ছোডবউ লোকগল্প – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

ছোডবউ লোকগল্প : এক গেরামে ছিল এক কৃষক। তার ছিল চার সন্তান। সন্তানেরা কোনো কাজ-কৰ্ম্ম অ্যাহে অ্যাহে হইয়ে কৃষক তার স্ত্রী পৃথিবীরতে চিরবিদায় নিল। কৃষকের চার সন্তান পড়ে মহাবিপদে। বড়ভাই অন্য তিনভাইরে ডাকে কলো, আমাগে কোততি অবে। তহন চারভাই কোততি যায়। ছোডভাই কোনো কাজ ঠিকমতো কোততি পারে না। ছোডভাইয়ির প্রতি সবাই রাগ করে।

ছোডবউ - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

বড়ভাই বিয়ে করে। অ্যাহে চারভাইয়ির তিনভাই বিয়ে ছোডভাই তহন কাজ কোততি পারে। কিন্তু ভাইগে কোনো মিল থাহায় তারগে সংসারে অভাব লাগেই থাহে। এক ভাইয়ির সাথে ভাইয়ির রাগারাগি লাগেই থাহে। সংসারে তারগে অভাব থাহায় ছোডভাইকে কেউ মাইয়ে দিতি চায় কিন্তু ছোডভাই বিয়ে কোততি চায়।

বড়ভাইয়িরা ছোড়ভাইয়ির জন্যি মাইয়ে খোঁজ করে পায় না। সমস্তদেশে মাইয়ে খোঁজ কোততি কোততি তারা গরীব কৃষকের বাড়ি আসে হাজির হয়। গরীব কৃষক টাহার অভাবে মাইয়েকে বিয়ে পারে তহন বড় তিনভাই মাইয়ের বাবারে আমাগে কিছু দেওয়া লাগপে তোমার মাইয়েকে আমাগে ছোডভাইয়ির সাথে বিয়ে দ্যাও।

তহন গরীব কৃষকের মাইয়ের সাথে ছোডভাইয়ির বিয়ে অয়ে যায়। ছোডবউকে সাথে নিয়ে চারভাই বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি আসে যে যার ঘরে চলে যায়। বাড়িতে কোনো রান্নাবান্না অচ্ছে দেহে ছোডবউ সবাইকে তেলের শিশি আগোইয়ে দিয়ে তোমরা সবাই নদীরতে ছেনান করে আসো। তোমাগে জন্যি রান্না কোততিছি। ভাইয়িরা ঘরেতো কোনো নেই। কিছুই নেই।

ছোডবউ কলো, নিয়ে তোমাগে ভাবতি অবে তোমরা ছেনান করে আসো। চারভাই নদীতি গেলো ছেনান কোততি। তহন ছোডবউ রান্নাঘরে যাইয়ে দ্যাহে কোথাও কিছু নেই। মাটের নিচেয় হাত দিয়ে দ্যাহে এটটা চাল আছে। তহন এটটা চাল দিয়ে এক হাড়ি ভাত রান্না এইরাম করে তরিতরকারি রান্না অয়।

ভাইয়িরা ছেনান করে আসলি, সবাইকে বসতি চারভাই খাতি বসে একজন অন্যজনের মুহির দিকি তাহায়। তারা ভাবে ঘরেতো নেই। ছোড়বউ তাদের থাতি দেবে। কিন্তু খাতি বসেই তারা অবাক অয়ে সবাইরি থালা ভাত, তরিতরকারি দিতি থাহে ছোড়বউ। চারভাইয়িরা খাবার চারবউ যায়।

পরেরদিন সহালবেলায় ছোড়বউ সবাইরি কয় এটটা গরুর গাড়ি ভাড়া করে আসতি। চারভাই ভাবে দিয়ে অবে। গরুর আসে। তহন ছোডবউ তার স্বামীকে কয় আমি ধানের গোলায় ওটপো। আর ধানের ধামা ধরবা, আর কেউ যানো ধামা ধরে। তহন অন্য ভাই ও বউরা একজন অন্যজনের দিকি তাকাতাকি কোততি থাহে।

ছোড়বউ তহন ধানের গোলারতে ধামা ধামা ধান বার করে গরুর গাড়িতি রাহে। গোলারতে ধান বার করা হলি ছোডবউ সবাইকে কয় যে, এগুলো হাটে বিক্রি করে সবার জন্যি, শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, জামা-কাপড়, হাড়ি-পাতিল কিনে নিয়ে আসো। তহন চারভাই সেইগুলো বিক্রি করে হাটেরতে সবকিছু কিনে নিয়ে আসলো।

 

ছোডবউ - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

[ ছোডবউ লোকগল্প – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা]

এইরাম করে দিন কাটে, ছোডবউয়ের কথামতো ভাইয়িরা সব কোততি থাহে। সংসারে উন্নতি অয় দিনি দিনি। কিন্তু বাড়ির অন্য বউরা হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মোততি থাহে। তারগে রান্নাঘরে যাতি দেওয়া অয়না। ধানের গোলায় উঠতি দেওয়া অয় না। তারগে স্বামীরা তারগে কোনো কথা শোনে না। তাই সবাই মিলে স্বামীগে বোঝায় যে ছোড়বউ বাড়িতি থাকলি তারা এ বাড়িতি থাকপে না।

তহন বড় তিনভাই ছোডভাইকে কয় যে তার বউকে বাড়িরতে তাড়াতি অবে না হলি ছোডভাইয়ির সাথে তারগে কোনো সম্পর্ক থাকপে না। তহন চারভাই ও তিনবউ মিলে ছোড়বউকে নানা কুকথা কয়ে বাড়িরতে বার করে দিল। ছোড়বউ তহন মনের দুহি বনবাসী অয়। বনের মধ্যি সে গড়ে তোলে ছোট একটি কুটির।

 

রুপকথা
রুপকথা

 

যহন ছোড়বউকে বাড়িরতে বার করে দেওয়া অয় তহন সে ছিল অন্তঃসত্ত্বা। একদিন ছোড়বউ প্রসব করে ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান। ছোড়বউ তার সন্তানকে নিয়ে সংসার পাতে। দিনি দিনি তার সংসার বড় অয়ে ওঠে। বছরের পর বছর যায়। ছোড়বউয়ের নাম ছড়াইয়ে পড়ে দিকি দিকি। ছোড়বউয়ির ধানের গোলা, গরুর গোয়াল, বিঘার পর বিঘা জমি, ফলের ক্ষ্যাত, স্যানে শত শত লোক প্রত্যেকদিন কাজ করে। তার ছেলে সেসব দেহাশুনো করে।

ছোড়বউ একদিন বিশাল এক দিঘি কাড়ার কাজ শুরু করে। স্যানে শ শ লোক ঝুড়ি কোদাল নিয়ে কাজ করে। একদিন সহালবেলায় দূরের গেরামের চারজন লোক তারা চারভাই আসে দিঘি কাটার কাজ কোততি। তারা আসে ছোড়বউয়ের ছেলেকে কয় যে তারগে খুব অভাব, ঘরে কোনো খাবার নেই, পরনের কাপড় নেই। যদি তারগে এটটু কাজ দেওয়া অয় তালি ভালো অয়।

তহন ছোড়বউয়ুর ছেলে তারগে কাজে লাগাতি চায়। কিন্তু দূরিরতে ছোড়বউ দ্যাহে যে এই চারজন অচ্ছে তার স্বামী ও ভাসুররা। তহন ছেলেরে কলো ঐ চারজনকে কাজ কোততি দিয়ে না। ওরগে তুমি খাতে ডাকে নিয়ে আসো। তহন ছেলে তারগে কাজ কোততি না দিয়ে খাতি ডাকে নিয়ে আসে। বাড়ির ঝিরা তারগে প্যাট ভরে মাছ, মাংস, দুধ দিয়ে খাওয়ালো। তারা তৃপ্তিভরে খাইয়ে বাড়ি চলে যায়।

পরের দিন তারা আবার আসে কাজ কোেততি। কিন্তু সেদিনও তারগে কাজ কোভতি দেওয়া অলো না। ছোড়বউ তার ছেলেকে কলো বাপজান ওরা তোমার বাবা ও জ্যাঠারা। ওরগে কাজ কোততি দিসনে, বাজারেরতে জামাকাপড় কিনে ওরগে দ্যাও। তহন সেইদিনও তারা প্যাটভরে খাইয়ে লুঙ্গি, গামছা, জামাকাপড় নিয়ে বাড়ি ফেরে। পরের দিন তারা আবারও আসে কাজ কোততি। কিন্তু সেদিনও ছেলে তারগে কাজ কোততি দিতি না চালি তারা কয় যে, আমাগে রানিমার কাছে নিয়ে চলো।

রুপকথা রানী ছোডবউ লোকগল্প - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

তহন ছেলে তারগে তার মার কাছে নিয়ে যায়, তহন চারভাই পর্দার আবডালে দাঁড়াইয়ে কয়, রানিমা আমরা রোজ খাইয়ে যাই কিন্তু ঘরে আমাদের স্ত্রী ও সন্তানরা অভুক্ত রয়ছে। আমরা কাজ করে মজুরি না পালি তারা না খাইয়ে মরে যাবেনে। দয়া করে আমাগে কাজ করার হুকুম দ্যাও। বলতি বলতি তারা চারভাই কানদে ফ্যালে।

তহন ছোড়বউ ঘরেরতে বার অয়ে তার ভাসুরগে ও স্বামীকে প্রণাম করে। চারভাই তহন একসঙ্গে কয়ে ওঠে ছোড়বউ তুমি! – হ্যা আমি। তোমরা সবাই মিলে আমারে বাড়িরতে বার করে দিলে। আমার প্যাটে তহন ছিল ঐ ছেলে।

-চারভাই তহন কয় যে আমাগে তুমি মাফ করে দ্যাও।

-ছোড়বউ তহন কয় যে তোমরা সবাই আজকেরতে এহেনি থাকপা। বড়দিদিগেও এহেনি নিয়ে আসো। তারপরেরতে চারভাই ও চারবউ তাদের সন্তানাগে নিয়ে সুহি শান্তিতি ঘর কোততি থাকলো।

 

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

“ছোডবউ লোকগল্প – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন