ছোট রানী ও তার পুত্র বেজী রাজপুত্র – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

ছোট রানী ও তার পুত্র বেজী [ খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা, Khulna District ] : বিরাট রাজ্যের ছিল এক রাজা। রাজার ছিল অনেক সম্পত্তি। প্রজারা যহন যা চাতো তাই পাতো। প্রজারা সমস্ত বছর সুহি শান্তিতি দিন কাটাতো। কারও মনে দুঃখ ছিল না।

ছোট রানী ও তার পুত্র বেজী রাজপুত্র - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

অন্যান্য রাজ্যে রাজার গুণকীর্তন ছড়ায় পড়ে। চারদিকি ধন্য ধন্য রব পড়ে। কিন্তু রাজার নিজির মনে ছিল না কোনো শান্তি। কারণ রাজার কোনো সন্তানাদি অতো না। রাজ্যের যত সব বদ্যি-কবিরাজ, গণকঠাকুর একে একে আসে রাজার চিকিৎসা করে, রানির চিকিৎসা করে, ভাগ্য পরীক্ষে করে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো ফল অতো না।

রাজ্যের মন্ত্রী, কোটাল, সৈন্য-সামন্ত, উজির-প্রজা সবাই চিন্তিত রাজার চিন্তায়। কিন্তু দিনি দিনি দিন পার অয়ে যায়, রাজার দুঃখ বাড়েই চলে। অবশেষে রানির পরামর্শে রাজা দ্বিতীয় বিয়ে কললো। সবাই ভাবে নিলো এইবার বুঝি রাজার বংশ রক্ষে হয়। কিন্তু ভাবনায় পড়লো ছেদ। দ্বিতীয় রানিরও অলোনা কোনো সন্তান।

বছর অতিক্রান্ত হয়। দুঃখ-কষ্টে রাজার রাজ্যে নামে আসে কষ্টের ছায়া। সন্তান লাভের আশায় রাজা শেষ পোনতো একে একে সাত বিয়ে সম্পন্ন কললো। কিন্তু সন্তান লাভ করা তার অলোনা। প্রজারা রাজাকে বদনাম দিলো হাটকুড়ে রাজা হিসেবে। কোনো কোনো প্রজা অমঙ্গলের ভয়ে হাটকুড়ে রাজার রাজ্য ত্যাগ করে পাড়ি জমালো ভিন্ন রাজ্যে।

চোখের জলে ভাসে হলে রাজার সাত রানি। রাজা কারও সাথে ভালো ব্যবহার করে না। প্রজাদের খোঁজ থক, নেয় না। সব মিলি রাজ্যে নামে আসে বড় অশান্তি।

[ ছোট রানী ও তার পুত্র বেজী রাজপুত্র – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা ]

 

একদিন সহালবেলা রানিরা আছে সব ঘুমোয়ে। অন্দরমহলে কোনো সাড়াশব্দ তহনো পড়িনি। এমন সময়ে এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক আসে ভিক্ষে চাতি। বৃদ্ধ ভিক্ষুক জোরে জোরে ডাকতি থাহে রানিমা, রানিমা কইয়ে। এমনি সময় বাড়ির এক ঝি আসলো ভিক্ষে দিতি। কিন্তু ভিক্ষুক তহন কলো, আমি রানিমার কাছতে ছাড়া ভিক্ষে নেব না।

ঝি কলো, রানিমায়েরা কারো ভিক্ষে দে না। ভিক্ষুক তহন কলো তুমি রানিমাকে যাইয়ে কও আমি তাদের কাছতে ভিক্ষে নেব। ঝি তহন অন্দর মহলে যাইয়ে রানিদের ডাকলো। রানিরা আস্তে আস্তে আসলো। এবং আসে কলো আমরা কারো ভিক্ষে দি নে।

ভিক্ষুক কলো কেন রানিমা, তোমরা নিজির হাতে কেন ভিক্ষে দ্যাওনা? রানিরা কলো মনের দুঃখ কেন জানতি চাও? বৃদ্ধ ভিক্ষুক কলো, কি এমন দুঃখ যে আমারে বলা যায় না। রানিরা তহন কলো, আমাগে সাত রানির কোনো সন্তান না অওয়ায় আমরা কারো কোনো ভিক্ষে দিনে।

Gurukul Live Logo

 

বৃদ্ধ ভিক্ষুক কলো, তোমরা আমারে দিলি তোমাদের সন্তান অবে। রানিরা তহন তাচ্ছিল্য করে হাসতি হাসতি কলো, কত বড় বড় ডাক্তার কবিরাজ গণক-বদ্যি আসলো-গেল, কোনো কিচ্ছুতি কোনো ফল অলো না, কোথাকার এক ভিক্ষুক আসে কয় ভিক্ষে দিলি নাহি আমাদের সন্তান অবে। সবাই হাসতি হাসতি মজা কললো।

তহন ছোড় রানি সবাইকে কলো, দিয়েই দেহিনে ভিক্ষে, দেহি কি অয়। পিতার বয়স্ক বৃদ্ধ লোকটি যহন কচ্ছে, তহন আমাগে ভিক্ষে দিতিতো দোষের কিছু নেই। ছোড় রানির কথামতো তহন রানিরা সবাই ভিক্ষুককে অনেক ভিক্ষে দিলো। ভিক্ষুক খুশি অয়ে তহন তার ঝোলারতে একটি ফল বার করে কলো, এই ফলটি তোমরা সাতরানি সমান ভাগ করে নদীতে স্নান করে আসে বাসী প্যাটে খাবে। তালি তোমাগে সবার সন্তান অবে।

এই কয়ে ভিক্ষুকটি বিদায় নিলো। রানিরা তহন সবাই স্নান কততি গেল। রানিরা স্নান করে রাজমহলের উদ্দেশ্যে রওনা অলো, কিন্তু ছোটরানির এটটু দেরী অলো আসতি। অন্য রানিরা আসে ভিক্ষুকের দেওয়া ফলডা কাটে খাইয়ে ফেললো। ছোড়রানি যহন আসলো তহন অন্য রানিরা কলো ছোডরানি, ফলডাতো খাওয়া অয়ে গেছে। তুমি কি খাবে?

ছোডরানি তহন মনের দুহি বসে বসে ভাবতেছে কি করা যায়। ভাবতি ভাবতি ছোডরানির দুইচোখ জলে ভরে গেল। অবশেষে ছোডরানি মনের কষ্টে ঝুড়ির মধ্যি পড়ে থাহা ফলের খোসা খায়ে নিল, ফল রাহা পাত্রটি ধুয়ে জল খালো। আর মনে মনে। নিজির কষ্টের ভবিষ্যৎ চিন্তা কততি থাকলো।

দিনির পর দিন যায়। মাস দুয়েক পর রাজমহলে হঠাৎ আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। রানিরা সবাই সন্তানসম্ভবা। রাজ্য জুড়ে প্রজারা সবাই আনন্দ কততি থাহে। অবশেষে আসলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। রাজা মনের আনন্দে একে একে সব রানির ঘরে যাইয়ে দ্যাহে রানিরা সব ফুটফুটে ছেলে সন্তান প্রসব করেছে। কিন্তু ছোডরানির ঘরে যাইয়ে দেহে ছোডরানি প্রসব করেছে একটা বেজী।

ছোডরানি তার বেজী সন্তান নিয়ে মনের কষ্টে কাঁদে চলে। অন্য রানিরা রাজাকে কলো ছোড়রানিকে রাজপ্রাসাদে রাহা যাবে না। রাখলি তাদের সন্তানদের অমঙ্গল অবে। রাজা তহন নিরূপায় হইয়ে ছোডরানিকে বাড়ির পাশে কুঁড়েঘরে স্থান দিল। ছোড়রানি মনের দুহি তার সন্তানকে নিয়ে কুঁড়েঘরে বাস করতি থাকে।

রাজপ্রাসাদের পোড়া-বাসী খাবার ছোডরানি ও তার বেজী সন্তানের জন্যি পাঠায়ে দেয়া হয়। রাজপুত্ররা সবাই ধীরে ধীরে বড় হইয়ে ওঠে। তারা একসঙ্গে সবাই পাঠশালায় যায়। তাই দেহে ছোডভাই বেজী তার মাকে কয়, আমিও দাদাদের সাথে পাঠশালায় যাব। ছোডরানি রাজি হতি চায় না। তবুও তার সন্তানের জোরাজুরিতে শেষ পোনতো তারে পাঠশালায় যাতি অনুমতি দেয়।বেজি ছোট রানী ও তার পুত্র বেজী রাজপুত্র - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

ছোডভাই বেজী তার দাদাদের পিছনে পিছনে পাঠশালায় যায়, কিন্তু পাঠশালায় যাইয়ে তাকে বারি বসে থাকতি অয় অন্য সময় তার দাদারা সবাই মাঠে খেলা-ধুলা করতি নামে কিন্তু ছোডভাই বেজীকে তারা সঙ্গে নেয় না। বেজী এলা এলা খেলা করে। দাদারা এনে ওনে বেড়াতি যায় কিন্তু বেজীকে তারা নিতি চায় না।

একদিন রাজপুত্ররা রাজার কাছে বায়না ধরল তারা নিজিরা জমি চাষ করে ধান বোনবে। যে কথা সেই কাজ। রাজপুত্ররা জমি চাষ করতি গেল। এদিকি ছোড়ছেলে বেজী মাকে কলো আমিও মাডে যাইয়ে ধান বোনবো। ছেলের কাঁন্দাকাটিতে শেষ পোনতো ছোডরানি অন্যের বাড়িরতে কিছু বীজ ধান আনে ছেলে বেজীর কাছে দিল।

ছোড ছেলে বেজী তহন তার ভাগের জমিতি যাইয়ে নখদিয়ে আঁচড় কাটে কাটে ধান বুনলো। তাই দেহে অন্য রাজপুত্ররা ও রাজকর্মচারীরা হাসাহাসি কততি থাহে। দাদাগে হাসাহাসি শুনে বেজী তহন মনের দুহি বাড়ি চলে আসে। ধান বোনার কিছুদিন পর দেহা যায় ছোড ছেলে বেজীর জমিতি সবচাইতে বেশি ধান অয়ছে।

বেজী তহন ধীরে ধীরে ধান কাটে বাড়ি নিয়ে আসে। বেজী বনে যাইয়ে তার মায়ের জন্যি হরেকরকম ফল নিয়ে আসে। মায়ের কাছে গল্প শোনে। পাড়ার অন্য ছেলে-মেয়েদের সাথে খেলা করে। এইফেলে দিনির পর দিন গড়ায়ে যায়। একদিন রাজপুত্ররা সবাই যায় বনে শিকার কোততি। ছোড ছেলে বেজী তার দাদাগে পিছনে পিছনে যায় বনের মধ্যি।

বনে শিকার কোততি যাইয়ে রাজপুত্ররা বাঘের আক্রমণের শিকার অয়। ছোডভাই বেজী তহন কৌশলে দাদাগে বাঘের হাতেরতে রক্ষে করে। সেহেনতে দাদারা ছোডভাই বেজীকে সবসময় কাছে রাহে। কিন্তু রানিরা তা সহ্য কোততি পারে না। শিক্ষা দীক্ষায়, যুদ্ধে রাজপুত্ররা বড় অইয়ে ওটে। রাজা তহন রাজপুত্রদের বিয়ে দিতি চায়।

একদিন পাশের রাজ্যের রাজকন্যার স্বয়ম্বর সভায় যোগ দিতি রাজপুত্ররা সেজেগুঁজে রওয়ানা অয়। ছোডভাই বেজী তহন দাদাগে কয়, আমিও তোমাগে সাথে যাব।’ ছোডভায়ির পীড়াপীড়িতে দাদারা বেজীভাইকে সাথে নিয়ে চললো স্বয়ম্বর সভায় যোগ দিতি।

রুপকথা
রুপকথা

 

রাজপুত্ররা সবাই স্বয়ম্বর সভায় আসে হাজির অলো। শত শত রাজপুত্ররা সারি দিয়ে দাঁড়ালো। সবার শেষে ছোড় ভাই বেজী যাইয়ে দাঁড়ালো। রাজকন্যা ধীরে ধীরে আগোইয়ে আসে। বিভিন্ন দেশের রাজপুত্রদের পার করে রানি সাতভাইয়ের কাছাকাছি আসে পড়লো। রাজার ছয়পুত্র মনে কোললো রাজকন্যা তাদের মধ্যি যে কাউকে বাছে নেবে। রাজপুত্ররা মনে মনে আনন্দিত অলো।

কিন্তু দেহা গেলো রাজকন্যা তাদের ছয়ভাইকে পার করে আগোইয়ে গেলো ছোডভাই বেজীর দিকি। এবং রাজকন্যা আসতি আসতি বেজির পায় জল ঢাললো। সঙ্গে সঙ্গে রাজপ্রাসাদে ঢাক-ঢোল, জয়ধ্বনি বাজে উঠল। রাজকন্যা তার হাতের মালা পরাইয়ে দিল বেজীর গলায়। ছোডভাইয়ের গলায় রাজকন্যার মালা দেয়া দেহে অন্যান্য রাজপুত্ররা তহন কলো

চোখ থাকতি চোখ খালি,

বেজির পায় জল ঢাললি।।

যথাসময়ে নিয়মমতো বেজির সাথে রাজকন্যার বিয়ে অইয়ে গেল। বেজি তহন বিয়ে করে শত শত সামগ্রী নিয়ে ফিরে আসলো তার কুঁড়ে ঘরে। রানিমা সাদরে গ্রহণ কোললো তার পুত্রবধূকে। ছোডরানি তার ছোট সংসার নিয়ে শান্তিতে বসবাস কোততি থাহে। এদিকি অন্য রানিরা হিংসায় পুড়ে মরে।

কিছুদিন পর ছোডপুত্র বেজীর স্ত্রী অবাক অইয়ে দেহে, বেজী রাত্রে ঘুমোতি যাবার সময় শরীরেরতে বেজীর পোশাক খুলে পুরোপুরি সুদর্শন রাজপুত্রর বেশে ঘুমোতি আসে। রাজকন্যা তহন গভীর রাত্রে ঘোমেরতে উটে বেজীর পোশাক আগুনে পোড়াইয়ে দেয়।

সকালে ছোড় রাজপুত্র ঘোমেরতে উটে তার বেজীর পোশাক খুঁজে না পাইয়ে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা কোললো যে, তার বেজীর পোশাক কনে। স্ত্রী কলো যে সে সেডা পোড়াইয়ে ফ্যালেছে। ছোডপুত্র তহন নিরূপায় অইয়ে তার স্ত্রী ও মাকে সব খুলে কলো। দিনির বেলায় সব জানাজানি অইয়ে গেল। তহন রাজা, রানিরা ও রাজপুত্ররা বেজী ও তার মায়ের কাছে আসে ভুল স্বীকার করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেল। বেজী তহন সবার সাথে আনন্দে ঘর কোততি থাকলো।

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

“ছোট রানী ও তার পুত্র বেজী রাজপুত্র – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা”-এ 6-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন