জঙ্গলমাতার গল্প – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

জঙ্গলমাতার গল্প : এক ছিল বিধবা মা। তার একটিমাত্র ছেলে। নাম তার হীরেন। হীরেন বিধবা মায়ের নয়নের মনি। ছোটবেলারতেই তার মা হীরেনকে কোনো কাজ-কর্ম কোততি দিতো না। ফলে পাড়ার অন্য ছেলেদের কাছে হীরেন ছিল হিংসার পাত্র। হীরেন ধীরে ধীরে বড় অইয়ে ওটে। কিন্তু সে কাজকর্ম কিছু কোততি পাততো না। বুদ্ধি বিবেচনা তার অন্যদের চাইয়ে খুব কম।

জঙ্গলমাতার গল্প - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা - জঙ্গল, Forest

 

একদিন গেরামের পুরুষরা ও যুবকরা জঙ্গলে যাতিলো কাঠ কাটতি। তারা আসে হীরেনের মাকে কলো, হীরেনকে আমাদের সাথে দ্যাও। ওকে কাঠ কাটতি নিয়ে যাই। তালি তোমার কাঠের অভাব থাকপে নানে। বিধবা মা কলো, না আমার হীরেনরে তোমরা নিয়ো না। জঙ্গলে বাঘ-ভালুকি ওরে খাইয়ে ফ্যালবেনে। তহন যুবকেরা কলো তুমি যে কি কও। আমরা ওরে জঙ্গলে নেবনানি। নৌকায় বসাইয়ে রাইহে যাবানি। আমাদের ছোড-খাডো কাজে সাহায্য করবেনে।

নানা কাকুতি-মিনতির পর হীরেনরে নিয়ে তারা জঙ্গলে গেল। হীরেনরে নৌকায় বসাইয়ে রাইহে তারা গেলো জঙ্গলে কাঠ কাটতি। হীরেন নৌকায় বসে সাগরের মাছ, বনের পশু-পাখি দেখতি থাহে। আর মাঝে মাঝে মনে মনে ভয় পায়, মেলা সময় পর সবাই কাঠ নিয়ে ফিরে আসলো। নৌকায় আসে হীরেনরে কলো, ছোড় এক আঁড়ি কাঠ তীরে রইয়ে গেছে, তুই কাঠের ছোড আঁডিডা নিয়ে আয়।

তহন সবার পীড়াপীড়িতে হীরেন নৌকারতে নামে কাঠ আনতি গেল। এমন সময় তারা নৌকা ছাড়ে দিল। কাটের আঁটি নিয়ে আসে হীরেন নৌকা দেখতি না পাইয়ে ভয় পাইয়ে গেল। একবার সে সাগরে ঝাপ দিতি যায়, আবার ভাবে যদি কুমিরে খাইয়ে ফ্যালে। আবার ভাবে ডাঙায় থাকলি যদি বাঘে খায়। এই কততি কততি সে কান্নাকাটি শুরু করে। দু’চোখ বাইয়ে তার জলের ধারা নামে আসলো। এমনি সময় হঠাৎ পিছন দিকতে একটি নারীর কণ্ঠ শুনতি পায়। তোমার কি হয়েছে হীরেন। কানতোছো কেন?

হীরেন পিছনে তাহাইয়ে দ্যাহে একটি সুন্দর নারী। নারীটি কলো তুমি কাঁদেনে বাবা। আমি তোমারে তোমার মার কাছে নিয়ে যাবানি। হীরেন কয় তুমিতো আমার মা। তুমি এহেনি ক্যারাম করে আয়ছো মা। আমি তোমার মা নই। চলো তোমারে আমাগে ঘরে নিয়ে যাই।

এদিকি জঙ্গলে যাওয়া যুবকরা বাড়ি ফিরে আসলি হীরেনের মা কলো, আমার হীরেন কনে। তারা মিথ্যে করে কলো হীরেনরে তো আমরা ফিরে আসে নামাইয়ে দিছি। দ্যাহো কনে গেছে। মা অনেক খোঁজাখুজি করে হীরেনকে পালো না। হীরেনকে না পাইয়ে তার মা কাঁনতি কানতি অন্ধ হইয়ে যায়। আর সারাদিনরাত শুধু হীরেন হীরেন বলে ডাকাডাকি করে।

এদিকি জঙ্গলমাঝে হীরেন এক বিরাট রাজপ্রাসাদে আসে। তার জঙ্গলমাতা তারে প্যাট ভরে মিষ্টি মণ্ডা খাওয়ালো। আর হীরেনরে অনেককিছু দিল। নতুন জামাকাপড় আনে দিল। একদিন জঙ্গলমাতা কলো, বাবা, তোমার মা তোমার জন্যি কানতি কাঁনতি অন্ধ হইয়ে গেছে। তোমার বাড়ি যাওয়া দরকার। হীরেন কলো কি যে কও তুমি মা।

 

রুপকথা 2

 

তুমিতো আমার মা, আমি আবার তোমারে রাখে কনে যাব। আমি কোনো জায়গায় যাব কানতি সে অন্ধ হইয়ে গেছে। সে শুধু পাগলের মতো কথা কচ্ছে। তোমার বাড়ি যাতে নারা। না বাবা, আমি তোমার মা না। তোমার মা বাড়িতে আছে। তোমার শোকে কাঁনতি অবে। হীরেন কলো, আমি এহালা এহালা ক্যারাম করে যাব। জঙ্গলমাতা কলো, আমি তোমারে নিয়ে যাব।

তারপর জাঙ্গলমাতা হীরেনরে সাথে নিয়ে নৌকো বোঝাই করে চাল, ডাল, তরিতরকারি, সোনা-দানা, মনি মুক্তো, কাঠ, পান-সুপারি, মেলাকিছু নিয়ে তার বাড়ির দিকি রওয়ানা দিলো। আর একটি হাঁড়ি ও একটি শিকে দিয়ে কলো, বাড়ি যাইয়ে এই হাড়িরতে জল নিয়ে তোমার মার চোহে ছিটেইয়ে দিলি তোমার মা ভালো অয়ে যাবেনে।

আর ঘরের মাঝখানে শিকে ঝুলোইয়ে তাতে এই হাড়িটি রাখপা। এই হাড়ির ভিতর তুমি কোনোকিছু রাখলি তা অনেক অয়ে যাবে। কিন্তু তুমি ছাড়া আর কেউ তা করলি কিন্তু অবে না। হীরেন জঙ্গলমাতাকে সঙ্গে নিয়ে গেরামের বাড়ি আসে। সবাইকে সে কলো এই যে আমার জঙ্গলমাতা, কিন্তু কেউ জঙ্গলমাতাকে দেখতি পায় না। শুধু হীরেন ছাড়া।

আর গেরামের সবাই কলো হীরেন পাগল অইয়ে গেছে। হীরেন বাড়ি পৌঁছেইয়ে দ্যাহে তার মা কানতি কাঁনতি অন্ধ অইয়ে গেছে। তহন সে হাড়ির জল নিয়ে মার চোহে ছিটায়ে দিলো। আর অমনি তার মার চোখ ভালো হইয়ে গেল। ছেলেকে সামনে পাইয়ে তাকে জড়াইয়ে ধরে তার মা হাউমাউ করে কানতি কানতি কলো এতদিন কনে ছিলি বাবা। হীরেন কলো আমার জঙ্গলমাতার কাছে। কে তোর জঙ্গলমাতা। ঐতো আমার জঙ্গলমাতা, হীরেন কলো।

কিন্তু হীরেনের মা জঙ্গলমাতাকে দেখতি পায় না। ভাবে ছেলে তার অনেকদিন জঙ্গলে থাইয়ে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। জঙ্গলমাতা তহন হীরেনের কাছতে বিদায় নিয়ে চলে যায়। আর যাবার সময় বলে যায় আমারে কোনো সময় তোমার মনে পড়লি, দরকার পড়লি তিন তিনবার জঙ্গলমাতা বলে ডাক দিয়ো। আমি চলে আসপো। হীরেন ঘরের মধ্যি যাইয়ে ঘুম পাড়লো। পরের দিন সহালবেলায় তার মা কলো, বাবা হীরেন, তুমি বড় অয়ছো। এহন কাজকর্ম কর। বিয়ে কর।

হীরেন কলো, মা তুমি মাইয়ে দ্যাহো আমি বিয়ে করব। মা কলো, কাজকর্ম না করলি তোমারে কেউ মাইয়ে দেবেনানে। হীরেন কলো আমার কাজকর্ম করা লাগবে না। আমার জঙ্গলমাতা আছেনা? মা ভাবে ছেলের মাথা ঠিক নেই। তাই মা মাইয়ে দেখতি রাজি অয়না। তাই হীরেন নিজেই মাইয়ে দেখতি বার হয়। কেউ তারে মাইয়ে দিতি রাজি অয় না। অবশেষে গেরামের শেষে এক দরিদ্র কৃষক তার মাইয়েরে হীরেনের সাথে বিয়ে দিতি রাজি হয়।

[ জঙ্গলমাতার গল্প – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা ]

যথা সময়ে বিয়ের দিন আসে হাজির হলো। হীরেন মারে কলো, দশ গেরামের সবাইকে তুমি নেমতন্ন করে আসো। মা কলো, নেমতন্ন করে খাতি দিবি কি? হীরেন কলো, আমার জঙ্গলমাতা আছেনা? মা হীরেনের উপর রাগ করে ঘরের দরজা দিয়ে শুয়ে থাহে। হীরেন নিজেই সমস্ত গেরামের লোককে নেমতন্ন করে আসে। সবাই ভাবে হীরেন পাগল অইয়ে গেছে।

যথাদিনি হীরেনের বিয়ে অইয়ে গেল। বৌভাতের অনুষ্ঠানে দু’একজন করে মানুষ আসে। আর হীরেন শিকেতে হাড়ি ঝুলোইয়ে যা ইচ্ছা তাই তৈরি করে সবাইকে প্যাট ভরে খাওয়ালো। প্যাট ভরে খাইয়ে বাড়ি যাবার পথে গেরামের লোকেরা ঢেহুর তুলতি তুলতি বাড়ি ফেরে। এই খবর পাইয়ে সমস্ত গেরামের মানুষ একে একে হীরেনের বাড়ি আসে হাজির হয়। আর প্যাট ভরে খাইয়ে যায়।

আর অনেক সোনা, মনি, মুক্তো, দামী শাড়ি পরা নতুন বৌকে আশীর্বাদ করে যায়। এইরাম করে দশদিন ধরে দশগেরামের মানুষ হীরেনের বাড়ি যাতায়াত করে। হীরেনের মা সমস্ত কর্মকাণ্ড দ্যাইহে হতবাক হইয়ে যায়। হীরেনরে কয়, বাবা কনে তোর জঙ্গলমাতা আমারে এটটু দেহাবি। হীরেন কলো, মা, জঙ্গলমাতাতো সবসময় আমার সঙ্গে থাহে। তারেতো আমি ছাড়া আর কেউ দেখতি পায় না। এইফেলে দিনির পর কাটে। গ্রামের লোক হীরেনের ক্ষমা চায়। তারা চলে যায়। চারিদিকি হীরেনের নামডাক ছড়াইয়া পড়ে। হীরেনের কথামতো গেরামের সবাই সুহি-শান্তিতি দিন কাটাতি কাটায়।

 

আরও পড়ুন:

ছোট রানী ও তার পুত্র বেজী রাজপুত্র – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

“জঙ্গলমাতার গল্প – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন