মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতা আব্দুল হাই গ্রেফতার

This post is also available in: বাংলাদেশ

জঙ্গি নেতা আব্দুল হাই গ্রেফতার, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা ও রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি জ’ঙ্গি নেতা আব্দুল হাইকে (৫৭) গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় অভিযান চালিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর মুফতি আব্দুল হাইকে গ্রেফতার করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, জঙ্গিগোষ্ঠী হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) সাবেক আমির মুফতি আবদুল হাই বারবার ঠিকানা বদল করে আত্মগোপন করতেন। আব্দুল হাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জ’ঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) প্রতিষ্ঠাতা আমির। আশির দশকে ভারত-পাকিস্তানের মাদরাসায় পড়াশোনা করা আব্দুল হাই আফগানিস্তানে মুজাহিদ হিসেবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতা আব্দুল হাই গ্রেফতার

তিনি ১৯৯১ সালে দেশে ফিরে এসে হুজি-বি প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৯২ সালে কক্সবাজারের উখিয়ায় ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করেন। পার্শ্ববর্তী দেশের এক জ’ঙ্গি নেতা অস্ত্র সরবরাহ করতেন এবং আব্দুল হাইসহ তিনজন সেখানে প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রায় ৪ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে এ কার্যক্রম চালিয়ে আসার পর ১৯৯৬ সালে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ওই ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ৪১ জনকে গ্রেফতার করা হয়।জ’ঙ্গি নেতা আব্দুল হাই ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টা, ২০০১ সালে রমনা বটমূলে বোমা হামলা, ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলা, ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলায় জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা হয়েছে, ৭টি গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে, যার মধ্যে ২টি মৃত্যুদন্ড ও ২টি যাবজ্জীবন কারাদন্ড।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতা আব্দুল হাই গ্রেফতার

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোটালীপাড়ায় জনসভার অদূরে জ’ঙ্গি মুফতি আব্দুল হাইসহ অন্য জ’ঙ্গি সদস্যরা ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুতে রাখে। এ ঘটনায় দায়েরকরা মামলায় ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট জঙ্গি নেতা আব্দুল হাই সহ ১০ জনের মৃত্যু এবং ৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড দেয়া হয়। ২০০১ সালে ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ২০১৪ সালের ২৩ জুন আব্দুল হাইসহ ৮ জনকে মৃত্যুদন্ড এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়েছে।

 

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতা আব্দুল হাই গ্রেফতার

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত এবং প্রায় তিন শতাধিক গুরুতর আহত হন। এ মামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ১৯ জনকে মৃত্যুদন্ড এবং আব্দুল হাইসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত। মুফতি আব্দুল হাই ওই গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
এছাড়া, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদরে বৈদ্যের বাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের জনসভায় জঙ্গিরা গ্রেনেড হামলা চালিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ ৫ জনকে হত্যা করে। এছাড়া এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের আরও শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। এ মামলায় আব্দুল হাই চার্জশিটভূক্ত পলাতক আসামি।

আব্দুল হাই নারায়গঞ্জের দেওভোগ মাদরাসায় ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত হেফজ বিভাগে পড়ালেখা করেন। এরপর ১৯৮১ সালে অবৈধভাবে পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে দেওবন্দ দারুল উলুম মাদরাসায় লেখাপড়ার জন্য ভর্তি হয়। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত দেওবন্দে পড়ালেখা করে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে। এরপর ১৯৮৫ সালের শেষে ওই দেশের নাগরিক হিসেবে একটি পাসপোর্ট তৈরি করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং ১৯৮৬ সালে পুনরায় সেদেশে ফিরে যান। সেখান থেকে পাকিস্তানি ভিসা নিয়ে করাচিতে গিয়ে একটি মাদরাসা থেকে ২ বছরের ইফতা কোর্স শেষ করে মুফতি টাইটেল অর্জন করে।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতা আব্দুল হাই গ্রেফতার

১৯৮৯ সালে ওই মাদরাসায় একাধিক বাংলাদেশিসহ বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি মিরানশাহ বর্ডার দিয়ে আফগানিস্তানে মুজাহিদ হিসেবে যান। সেখানে বাংলাদেশের কয়েকজন জ’ঙ্গি সদস্য ও ৩০ থেকে ৩৫ জন পাকিস্তানি নাগরিক একত্রিত হয়ে একটি ক্যাম্পে অবস্থান নেন। সেখানে পাকিস্তানি এক হুজি নেতা এবং বাংলাদেশি এক জঙ্গির নেতৃত্বে একে-৪৭ রাইফেল ও থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেন। আফগানিস্তানে থাকাকালীন হুজি-বি নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন মুফতি আব্দুল হাই। তিনি হুজি-বির আমির হিসেবেই বাংলাদেশে আসেন এবং ১৯৯১ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে হরকাতুল জিহাদ নামে প্রচারণা শুরু করেন।
মুফতি আব্দুল হাই ‘জাগো মুজাহিদ’ মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকাটি ১৯৯১ সালে চালু হয় এবং তার অফিস খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকায়। পরে ২০০০ সালে সরকার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করে। মুফতি আব্দুল হাই ২০০০ সালে ওই পত্রিকার অফিস থেকে গ্রেফতারও হন এবং ২ মাস কারাভোগ শেষে জামিনে মুক্তি পান।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, বিভিন্ন জ’ঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে হুজি-বির জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ২০০৬ সালের পর মুফতি আব্দুল হাই আত্মগোপনে চলে যান। তার পরিবার তখনও নারায়নগঞ্জেই বসবাস করতেন, কিন্তু তিনি কুমিল্লা জেলার গৌরিপুরে তার শ্বশুরবাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করেন। গৌরিপুর বাজারে তার শশুরের কেরোসিন ও সয়াবিন তেলের ডিলারশিপের ব্যবসা ছিল। তিনি সারা দিন ব্যবসা দেখাশুনা করে ওই দোকানেই রাত কাটাতেন। এভাবেই ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি শ্বশুর বাড়ির এলাকা গৌরিপুরে আত্মগোপনে ছিলেন। গৌরিপুরে থাকা থাকাবস্থায় তিনি মাঝেমধ্যে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াত করতেন।

পরবর্তী সময়ে কৌশলে তিনি তার ও তার পরিবারের সবার ঠিকানা পরিবর্তন করে নারায়ণগঞ্জে ভোটার হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। স্থানীয় এলাকাবাসী যেন তার পরিচয় জানতে না পারে সেজন্য তিনি ঘর থেকে খুব কম বের হতেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে তার বর্তমান ঠিকানার বাসাটি এলাকার লোকজনের কাছে তার বড় ছেলের বাসা হিসেবেই পরিচিতি করান। তার বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে।

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন