ছোডরানি ছোডছেলে – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

ছোডরানি ছোডছেলে : দেশে ছিল এক রাজা। রাজার ছিল তিন রানি। রাজার প্রচুর সহায় সম্পত্তি থাকলিও রানিদের কোনো সন্তান অতো না। রাজা ছিল খুব অশান্তিতি। রাজ্যের যত বদ্যি কবিরাজ সব এহে এহে রানিগে চিকিৎসা করে। কোনো কিছুতেই কোনো হয় না। একদা রাজবাড়িতে এক সন্ন্যাসী এলেন। এসে রাজাকে বললেন, আপনার রানিদের সন্তান হবে আমার ব্যবস্থাতে। তবে একটা শর্ত আছে। আপনি আপনার ছোট সন্তানের মুখ দেখতে পারবেন না।

 

ছোডরানি ছোডছেলে - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

যদি বার বছরের পূর্বে আপনি আপনার ছোট সন্তানের মুখ দেখেন তবে আপনি অন্ধ হয়ে যাবেন। রাজা তখন বলল, সন্ন্যাসী আপনার কথা ঠিক থাকবে, আপনি রানিদের চিকিৎসা করেন। আমি ছোট সন্তানের চেহারা দর্শন করব না। তবে সন্ন্যাসী, অন্ধ হলে তার কি কোনো চিকিৎসা হবে না। সন্ন্যাসী বললো, হবে, তবে তা কিছুতেই সম্ভব নয়।

সাত সমুদ্র তের নদীর পার জঙ্গলমাঝে একটি গৃহ আছে, সেখানে তিনটি কন্যা বন্দী আছে। সেখানে একটি রক্তগন্ধী বৃক্ষের পাতা দিয়ে সাতপরল কাপড় দিয়ে চোখ বেধে রাখলে সাতদিন পর চোখ ভালো হবে। এই বলে সন্ন্যাসী তার ঝোলা থেকে তিনটি ফল বের করে তিন রানিকে দিবেন। বললেন এই তিনটি ফল সেবন করলে আপনাদের সন্তান হবে।

সন্ন্যাসীর কথামতো রানিরা ফল তিনটি খেয়ে নিল। সন্ন্যাসীর যে কথা সেই কাজ। দিনে দিনে রানিদের গর্ভ বেড়ে উঠল। দশ মাস দশদিন পর রানিরা সন্তান প্রসব করল। সবার শেষে হলো ছোড়রানির সন্তান। তিন রানির মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর হলো ছোডরানির ছেলের চেহারা। কিন্তু সন্ন্যাসীর কথামতো রাজা ছোট সন্তানের চেহারা দেখতে পারলো না।

দিনে দিনে রাজার ছেলেরা বড় হয়ে ওঠে। ছোট ছেলে যে পথে যায় রাজা সে পথে যায় না। রাজা সারাদিন ভয়ে ভয়ে থাকে। কখন না জানি ছোট ছেলের মুখ দর্শন হয়ে যায়। একদা রাজা ময়ুরপঙ্খী চড়ে বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার মনস্থির করলেন। রাজার বড় ছেলে মেঝ ছেলে সব এসে পিতার কাছে আবদার করে তাদের জন্য হরেকরকম খেলনা, খাবার আনতে।

 

রুপকথা
রুপকথা

 

কিন্তু ছোড়ছেলেকে ছোডরানি পিতার কাছে যেতে দেয় না। কিন্তু ছোড়ছেলে কোনো কিছুই শুনতে চায় না। সে বলে আমাকে পিতার কাছে যেতে দিতেই হবে। বলে সে মায়ের কথা না শুনে এক দৌড়ে পিতার কাছে চলে আসলো। ময়ূরপঙ্খী ঘোড়া তখন উড়তে শুরু করেছে। ছোড়ছেলে তখন এসে ডেকে বলেছে, পিতা পিতা আমার কথা শোনো।

রাজার তখন সন্ন্যাসীর কথা ছিল না মনে। সে নীচের দিকে ছোট সন্তানের দিকে যখনই তাকিয়েছে অমনি চোখে যন্ত্রণাবোধ করা শুরু করল, এবং সাথে সাথে অন্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তখন রাজমহলের সবাই এসে রাজাকে গৃহমাঝে নিয়ে আসলো। আর বড়রানি মেজরানি ও তার ছেলেরা ছোডরানি ও তার ছেলেকে অলক্ষুণে, অপয়া বলে গালমন্দ করতে থাকলো। তারা সবাই মিলে ছোড়রানি ও ছোড়ছেলেকে রাজমহলের বাইরে বের করে দিল।

রানি তার সন্তানকে নিয়ে কুঁড়েঘরে স্থান নিলো। তখন ছোড়ছেলে মাকে জিজ্ঞাসা করলো, মা পিতার চোখ ভালো হবে কিসে। তখন ছোডরানি সন্ন্যাসীর সব কথা খুলে বলল। ছোড়ছেলে তখন মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে জঙ্গলমাঝে এসে পড়লো।

[ ছোডরানি ছোডছেলে – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা ]

পথে আসতে তাকে কখনো আগুনের সাথে, কখনো ঝড়ের সাথে, কখনো সাপের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। জঙ্গলমাঝে হাঁটতে হাঁটতে রাজকুমার একসময় গভীর জঙ্গলে এসে ছোট একটা মন্দির দেখতে পেল। সন্ন্যাসীর কথামতো রাজকুমার দেখলো মন্দিরের মাঝে অতি সুন্দরী তিনটি কন্যা। আর তাদের পাহারা দিচ্ছে একটি বাঘ।

রুপকথা 2 ছোডরানি ছোডছেলে - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

রাজকুমার তখন খাঁচা তৈরি করে কৌশলে বাঘকে বন্দী করলো এবং কন্যাদের মুক্ত করে বললো এখানে রক্তগন্ধী বৃক্ষ কোথায়। কন্যারা বললো আমাদের তিনজনকে বলি দিলে আমাদের তিনজনের রক্ত এক জায়গায় মিলিত হলে একটি বৃক্ষের জন্ম হবে।

তার পাতা দিয়ে তোমার পিতার চোখ ভাল হবে। রাজকুমার বললো, তোমাদের হত্যা করলে তারপর কি হবে। কন্যারা বললো, মন্দিরের মধ্যে মা কালীর পায়ের নীচে যে জলের ঘট আছে সেই ঘটের জল আমাদের দেহে ছিটিয়ে দিলে আমরা পুনরায় জীবন ফিরে পাব। রাজকুমার তখন তাদের জবাই করলো, এবং তাদের রক্তধারা এক জায়গায় এসে মিলিত হলে একটি বৃক্ষের জন্ম হলো।

রাজকুমার তখন সেই বৃক্ষের পাতা তুলে নিয়ে মন্দিরে রাখা ঘটের জল তিন কন্যার শরীরে ছিটিয়ে দিলো। কন্যারা জীবন লাভ করে বললো, তুমি আমাদের তিনবোনকে নিয়ে যাও। রাজকুমার তখন তিনকন্যাকে সাথে নিয়ে ফিরে আসলো। এসে পিতার চোখে পাতা দিয়ে সাতপরল কাপড় বেঁধে দিল। সাতদিন পর রাজা দৃষ্টি ফিরে পাইয়ে সবকিছু শুনে ছোডরানি ও ছোড়ছেলেকে রাজমহলে ফিরেইয়ে আনলো এবং তিন কন্যার সাথে তিন সন্তানের বিবাহ দিয়ে সুহি শান্তিতি বসবাস কোততি থাকলো।

 

ছোডরানি ছোডছেলে - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

“ছোডরানি ছোডছেলে – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন