্ডানের আম্মান থেকে reply এসেছে। দিন কয়েক আগে আম্মান থেকে এসব জমি সৈন্যগো মেরামত করণের লাইগ্যা দশ টন ওষুধ, ব্যান্ডেজ আর সার্জারির যন্ত্রপাতি নিয়ে একটা বিমান করাচী এসে পৌঁছেছে। এলায় বুঝছেন মাইরটা কি আন্দাজ হইতাছে।

তাই বলেছিলাম বিপদ আপদ আর মুসিবত এরা কখনও একা আহে না। যহন আহে, তহন দল বাইন্দ্যা আহে। সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারের অহন শনি রাশিতে পাইছে। তাই হেতাইনে যে কামেই হাত দিতাছেন, হেই কামেই বালা-মুসিবত হেরে আছর করতাছে।

৮ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

হয়ে গেছে। হেগো কুফা অবস্থা হয়ে গেছে। ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের হানাদার বাহিনীর লগে আইজ-কাইল একজন কইর‍্যা মওলবীসা’ব দিতাছে। মুক্তিফৌজের গেরিলা বাহিনীর আত্‌কা আর আন্ধারিয়া মাইর খাওনের পর যহন হেগো সোলজাররা শেষ দমডা ফালাইবার জন্য শরীলডা খিচ্‌তে শুরু করে, তহন এই মওলবী সা’বে এটুক আল্লাহর নাম হুনাইয়্যা দেয়। ব্যস, লাহোরে যে পোলাডা পয়দা অইয়া পয়লা দম পাইছিল, আমাগো ভুরুঙ্গামারীতে হেই ব্যাডায় আখেরী দমডা ছাড়লো। এরপর ক্যাদোর মাইদ্দে হোতনের পালা আর কোনো নিশানা রইলো না।

আগেই কইছিলাম এক মাঘে শীত যায় না। অহন এগুলা কি হুনতাছি? পয়লা দিকে বাংলাদেশে ইয়াহিয়া সা’বের সোলজাররা যেমন শতশত ‘মাইলাই’ করছিল, অহন আবার বিচ্ছুর লাহাল পোলাগুলা হেইখানে ‘দিয়েন বিয়েন ফু’ করতাছে। এর মাইদ্দেই এইসব গেরিলারা রাজশাহী, চিটাগাং, কুমিল্লা আর ঢাকাতে বোমাবাজি করছে।

সাতক্ষীরা, যশোর, ঠাকুরগাঁ, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ আর নোয়াখালীর অনেকগুলা জায়গা অহন মুক্ত এলাকা হয়ে গেছে। পিডানীর চোটে হেতাইনরা ভাগোয়াট হইছে। হের মাইদ্দে আবার হেগো জমি সোলজাররা এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হেগো ফালাইয়া আইলে বাকি সোলজাররা ভাবে, গুলি খাইলে তো অমাাাগো এ্যাম্‌তেই ফালাইয়া আইবো। আবার কান্ধে কইর‍্যা ক্যাম্পে আনলে মেজর সা’বে খুবই গরম হইগ্যা চিল্লায়। কিন্তুক চিল্লাইলে কি অইবো? বিচ্চুগো কাম বিচ্ছুরা করবোই।

এইরকম একটা ছ্যাছছেরা অবস্থায় লেঃ জেনারেল নিয়াজী সা’বে বেশি না ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারের কাছ থেকে আরও দু’ডিভিশন সৈন্য চেয়ে পাঠিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাপ্তাহিক নিউজউইক পত্রিকা এখবরটা Disclose কইরা কইছে, ভিয়েতনামেও ঠিক এমৃতেই কারবার শুরু হইছিল। নিউজউইক আরো কইছে, যতই দিন যাইতাছে ততই মুক্তিফৌজরা জোরদার হইয়া উঠতাছে।

এদিকে লাহোর রেডিওর এক ঘোষণায় বলা হয়েছে যে, রাওয়ালপিণ্ডির National Service Directorate General Head Quarters থেকে এ মর্মে এক নির্দেশ জারি করা হয়েছে যে, সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি মিল-ফ্যাক্টরিতেও যেসব জোয়ান লোক কাম করতাছে তাগো সোলজার হিসেবে ট্রেনিং লওনের জন্য ডাকনের লগে লগে ‘ইয়েস স্যার’ কইয়্যা হাজির হইতে হইবো।

এছাড়া রাওয়ালপিণ্ডির থনে পাঞ্জাবি আর পশ্তু জবানে এলান করা হইতাছে, নাথিয়াগলি, মনশেরা, আটক, পিন্ডি, মুলতান, মন্টগোমারি, পেশোয়ার, কোহাট আর ডেরা গাজীখাতে সোলজার রিক্রুটমেন্ট চলতাছে। অহন ক্যামন বুঝতাছেন! হেরা কি রকম সোন্দর মউতের রাস্তা ধইরা আগাইতাছে। আলজেরিয়া আর ভিয়েতনামেও ফরাসিরা এই রকম একটা কপিকলে আট্‌কা পড়ছিল। আর অহন কাম্বোডিয়া-ভিয়েতনামে মার্কিনীরা হাইদ্দ্যা শাল নিতাছে।

বাংলাদেশের গেরিলাগো বাড়ীর চোটে মওলবী সা’বরা অহন ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো মজবুত করতাছে। কেন আবার হইলো ডা কি? হ-অ-অ-অ বুঝছি। হেগো মোছ নামাইবার টাইম আইছে। হেরা ডরাইছে।

এর মাইদ্দে করাচীর থনে আবার এক জব্বর খবর আইছে। হেই খানকার মর্নিং নিউজ কাগজে লন্ডন টাইমস্, বিবিসি, ডেইলি টেলিগ্রাফ, গার্ডিয়ান আর বৃটিশ পার্লামেন্টের সফরকারী দলরে Warning দিছে। কেমন ব্যাডা একখান! চামচিকাও একটা পাখি। মর্নিং নিউজ গোস্বা হইয়া কইছে, ‘এইটা কি কারবার হইতাছে, বিদেশ থনে যাগোলগেই Permission দিয়া বঙ্গাল মুলুক ঘুরবার দিতাছি, হেরাই ছদর ইয়াহিয়া সা’বরে ধোলাই করতাছে? আমাদের মহব্বতের কি কোনোই দাম নাইক্যা?

ব্যাডারা কি একটুক্ মিছা কথা লিখতে পারে না? হেগে ট্যুর করণের Permission দিয়াই ভুল হইছে। এই রকম যদি চলতে থাকে তয় হুঁশিয়ার কইরা দিতাছি, আংরেজগো লগে কিন্তু আমাগো Connection cut off হইয়া যাইতে পারে?’

মর্নিং নিউজ কাগজটার একটা Colurful History আছে। এই কাগজের জন্ম কইলকাত্তায়। কিন্তু হিন্দুস্তান-পাকিস্তান হওনের লগে লগে কইলকাত্তার মুসলমানগো থুইয়া এক রাইতে ঢাকায় হাজির। তারপর ১৯৫২ সালে ঢাকায় রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের সময় বাঙালি পোলাপানগো ইংরেজিতে গা’ল দেওনের জন্যি এই কাগজরে একটুক দুরস্ত করা হইছিল। মানে কিনা ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে এই কাগজের জুবিলী প্রেসটারে আগুন লাগাইয়া ছাই বাননো হইছিলো। আর এডিটর সা’বে গবর্ণর হাউসে ভাগোয়াট হইয়াছিলেন।

এর পর মর্নিং নিউজ কাগজ করাচীতে হেড অফিস চালান করলো। আর ঢাকা-করাচী দুই জায়গা থনে ছাপানোর ব্যবস্থা করলো। বাইশ কপির বেশি সার্কুলেশন হইল না। আর এইদিকে ঢাকা মর্নিং নিউজ পুরানা অভ্যাসে আবার বাঙালিগো সম্পর্কে কি যেনো লিখছিলো। ব্যস্ ১৯৬৯ সালে আইয়ুব-বিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় একদিন লাখখানেক লোক ঢাকার মর্নিং নিউজের নুতন অফিসের দেয়ালে খালি একটা কইর‍্যা থাপড়া মারলো দেয়াল শ্যাষ। হের পর আগুন- মেসিন, অফিস পুইড়্যা সাফ্ ।

এই রকম একটা কাগজ ব্রিটিশ প্রেসরে হাঁচা কাথা ল্যাহনের জন্যি ধমকাইছে। যাই কই? এদিকে ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকার ব্রিটেনের কাছে তিনটা প্রতিবাদ জানিয়েছে আর ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা মিঃ আর্থার বটমূলীর টেলিভিশন ইন্টারভিউ দেখানো বন্ধ করেছে। কিন্তু হের মুখ বন্ধ করতে পারে নাইক্যা ।

মিঃ বটমূলী যেসব তথ্য প্রকাশ করেছেন, সমস্ত সভ্যজগত তাতে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। কানাডা, পশ্চিম জার্মানি, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন হগ্গলেই সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারের কাণ্ডকারখানা Criticise করতাছে। ভুট্টো-হরিবল্-বজ্জাত হোসেন কোনো ডেলিগেশইে আর কোনো কাম হইতাছে না।

আর এইদিকে কোরবানীর খাসী জবাই-এর পর মাইনষে য্যাম্‌তে খাসীর চাম খোলে, হেই রকম মুক্তিফৌজরা অহন হানাদার সৈন্যগো চাম ছিলতে শুরু করছে। লাহোর রেঞ্জার্স, গিলগিট স্কাউট, নর্দান রেঞ্জার্স, আর্মড পুলিশ, উপজাতীয় এলাকার ফৌজ, 9th আর 12th Division কোনোটাতেই কিছু কাম হইতাছে না। হেরা অহন চরমপত্র পুকুরকে দরিয়া আর নদীরে সমুন্দর ভাবতাছে। আর হেই পানির মাইদ্দে অহন চুবানি শুরু হইছে। হবায় তো সাড়ে তিন মাস হইছে। অহনই কান্দলে চলবো ক্যমৃতে? হেইর লাইগ্যা কইছিলাম। হয়ে গেছে। হেগো অহন কুফা অবস্থা হয়ে গেছে।

৯ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

আইজ কেন জানি না মোনেম খাঁর কথা মনে পড়তাছে। সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের ওস্তাদ আইয়ুব খান বাংলাদেশ থনে বহুত খুঁইজ্যা মালডারে বাইর করছিলো। মোনেম খার যোগ্যতা- বটতলার উকিল আছিল আর জীবনে কোনোদিন পাবলিকের ভোটে জিততে পারে নাইক্যা। কিন্তু আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসিতে মোনেম খাঁ এক রাইতে বি ডি হইয়া গেল গা। তাই ফাস্ট চান্সেই ভদ্রলোক সেন্ট্রাল মিনিস্টার। হের পরের ঘটনা মোনেম খাঁ নিজেই Disclose করছিল।

ঢাকায় মুসলিম লীগের গুণ্ডা সম্মেলন- আরে না না না কর্মী সম্মেলন। আইয়ুব খান একটা মোটা চেয়ারে মখমলের কুশনের উপর বসে রয়েছেন। কিস্তি টুপী মাথায় মোনেম খাঁ বক্তৃতা করছেন, “ভাইসব আমার ছদর সাক্ষী। আমি তখন সেন্ট্রাল হেলথ মিনিস্টার। একদিন রাইতে আমার ছদর আমারে ডাইক্যা পাঠাইলো। আমার বুকের মাইদ্দে তখন ঢেঁকির আওয়াজ শুরু অইছে।

কাঁপতে কাঁপতে রাওয়ালপিণ্ডির প্রেসিডেন্ট হাউসে যাওনের লগে লগে ছদর আমারে কইলো কি জানেন? ‘মোনেম তুমি বঙ্গাল মুলুকের গবর্ণর হও।’ আমি কইলাম, “মা-গো-মা, আমি এইডা পারবাম না।’ ছদর কইলো, ‘চব্বিশ ঘণ্টা টাইম দিলাম, তারপর কইও।’

দৌড়াইয়া অইয়া ময়মনসিংহ-এ জ্ঞানদার কাছে টেলিফোন বুক করলাম। জ্ঞানদা হইতাছেন আমার সিনিয়ার সব কিছু হুইন্যা জ্ঞানদা কইলো কি জানেন? মোনেম তুমি মা কালীর নাম লইয়্যা ঝুইল্যা পড়ো। ভাইসব হেই যে ঝুললাম- আইজও ঝুললাম কাইলও ঝুললাম; ঝুলাই রইলাম।”

এর পরের টুক আর মোনেম খাঁ কইতে পারে নাই। কওনের মতো অবস্থাও আছিল না। পাবলিকের মাইরের চোটে মোনাইম্যা অক্করে বনানীর দোতালায় যাইয়্যা হুইত্যা থাকলো। আর আইয়ুব খান? থাউক হেইডা আর কমুনা। হেতাইনে ইয়াহিয়া খানরে ছিক্রেট লেটার লেইখ্যা হাউ-মাউ কইর‍্যা কাইন্দা ফ্যালাইল।

এখন আমাগো টিক্কা খানের অবস্থা মোনাইম্যার মতো অইছে। মোনেম খাঁ তো কড়ি কাডের মাইদ্দে ঝুলতাছিল । কিন্তু টিক্কা? বাংলাদেশের ক্যাদো আর প্যাকের মাইদ্দে আট্‌কা পড়ছে। যতই বাইরাইবার চেষ্টা করতাছে, ততই আরো গ্যাইড়্যা যাইতাছে। মোনেম খাঁর টাইমে বাংলাদেশে দুই ডিভিশন সৈন্য আছিল, কিন্তু টিক্কা সা’বে পাঁচ ডিভিশন সৈন্য, ১৫ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানী সশস্ত্র পুলিশ আর রাজাকার বাহিনী হগ্গলরে লইয়া প্যাকের মাইদ্দে হান্দাইতাছে।

কিন্তু চিল্লাইতে পারবো না। চিল্লাইলেই যদি Leak out হইয়া যায় যে, মুক্তি বাহিনীর গাবুর মাইর চলতাছে। মনে লয় দুনিয়ার মাইনষে জানে না যে, ঢাকার আশেপাশেই অহন হেই কাম Begin হইছে। আর কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিং, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহীতে কেন জানি না টিক্কার সোলজাররা পেট্রোলে বাইরাইলে আর ফেরনের নাম লয় না। কেমন একটা কুফা অবস্থা। এইসব মাইরের কথা স্বীকার যাইবো না।

ছোট ভাই-এর ওয়াইফ যেমন ভাসুরের নাম লয় না, হেই রকম ইয়াহিয়া-টিক্কা-নিয়াজী-ওমরের দল মুক্তিবাহিনীর নাম লইতে পারবো না। খালি চিল্লাইতে চিল্লাইতে কইবো দুষ্কৃতিকারী, রাষ্ট্রের দুশমন আর বিদেশী চরেরা এগুলা করতাছে। তা হইলে তোমার সোলজাররা করে কি? ও-ও-ও হেরা তো কোবানী খাইতাছে।

বাংলাদেশে অহন জব্বর Development Work চলতাছে। নতুন নতুন সব হাসপাতাল খোলা হচ্ছে। কিন্তু হেই হাসপাতালে সব খাকী পোষাক পিন্দুইন্যা পেসেন্ট হুইত্যা গোঙ্গাইতাছে। ডাক্তার-নার্স খুবই Short কিনা। মুসলমান ভাই-ভাই কওনের চোটে একবার ইরান থনে কিছু নার্স আইছিল। কিন্তু হেরা হেইগুলারে বিসমিল্লাহ কবুল কইয়্যা সব হাংগা কইর‍্যা ঘরের বিবি বানাইয়া ফ্যালাইছে। তাই এইবার ইরান থনে গোঁফওয়ালা মেইল নার্স পাড়াইছে।

একটা ছোট ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। পাকিস্তান আমলের ঘটনা। ঢাকার জিন্না এভিন্যুতে আমার এক দোস্ত দাঁতের ডাক্তার আছিল। একদিন সন্ধ্যার সময় হেইখানে আড্ডা মারতে গেছিলাম। হের রোগীরা সব লাইন কইর‍্যা রইছে। এই সব রোগীর মাইন্দে একটা পাঠান রোগী দাঁতের ব্যথার চোটে গাল পাট্টা বাঁইন্ধ্যা অনেকক্ষণ ধইরা বইয়া আছে। আমি দোস্ত ডাক্তাররে কইলাম, ‘এইডা খুবই অন্যায়, পাঠানডাও তো তোমার Patient, ওরে একটু দেইখ্যা দাও।’

আমার কথা হুইন্যা ডাক্তার সা’বের এ্যাসিসটেন্ট থর থর কইর‍্যা কাঁপতে শুরু করলো। আর আমার ডাক্তার বন্ধু পাঠানডার কাছে যাইয়্যা কি যেনো কইতেই ব্যাডায় গেলোগা। আমি জিগাইলাম, “কি কইল্যা? ডাক্তার একটা হাসি দিয়া কইলো, না ওরে লোক আনতে পাডাইলাম। এই জিন্না এভিন্যুতেই দারোয়ান আছে, হেইগুলার জনা দুই আনূতে কইলাম। না অইলে হের দাঁত উডানের সময় ধরবো কেডা? হের পর বুঝতেই পারতাছেন।

রাইত নয়ডার সময় সিনেমা দেখলাম। মাটিতে চিৎ করে শোয়ানো অবস্থায় রোগীকে দু’জন পাঠান দারোয়ান চেপে ধরে আছে। রোগী তখন গোঁ-গোঁ আওয়াজ করছে। আর ডাক্তার সাঁড়াসী দিয়ে দাঁত তুলছে।’ কিন্তু তখনও বুঝতে পারি নাই যে, এই রকম সিনেমার সিরিয়াল শো দ্যাহনের টাইম খুবই নজদিগ্‌। টিক্কা সাবের সোলজার গো হোতাইয়া বেঙ্গল রেজিমেন্ট ঠাইস্যা ধরছে আর গেরিলারা মনের সুখে ডাক্তারি করতাছে।

এই রকম এক সময়ে লেঃ জেনারেল নিয়াজীর উপর অর্ডার হইছে, রিফিউজি পাকড়াও করতে হবে। Reception Counter গুলা অনেক দিন ধইরা খালি যাইতাছে। নিয়াজীসা’বে তন্দুর রুটি-শিক কাবাব খাইয়া সিলেট যাইয়া হাজির। প্লেনে আহনের সময় জনাকয়েক আমী অফিসার আর টেলিভিশনের ক্যামেরা ম্যানরে লগে আনছে। দুনিয়ার মাইদ্দে সিনেমায় দেহান লাগবো যে, টিক্কা-নিয়াজীর মহব্বতে বেচাইন হইয়্যা বাঙালি রিফিউজিরা সব ফেরৎ আইতাছে।

Reception Counter-এর সামনে গোটা চারেক আর্মি জিপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। বগলে ব্যাটন নিয়াজী সা’ব তার ঘেটু অফিসারগো লগে বাত্চিত্ করতাছেন। এমন সময় জনা চল্লিশেক সোলজার কয়েকটা গ্রাম থেকে শা দেড়েক লোক ঘেরাও করে নিয়ে এল। একজন অফিসার চিৎকার করে বললো, ‘সব দেহাতী আদমি কো ইস তরফ লে যাও। অউর কদম বাড়াকে Reception Counter কি তরফ আনে বোলো। জোয়ান লোগ দূর মে Position লেও।

এর পর টেলিভিশনের মুভি ক্যামেরায় দিব্বি রিফিউক্তি ফেরনের ছবি তোলা হলো আর লোকগুলাকে ডাঙা মেরে খ্যাদানো হলো। অফিসার মার্চ করে নিয়াজীর সামনে এসে স্যালুট করে বললো, ‘ইস্ আম লোগকা অন্দর কুছ বিহারী ভি থে। উও লোগ ধোতি পেন্হাথা। ইসলাম কে লিয়ে ও লোক হিন্দু বনে থে।’ ক্যামন বুঝতাছেন? পাবলিসিটি কারে কয়?

আমাগো টিক্কা সব আর নিয়াজী সা’বের মাইদ্দে আবার একটুক খেট্‌মেট্ রইছে। Eastern Command-এর দায়িত্বটা টিক্কার কাছ থনে নিয়াজীরে দ্যাওনের পর থাইক্যাই খেট্‌মেট্ আরো বাড়ছে। তাই সিলেটের রিফিউজি ফেরনের কারবার করণের পর চিত্তের মাইদ্দে সুখ লইয়্যাই জেনারেল নিয়াজী ক্যান্টনমেন্টে ফেরত আইলেন।

কিন্তু লগে লগে রিপোর্ট পাইলেন, ঢাকা থনে মাত্র ত্রিশ মাইল উত্তর পশ্চিমে দেওহাট্টাতে হানাদার বাহিনীর যে ক্যাম্প আছিলো, হেইডারে গেরিলারা হামামদিস্তা কইর‍্যা ফ্যালাইছে। অহন আর্মী হেড কোয়ার্টারের কাছেই কারবার শুরু হইছে। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহে ক্যাম্‌তে জানি তিনটা থানা মুক্ত এলাকা হইছে।

আকা মাইর দুনিয়ার বাইর। রংপুর, দিনাজপুর কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, যশোর, কুস্টিয়াতে আবার গেরিলাগো আত্কা মাইর শুরু হইছে। হেরা আরামসে হানাদার সৈন্যগো খুঁইজ্যা বেড়াইতাছে। মোনেম খাঁ তো কড়িকাডের মাইদ্দে ঝুলতাছিল, কিন্তু টিক্কা নিয়াজীর দল যতই ফাল পাড়াতছে, ততই বাংলাদেশের প্যাক আর ক্যাদোর মাইদ্দে গাইড়্যা যাইতাছে। আহা রে কোন খাকার পোলার কোনখানে মউত? ইরাবতীতে জন্ম যার ইছামতীতে মউত।

১০ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

আইজ একটা ছোট্ট গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। আমাগো মহল্লার মাইদ্দে ছলিমুদ্দিন বইল্যা একজন মানুষ আছিলো। বেডায় গাং-এর হেই পার বিয়া করছিল। একদিন হাউড়ীর কাছে হুনলো হের একজন বড় শালী আছে। বারো বছর আগে হেই শালীর বিয়া হইছিল। কিন্তুক বিয়ার পর থনে হেরে আর মায়ের কাছে আইতে দেয় নাইক্যা।

এই কথা হুইন্যা ছলিমুদ্দিন শালীর বাড়ি রওনা হইলো। বড় শালীর বাড়িতে তার খুবই খাতির ছলিমুদ্দিনও বুবু কইতে অজ্ঞান। পরদিন জুম্মার নামাজ বাদ ছলিমুদ্দিন কইলো, ‘বুবু তোমার পোলাডারে লইয়া আমি একটু হাটে যামু।’ বুবু কইলো, ‘এই কামডা কইরো না- হেরে সামলাইতে পারবা না।’ ছলিমুদ্দিন মহাগরম; ‘এইটুক্ একটা পোলারে সামাল দিতে না পারলে আমার নাম ছলিমুদ্দিন না জহিরউদ্দিন?’

বিরাট হাট। ছলিমুদ্দিন পোলার হাত ধইরা খুবই হিসাব কইরা চলতাছে। হঠাৎ বড় বড় কই মাছ দেইখ্যা কেনার সখ হইলো। নিচু হইয়া অনেক দরাদরির পর মাছ লইয়্যা দাহে কি পোলায় নাইক্যা। ছলিমুদ্দিন চাইর দিক অন্ধকার দেখলো। এলায় উপায়? বুবুর কাছে জবাব দিমু কি? ভালো কইরা ঠাহর কইরা দ্যাহে কি; ছলিমুদ্দিন পোলাডার নামডা পর্যন্ত জানে না।

তাই পোলাডার নাম ধইরাও চিল্লাতেইও পারতাছে না। অনেক খোঁজাখুঁজি আর চিন্তা করণের পর ছলিমুদ্দিনের মাথয় একটা জব্বর প্ল্যান আইলো। গরু হাটের পাশে একটা বাঁশের মাচাং-এর উপর খাড়াইয়া ছলিমুদ্দিন চিল্লাইতে শুরু করলো, ‘আমি কার খালুরে? হুনছেন নি, আমি কার খালুরে?’ কেমন বুঝতাছেন ছলিমুদ্দিনের কারবারটা। বড় শালীর পোলা হারাইয়া চিল্লাইতাছে, ‘আমি কার খালুরে?’

সেনাপতি ইয়াহিয়া অহন ছলিমুদ্দিন হইছে। বাংলাদেশের গাড়ার মাইদ্দে ঠ্যাং আটকানোর পর অহন পিকিং-ওয়াশিংটনরে ডাইক্যা কইতাছে, ‘আরে হুনছেন নি? আমি কার প্রেসিডেন্টরে? আমি কার প্রেসিডেন্টরে?’

এদিকে করাচীতে রোশেন আলী ভীমজী অহন ভিমরি খাইয়া হুইত্যা আছেন। কি কইলেন? ভীমজী সা’বরে চিনলেন না? তয় কই হোনেন। রোশেন আলী ভীমজী হইতাছেন ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্সুরেন্স কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেকটর। এই কোম্পানির রেজিস্টার্ড অফিস চিটাগাং-এ হইলে কি হইবো- হেড অফিস করাচীত্। চব্বিশ বছর ধইরা বাঙালিগো প্রিমিয়ামের হগ্গল পহা হেতাইনে করাচীতে পাচার কইর‍্যা তুলার ব্যবসাতে খাড়াইতাছে। এর মাইদ্দে আবার ভীমজী সা’বে মেলেটারির জেনারেলগো দোস্ত বানাইছিল- যদি কিছু মাল-পানি পাওন যায়?

সবুর, সবুর ডরাইয়েন না- অখনই Explain করতাছি। ভীমজী সা’বে জেনারেল গো শরাবন তুহুরা খাওয়াইয়া একটা চিঠির কোণার মাইদ্দে হেগো দিয়া ‘ইয়েচ’ লিখ্যা লইলো। হেরপর সোলজারগো গ্রুপ ইন্স্যুরেন্সের নাম কইর‍্যা বচ্ছর ঘুরলেই মাল-পানির ব্যবস্থা করলেন। কোম্পানির ডিরেকটররা সব আলহামদু লিল্লাহ কইলেন।

দিনকাল ভালোই কাটতাছিল । কিন্তুক সন ১৯৭১ মার্চ পঁচিশ তারিখে সেনাপতি ইয়াহিয়া সা’বে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাইদ্দে বাঙালিগো ঠাণ্ডা করণের জন্যি বাংলাদেশে সোলজার নামাইলো। ব্যাইস্। হাতি অক্করে দৌড়াইয়া আইস্যা ক্যাদোর মাইদ্দে হান্দাইলো।

সারগোদা, রিসালপুর, কোহাট, কোয়েটা, লাহোর আর রাওয়ালপিণ্ডির অফিসার্স মেসে যেসব পোলাগুলো স্যুট পিন্দ্যা বিলিয়ার্ড খেলতাছিল, তারা হাওয়াই জাহাজে আইস্যা মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম আর টাঙ্গাইল, ময়নমনসিংহে কাফনের কাপড় পিন্দলো আর জঙ্গী সরকারের ফাইটিং ফোর্সগুলো না থাউক কমু না।

অহন ভীমজী সাবের কথা আবার কই। হেতাইনে Top ছিক্রেট লেখা আর গালা দিয়া সিলমোহর করা একটা চিঠি পাইছে। বিসমিল্লাহ বইল্যা চিঠি খোলনের লগে লগে একটা আওয়াজ হইলো, ভীমজী সাবে ভিমরি খাইছে।

ছক্কু মিয়া কইলো, ‘আরে এই-ই কালু, খকা অন্দর কেয়া লিখিস্ রে? কালু মিয়া গলা খ্যাকরাণী দিয়া থুক্ ফালাইলো, আংরেজি মে লিখিস্।’

বেশি না দশ হাজার। মাত্র দশ হাজার হানাদার ফৌজের মউত আর ঘাউয়া জখমী গো লাইগ্যা ইয়াহিয়া সা’বে ইন্স্যুরেন্সের টাকা চাইছে। লাশ পিছু দুই হাজার টাকা কইর‍্যা ধরলে ‘দো ক্রোড় রুপেয়া।’ বিশ লাখের কোম্পানি। কিন্তু অউগ্গা Demand দুই কোটি। কি হইলো ভীমজী সা’ব? আর সোলজার গো গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স করবেন না? অহন বন্দর রোডের হেড অফিসের উপর লাল ফ্ল্যাগ তুললে কি অইবো? কার পাল্লায় পড়ছেন বোঝেন নাই তো?

ভীমজী সা’বে কাঁপতে কাঁপতে একটা জবাব লিখ্যা পাকিস্তান অবজার্ভার আর মর্নিং নিউজের Cutting পাড়াইছে। ইয়াহিয়া সা’বে কইছে এইডা তো যুদ্ধ না, এইডা হইতাছে Internal Affair. রাওয়ালপিণ্ডির মিলিটারি হেড কোয়াটার্স মহা গরম। তাইলে কিন্তুক আসল Demand কইরা দিমু।

জেনারেল নিয়াজীর বুদ্ধিমতো অনেকগুলায় সোলজার তো কলেরা আর নিমোনিয়া রোগে মরছে বইল্যা দেখানোর পর লিস্টি কমাইয়া দশ হাজার করা হইছে। নাঃ নাঃ নাঃ দেরী করন যায় না। শিগগিরই মাল-পানি ঝাড়ো। এর মাইদ্দেই লাহোর-রাওয়ালপিণ্ডিতে বোরখা-ওয়ালীগো চাইরডা মিছিল হইছে।

হ-অ-অ-অ এইদিকে এইগুলা কি হুনতাছি। মেহেরপুর থনে হানাদার ফৌজ সাফ্ । অহন মেহেরপুর টাউনের মাইদ্দেই Fight হইতাছে। আর হেগো ভাগোনের জায়গা নাইক্যা। এ্যার মাইদ্দে সোলজারগো মওলবী সা’বও ভাগছে। তাই হেরা ইয়া আলী কইয়্যা কাদোর মাইদ্দে হুইত্যা পড়তাছে। মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা চীনা রাইফেল ও ওয়্যারলেস সেট আর আমেরিকান মর্টার ও এল.এম.জি. পাইয়্যা মহাখুশি।

আহারে, ধাওয়াইয়া কি আরাম রে! বেশি না মেহেরপুরে গেরিলারা পঞ্চান্নটা হানাদার সৈন্যের লাশ পাইছে। রংপুর, দিনাজপুরে, সাতক্ষীরা, সিলেটে একই রকম কারবার চলতাছে। এদিকে টাঙ্গাইলের রিপোর্টে হাস্বাম না কাঁদবাম। হেইখানে ছ্যাল কুত্‌ কুত্‌, ছ্যাল কুত্ কুত্, ছ্যাল কুত্‌ কুত্‌- মানে কিনা হা-ডু-ডু খেলা শুরু হইছে। কাদেরিয়া বাহিনী যখনই টের পাইছে যে, নরসিংদী-কুমিল্লার হেইদিকে কি যেনো একটা কারবার হওনের ঠ্যালায় টাঙ্গাইল থনে কিছু সোলজার হেইদিগে গ্যাছে গা, বাইস কাদেরিয়া বাহিনী জঙ্গল থনে

বাইরাইয়া গাবুর মাইর। এক চোটে হানাদার বাহিনীর ৭৭ জন সোলজার আর পুলিশ আজরাইল ফেরেশতার দরবারে যাইয়্যা হাজির হইলো। এই খবর পাইযা নিয়াজী সা’বে ময়নামতী ক্যানটনমেন্ট থনে কিছু সোলজার আনলো। ব্যাস্, কুমিল্লার জাঙ্গালিয়াতে ঘ্যাটাঘ্যাট, ঘ্যাটাঘ্যাট্-কি জানি একটা ব্যাপার হইয়্যা গেলোগা।

কুমিল্লা টাউনে কারফিউ, Blackout দুইভাই হইলো আর এই দিকে কাদেরিয়া বাহিনী যহন দেখলো দখলদার বাহিনী, ট্যাংক, মর্টার লইয়্যা আইতাছে, তখন টাঙ্গাইল টাউনে ৪৮ ঘণ্টার কারফিউ দিয়া আবার জঙ্গলের জায়গা মতো যাইয়া বইলো ইয়াহিয়া সা’বের সোলজার, টাঙ্গাইলে আইয়া দ্যাহে কি, মুক্তিবাহিনী তো নাই-ই, রাস্তাঘাটে মানুষ পর্যন্ত নাই।

কেইসটা কি? অনেক কষ্টে জনা দুই দালাল খুঁইজ্যা জানতে পারলো গেরিলারা কারফিউ দিয়া গ্যাছেগা। হেইর লাইগ্যা রাস্তায় কোনো মানুষ নাইক্যা। লগে লগে হেগো চান্দি গরম হইয়া গেলোগা। হেরা চিল্লাইয়া কইলো, ‘ইয়ে কারফিউ তোড়ো। ইয়ে কারফিউ ঝুট হ্যায়।’

ক্যামন দিনকাল পড়ছে? মেলেটারি কারফিউ ভাঙ্গতে চাইতাছে আর পাবলিক কারফিউ মানতে চাইতাছে। কবে না জানি হুনুম গেরিলারা কাপড় পিন্ধ্যা আছে দেইখ্যা ইয়াহিয়া সা’বের সোলজাররা আর কাপড় পিন্‌বো না। হেরা আদম হইয়া ফাইট্ করবো। হেইদিনের কথা চিন্তা কইর‍্যা বুক আমার অক্করে ফাট্‌ফাট্ করতাছে।

১১ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

হামাম দিস্তা। হামাম দিস্তার মাইদ্দে দেশী হেকিম-কবিরাজ যেমতে গাছ-গাছড়া থ্যালা কইব্যা ‘ছত্রিশা মহাশক্তি জীবন রক্ষা বটিকা’ বানায়, হেই রকম সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার অহন ক্যাম্কে জানি হামাম দিস্তার মধ্যে থ্যালা হইতাছে। সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকারের অবস্থা অহন অক্করে ক্যাডাবেরাচ্ হয়ে গ্যাছেগা। খালি কলসের আওয়াজ বেশি। তাই জঙ্গী সরকারের চোপার চোটপাট আইজ-কাইল খুবই বাড়ছে।

পশ্চিম পাকিস্তান আর বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকার সংবাদপত্রের উপর গত তিন মাস ধরে পুরা সেন্সরশিপ জারি রেখে এখন পশ্চিমী দেশগুলোর রেডিও টেলিভিশন আর খবরের কাগজের উপর হেতাইনরা খুবই চ্যাছেন। এর মধ্যেই ইয়াহিয়া সরকার ব্রিটেনকে জানিয়েছে যে, ব্রিটিশ হুকুমত্ যদি হেইখানকার পরচা, টেলিভিশন, বিবিসি আর পার্লামেন্টের মেম্বরগো কন্ট্রোলের মাইদ্দে না আনতে পারে, তা অইলে খুবই খারাপ একটা কিছু হইতে পারে।

ইংলিশস্থানের লগে তাগো যে Connection রইছে হেইডা পাংচার করতে পারে। একশ বিশ ঘণ্টার মাইদ্দে ইসলামাবাদ দুই নম্বর ছাড়ছেন। মানে কিনা দুইটা Warning দিছেন। ডর-ভয়, লজ্জা-শরম হেগো সব গ্যাছেগা। হেরা খেন্দল বর্মন অইছেন।

কি কইলেন? খেন্দল বৰ্মন কেডা তা’ চেনেন না? তয় কই হোনেন- এর মাইদ্দে পঁচাগড়-ঠাকুরগাঁ গেছিলাম। হেইখানে খেন্দল বর্মনের লগে দেখা। হের সমস্ত মুখের মাইদ্দে একটা মাত্র দাঁত রইছে। হেরে জিগাইলাম, ‘আপনার নাম?’

একটা ফোকলা হাসি মাইরা কইলো, ‘মোক্‌তো মাইনষে খেন্দল বর্মন কহি ডাকে। তোমরাও লা খেন্দলই কহিবা পারেন।’ আমি আবার জিগাইলাম ‘আপনার বয়স?’

এইবার মোক্ষম জবাব আইলো তোমরা লা লেখাপড়া শিখিছেন, তোমরা গেট মেট ইংরাজী কহিবা পারেন। তোমরা এতো কিছু জানেন তো মোক্ দেখি মোর বয়স কহিবা পারেন না? মুই তো নেখাপড়া শিখি নাই, মুই ক্যাম্‌নে বয়স কহিমু?’

এলায় খেন্দল বর্মনের চিন্‌ছেন, কেমন মাল একখান? সেনাপতি ইয়াহিয়া অহন খেন্দল বর্মন অইচে। বিদেশী সাংবাদিক, পার্লামেন্ট সদস্য, বিশ্ব ব্যাংকের মেম্বর আর জাতিসংঘের প্রতিনিধি যারাই তাকে বাংলাদেশের গণহত্যার কথা জিজ্ঞেস করছেন, তাঁদেরই তিনি বলছেন, ‘আপনারা হিটলার-মুসোলিনী তোজো’র কারবার দেখছিলেন আর ভিয়েতনাম কাম্বোডিয়ার খেইল দেখতাছেন। আপনারা আমারে দেইখ্যা Understand করতে পারেন না বাংলাদেশে হেগো ঠাণ্ডা করণের লাইগ্যা আমি কতটুকুই বা করতে পারি?’

কোরবানীর গরুর যেমন দাঁত দেইখ্যা বয়স আন্দাজ করে, হেই রকম ইয়াহিয়ার কাটা-কাটা কথা হুইন্যা হগ্গলেই কারবারটা বোঝনের লাইগ্যা একবার কইর‍্যা বাংলাদেশে আইছিল।

তারপর, বুঝতেই পারতাছেন। World Bank-এর মিঃ কারঘিল কইছেন ইসলামাবাদের জঙ্গী সরকারকে আর এক পহাও দেয়া যায় না। বৃটেনের প্রাক্তন মন্ত্রী আর্থার বটমূলী বলেছেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য যে কাণ্ড করে চলেছে, তা জিন্দেগীতেও হুনি নাই বা দেহি নাই। টিক্কা খানের Upper chamber খালি। আর সেনাপতি ইয়াহিয়া একজন ক্ষমতালোভী জেদী মানুষ।

ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলীয় সদস্য মিঃ জেসেল বলছেন, ‘একজন রিফিউজিরেও দেশে ফেরনের কথা কওন যায় না। ব্রিটিশ শ্রমিক দলীয় সদস্য মিঃ স্টোন হাউস বলেছেন, “ইয়াহিয়ার হানাদার বাহিনী বীভৎস গণহত্যায় হিটলারকেও ছাড়িয়ে গ্যাছে। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকা বলেছে, ‘নৃশংসতাই হচ্ছে পূর্ব বাংলার নিত্যকার ব্যাপার।’ নিউজ উইক হগ্গলের উপর টেক্কা মারছে। এই আংরেজী পর্চা মে লিখিস্, ‘টিক্কা খানের রক্তস্নান।

এদিকে বিবিসি নিউইয়র্ক টাইমস্, ওয়াশিংটন পোস্ট, ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর আর লন্ডন টাইমস্ পত্রিকা ধোপা যেতে নদীর ঘাটে কাঠের উপর কাপড় বাইড়ায়, হেম্‌তে কইরা জঙ্গী সরকাররে বাইড়াইতেছে। কানাডার পার্লামেন্টের মেম্বর মিঃ এ্যানড্র ব্রুডইন আর আইরিশ এম.পি. মিঃ কোনার্ড ও ব্রায়েন জাতিসংঘরে দিয়া ইয়াহিয়া সরকাররে মেরামতের কথা কইছেন।

এতো সব কারবার হইতাছে দেইখ্যা সেনাপতি ইয়াহিয়া এলায় টিরিক্স করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দালাল শিরোমণি ডাঃ সাজ্জাদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাঃ দীন মোহাম্মদ আর ডাঃ মোহর আলীরে নিউইয়র্ক পাড়াইছেন। কিন্তুক আমাগো বাঙালি পোলাপানেরা হেগো হোডেলের মাইদ্দে ঘেরাও কইর‍্যা থুইছে।

হেই খবর পাইয়া পাকিস্তানের প্রাক্তন ফরিন মিনিস্টার হরিবল হক চৌধুরী ইউরোপে যাইয়া লাপাত্তা হইছেন। উনি আবার ফরিনে খুব পপুলার কিনা? আর পশ্চিম পাকিস্তানের রুস্তম ভুট্টো সা’বে পিপলস্ পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি জে,এ, রহিমরে বগলদাবা কইরা তেহরান গেছেন। কিন্তুক এই লোকগুলোর সার্টের মাইদ্দে এখনও রক্তের দাগ রইছে। তাই হেতাইনরা Silent work মানে কিনা U.G. work করতাছে। না হইলে মাইনষে যদি গতরের মাইদ্দে থুক্ দ্যায়।

এদিকে আবার ধূকর যেমতে কইর‍্যা লেহাপ বানানোর সময় তুলা ধোনে, ঠिক হেম্‌তে কইরা মুক্তিফৌজের গেরিলারা ইয়াহিয়ার সোলজারগো ধূনৃতাছে। ব্রিটিশ এম.পি. মিঃ জন স্টোন হাউস আর পশ্চিম জার্মানির স্টেট মন্ত্রী ডঃ আর্নেষ্ট হেইনসেন তিস্সা জুলাই বাংলাদেশের মুক্ত এলাকা সফর করেছেন। মুক্তিফৌজরা তাগো পাসপোর্টের মাইদ্দে বাংলাদেশ গবর্ণমেন্টের সিল মাইর‍্যা লগে কইর‍্যা যহন ভিতরে নিয়ে গেছে, তহন হেরা তাজ্জব বইন্যা গ্যাছে।

গ্রামের মাইনষে মেহমান গো ‘জয় বাংলা’ আর ‘শেখ মুজিব জিন্দাবাদ’ কইয়্যা ওয়েলকাম করছে। হের পর হেরা একটুক Action দেখছে। মারই রে মাইর! বাংলাদেশের মাইদ্দে মুক্তিফৌজের অহন হাটুরিয়া মাইর শুরু অইছে। হেগো অবস্থা অহন তা-না-না-না হয়ে গ্যাছেগা। রংপুরের অমরখানায় হানাদার বাহিনী অক্করে সাফ্।

মরণের আগে হেরা চিল্লাইছিল, ‘ইয়া আল্লাহ ইয়ে কেয়া গজব আ গিয়া।’ এদিকে আবার রাজশাহী-নাটোর রাস্তা ক্যামতে জানি কাটিং হইয়া গ্যাছেগা। পাবনায় রাইতের বেলায় হেগো একটা পেট্রোল গায়েব। ঠাকুরগাঁ আর বগুড়ায় অহন দাঁইড়াবান্দা খেইল শুরু অইছে। কুমিল্লার জাঙ্গালিয়াতে কি জানি একটা কারবার হইছে।

বিবিসির খবরে কইছে ঢাকার থনে মাত্রক ৩২ মাইল দূরে শ্রীপুরে পাক ফৌজ মাইর খাইয়া তক্তা হয়ে গেছে। মনে লয় এই সব গেরিলারা আমান থাইক্যা আকা আইয়া হাজির হইতাছে। না হইলে টিক্কা সা’বে কয়, ‘সব কুচ্‌ Normal হ্যায়।’ আর ময়দানে নামলেই আজরাইলে ধাওয়ায়। কেইসটা কি?

সেইজন্য বলেছিলাম হামাম দিস্তা। হামাম দিস্তার মাইদ্দে দেশী হেকিম-কবিরাজ যেতে গাছ-গাছড়া থ্যালা কইল্যা ‘ছত্রিশা মহাশক্তি জীবন রক্ষক বটিকা’ বানায়, হেই রকম সেনাপতি ইয়াহিয়ার জঙ্গী সরকার অহন কেম্‌তে জানি হামাম দিস্তার মাইদ্দে থ্যালা হইতাছে।

১২ জুলাই ১৯৭১ চরমপত্র

রেকর্ড করছে। আমাগো কক্সবাজারের মওলবী ফরিদ আহমদ সা’বে রেকর্ড করছে। ইলেকশনে আওয়ামী লীগের কাছে বাড়ি খাওনের পর মওলবী সা’বে একটুক্ খামুশ

 

—- চলবে

আরও দেখুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন