ডুমুরিয়া উপজেলা, খুলনা [ Dumuria Upazila, Khulna ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

ডুমুরিয়া উপজেলা, খুলনা [ Dumuria Upazila, Khulna ] র কিছুটা অতীত জানা দরকার।  ১৭৮১ সালে ২৪ পরগণার একটি জেলা ছিল যশোর। ১৮৪২ সালে খুলনা যশোর জেলার একটি মহকুমা হিসেবে ঘোষিত হয়। ১৮৮২ সালে খুলনা মহকুমা জেলার মর্যাদা (একটি গ্রাম্য ছড়া এরকম ‘রেনী সাহেব আর শিবনাথ ঘোষের ঠেলাতে/জিলা হলো খুলনাতে) লাভ করে। ১৯১৮-২০ সালে ডুমুরিয়া থানা ঘোষিত হয়। অবশেষে ১৯৮৩ সালে ডুমুরিয়া থানা ডুমুরিয়া উপজেলা নাম পরিগ্রহ করে।

 

ডুমুরিয়া উপজেলা ফেসবুক প্রোফাইল ফটো

 

ডুমুরিয়া উপজেলার আয়তন ৪৫৪.২৩ বর্গকিলোমিটার। এখানে কোনো বনভূমি নেই। মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৩৪০৫০ একর। মোট জনসংখ্যা ২৭৫৮২০ জন।

অবস্থানগত দিক দিয়ে উপজেলার পূর্বে খানজাহান আলী, খালিশপুর, দৌলতপুর এবং সোনাডাঙ্গা থানা ও বটিয়াঘাটা উপজেলা, পশ্চিমে সাতক্ষীরা জেলার তালা এবং যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলা, উত্তরে ফুলতলা এবং যশোর জেলার মণিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলা এবং দক্ষিণে বটিয়াঘাটা ও পাইকগাছা উপজেলা।

ডুমুরিয়া উপজেলার ইউনিয়ন:

ডুমুরিয়া উপজেলায় ইউনিয়নের সংখ্যা ১৪টি:

১ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

১ নং ধামালিয়া ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ১০টি। গ্রামগুলো হলো- বরুণা, চেঁচুড়ি, ছয়বাড়িয়া, ডাহাকুলা, ধামালিয়া, কাটেঙ্গা, মান্দ্রা, ময়নাপুর, পাকুড়িয়া ও টোলনা।

২ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

২ নং রঘুনাথপুর ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ১১টি। গ্রামগুলো হলো- আন্দুলিয়া, দেডুলি, গজেন্দ্রপুর, কোমরাইল, কৃষ্ণনগর, মাধবকাটি, রঘুনাথপুর, রূপরামপুর, শাহপুর, বিলপাতিয়ালা ও থুকড়া।

৩ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

৩ নং রুদাঘরা ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ৭টি। গ্রামগুলো হলো- চহেড়া, হাসানপুর, খারসাঙ্গা, মধুগ্রাম, মিকশিমিল, রুদাঘরা ও শোলগাতিয়া।

৪ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

৪ নং খর্ণিয়া ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ১৬টি। গ্রামগুলো হলো- অঙ্গারদহ, বাহাদুরপুর, বালিয়াখালি, বামনদিয়া, বাঐখালি, ভদ্রদিয়া, গোনালি, খর্ণিয়া, মেছাঘোনা, কার্তিকডাঙ্গা, পঞ্চপোতা, পাঞ্চুরিয়া, রানাই, সিঙ্গা, টিপনা ও উখড়া।

৫ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

৫ নং আটলিয়া গ্রামের সংখ্যা ২৫টি। গ্রামগুলো হলো- আটলিয়া, বয়ারসিং, পুঁটিমারি, আন্ধারমানিক, খলসিবুনিয়া, ছোট মুড়াবুনিয়া, গোলাপধা, দুর্গাটুনি, বড় চানমারি, খুটাখালি, বড় মুড়াবুনিয়া, ঢাকুন্দিয়া, চুকনগর, দরিয়াডাঙ্গা, কুলবাড়িয়া, বরাতিয়া, মঠবাড়িয়া, গোবিন্দকাটিয়া, নিজখালি, মালতিয়া, মনোহরপুর, নর্নিয়া ও রুস্তমপুর।

৬ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

৬ নং মাগুরঘোনা ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ৭টি গ্রামগুলো হল আরশনগর, বাদুরি (রঙ্গনাথপুর), বেতাগ্রাম, চণ্ডিপুর, ঘোষড়া (হিসামুদ্দিপুর), কাঞ্চনপুর ও মাগুরঘোনা (তুলারামপুর)।

৭ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

৭ নং শোভনা ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ১৭টি। গ্রামগুলো হলো- পশ্চিম বাদুরগাছা, বাগআঁচড়া, বলাবুনিয়া, চক গোপালনগর, জিয়লতলা, চিংড়া, কদমতলা, কাকমারি, মলমালিয়া, মলমডাঙ্গা, মান্দারতলা, বরইকাটি, মন্দিরমাথাম, পার মান্দারতলা, পাতুবুনিয়া, শিবপুর বাদুরগাছা ও শোভনা।

৮ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

৮ নং শরাফপুর ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ২০টি গ্রামগুলো হলো- আকড়া, আসাননগর, বাহির আকড়া, ভুলবাড়িয়া, বাজিয়াপাতি, ব্রিটি ভুলবাড়িয়া, চাঁদগড়, জালিয়াখালি, ঝালতলা, উত্তর কালিকাপুর, দক্ষিণ কালিকাপুর, বসুন্দিয়া ডাঙ্গা, দত্তডাঙ্গা, সেনপাড়া, কেয়াখালি, রতনখালি, উত্তর শরাফপুর, দক্ষিণ শরাফপুর, বানিয়াখালি ও তৈয়বপুর।

৯ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

৯ নং সাহস ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ২২টি। গ্রামগুলো হলো- বাঘদাড়ি, বাঁশতলা, চড়চড়ি, ছোট বান্দা, দীঘলিয়া, গজেন্দ্রপুর, গোলাইমারি, কাগজিপাড়া, কাপালিডাঙ্গা, কাজিরহুলা, খরসপ্তা, খুটাখালি, কুখিয়া, লতাবুনিয়া, নোয়াকাটি, চাড়াবান্দা, দুধিরহুলা, সাহস ঘোষগাতি, কুমারঘাটা, মধ্যপাড়া, রাজাপুর ও সাহস জয়খালি।

১০ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

১০ নং ভাণ্ডারপাড়া ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ২৪টি। গ্রামের নাম বকুলতলা, বান্ধা, বান্ধা-রঘুনাথপুর, ভাণ্ডারপাড়া, ব্রিটি কোণাইডাঙ্গা, চক সোনাডাঙ্গা, দক্ষিণমহল, ধানীবুনিয়া, ঘোনা, ঘোনাতালতলা, হাজিবুনিয়া, জাবড়া, পূর্ব কানাইডাঙ্গা, পূর্ব কাঞ্চননগর, খড়িবুনিয়া, কুশারহুলা, লোহাইডাঙ্গা, মইখালি, ওড়াবুনিয়া, পেড়িখালি, রাজিবপুর, রাজনগর, তেলিখালি ও উলা।

১১ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

১১ নং ডুমুরিয়া ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ৯টি। গ্রামগুলো হলো- আরাজি ডুমুরিয়া, আরাজি সাজিয়াড়া, ডুমুরিয়া, গোলনা, হাজিডাঙ্গা, খাজরা, খলসি, মির্জাপুর ও সাজিয়াড়া।

 

ডুমুরিয়া উপজেলার ১২ নং রংপুর ইউনিয়নের শলুয়া বধ্যভূমি
ডুমুরিয়া উপজেলার শলুয়া বধ্যভূমি

 

১২ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

১২ নং রংপুর ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ৭টি। গ্রামগুলো হলো- বিলশলুয়া, ঘোনা মাদারডাঙ্গা, রামকৃষ্ণপুর, রংপুর, সাড়াভিটা, মুজরগুটা, ও বটবাড়া।

১৩ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

১৩ নং গুটুদিয়া ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ২১টি। গ্রামগুলো হলো- পূর্ব বাদুরগাছা, বড় ডাঙ্গা, পূর্ব বিলপাবলা, পশ্চিম বিলপাবলা, লাইন বিলপাবলা, উত্তর বিলপাবলা, চক আসানখালি, চক মথুরাবাদ, ডায়গাম, গুটুদিয়া, পাটকেলপোতা, জিলেরডাঙ্গা, কমলপুর, খড়িয়া, কুলটি, খামারবাড়ি, লতা, পাহাড়পুর, পঞ্চ, শিবপুর ও টিয়াবুনিয়া।

১৪ নং ধামালিয়া ইউনিয়ন:

১৪ নং মাগুরখালি ইউনিয়নে গ্রামের সংখ্যা ৩২টি। গ্রামগুলো হলো- আলাদিপুর, পূর্ব পাতিবুনিয়া, পশ্চিম পাতিবুনিয়া, আন্দারমানিক, বয়লাহারা, বৈথাহারা, চণ্ডিপুর, চিত্রামারী, দক্ষিণ বাগারদাইড়, হোগলাবুনিয়া, গজালিয়া, গাজিরনগর, চুর্নিয়া, হাবুড়িয়া, কৈপুকুরিয়া, কাঞ্চননগর, কাটালিয়া, খাগড়াবুনিয়া, খয়েরাবাদ, কোটালবুনিয়া, কোরাকাটা, শুকুরমারি, মাগুরখালি, মহাদেবপুর, আমুরবুনিয়া, বোরমারবার, নাঙ্গলমোড়া, শেখেরটাক, পার মাগুরাখালি, শিবনগর, শ্যামনগর ও উত্তর বাগারদাইড়।

 

Dumuria Upazila Map, ডুমুরিয়া উপজেলার ম্যাপ
Dumuria Upazila Map, ডুমুরিয়া উপজেলার ম্যাপ

 

ডুমুরিয়া উপজেলার প্রাচীন ইতিহাসের নমুনা হিসেবে চেঁচুড়ি নীলকুঠি, চুকনগর নীলকুঠি, মধুগ্রাম ডাকবাংলো, আটলিয়া সাজিয়াড়া-ধামালিয়া জমিদার বাড়ি, রুদাঘরা গাতিদার বাড়ি প্রভৃতি স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এছাড়া মাগুরঘোনায় ধ্বংসস্তুপ খনন করে বহু পুরাতন শিলাখও পাওয়া গিয়েছে।

এগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় খণ্ডটির পরিমাপ ৩০′×১০ x৬। এই শিলাগুলোতে কোনো লিপি খোদিত ছিল না। যে শিলাখণ্ডে লিপি ছিল সেটি এখন রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘরে সংরক্ষিত। এছাড়া একটি প্রাচীরও পাওয়া গিয়েছে যার পরিমাপ ১৬১ ফুট x ১২০ ফুট।

এ উপজেলায় ২৩৭ টি মসজিদ রয়েছে। তার মধ্যে আরশনগর মসজিদ, পীরে কামেল শেখ শাহ আফজাল (রহঃ)-এর মাজার ও ফকির বাড়ি মসজিদ, মলমরিয়া মসজিদ, ধামালিয়া জমিদার বাড়ি মসজিদ, আন্দুলিয়া ফকির বাড়ি মসজিদ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

১৩২টি মন্দিরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ডুমুরিয়া কালী মন্দির, দেলভিটা দুর্গা মন্দির, উলা কালী মন্দির, মাগুরখালী দুর্গা মন্দির ও পঞ্চাননতলা মন্দির। গির্জা রয়েছে মাত্র ৪টি |

মঠ ও আশ্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে তালতলা মঠ, কুলটি মঠ, চহেড়া বৈষ্ণব মঠ, সাড়াভিটা বৈষ্ণব মঠ, দেডুলি সৎসঙ আশ্রম, প্রহাদ আশ্রম, সাদাতলা-জিয়ালতলা-জিলেরডাঙ্গা আশ্রম, সাড়াভিটা রাধাকৃষ্ণ সেবাশ্রম, গজেন্দ্রপুর বলাই সাধুর আশ্রম। তীর্থস্থান গুলো হলো- আইতলা, মান্দারতলা, দেলভিটা, ঠারনতলা, মির্জাপুর মহাশ্মশান প্রভৃতি।

 

ডুমুরিয়া উপজেলার সমাজ-সংস্কৃতি :

শংকর জাতি হিসেবে অপরাপর বাঙালি জনগোষ্ঠীর মতো এ উপজেলার মানুষের গড়ন ও গঠন একই রকম। ধর্মীয় সম্প্রদায়গতভাবে এখানে প্রধানত হিন্দু এবং মুসলমান জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান। মুসলমান ৫৬.৯৭% এবং হিন্দু ৪২.৮৩%। এছাড়া খ্রিস্টন ০.১%, বৌদ্ধ ০.০১% এবং অন্যান্য ০.০৯% সম্প্রদায়ের নবাস রয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শোলগাতিয়া এবং কোমরাইলে দুইটি মোহাজের পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। কোনো কোনো গ্রামে একচেটিয়া মুসলমান, কোনো কোনো গ্রামে একচেটিয়া হিন্দু এবং কোনো কোনো গ্রামে পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে বসবাস করছে। মুসলমান সমাজে আশরাফ-আতরাফ বিভাজন রেখাটি প্রকট নয়। তবে হিন্দু সমাজের বর্ণবিভাজন এ উপজেলাতেও লক্ষণীয়।

 

ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বধ্যভূমিতে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ
ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বধ্যভূমিতে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ

 

নৃবিজ্ঞানের পরিভাষায় আদিবাসী বলতে যা বোঝায় সে-রকম কোনো জনগোষ্ঠী এ এলাকায় নেই। তবে কাপালী, পোদ, বাছাড়, বাগদি, ডোম, মোলঙ্গী সম্প্রদায়ের কিছু সংখ্যক মানুষ রয়েছে যারা আদিবাসীদের উত্তরসূরি বলে ইতিহাস-গবেষকদের ধারণা।

সামাজিক বিন্যাসের দিক দিয়ে এখানে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, এবং নিম্নবিত্তের মানুষের বসবাস। আবার কৃষিজীবীদের মধ্যে মধ্যম কৃষক, দরিদ্র কৃষক, ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যাও কম নয়। শ্রমজীবীদের মধ্যে রয়েছে দিনমজুর, মাঝি, ভ্যান-রিক্সা-ঠেলাগাড়ি স্কুটার চালক প্রভৃতি।

ডুমুরিয়া উপজেলার একটি বিশেষ সাঙ্গীতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। সাধারণ পর্বের গান ছাড়াও বিশেষ বিশেষ উৎসব অনুষ্ঠান উপলক্ষে ভিন্ন ভিন্ন গানও রয়েছে। কোনো কোনো গান নিতান্তই আঞ্চলিক ঐতিহ্যের গান। জারি, সারি, কীর্তন, বাউল, পদাবলি, কবিগান, অষ্টকগান, গাজীর গান, ভাটিপূজার গান, পটগান, হালুই গান, শুবরে গান, বিয়ের গান প্রভৃতি ছাড়াও রইস মোল্লার ভাব গান, মীর আলীর জারি গান, বিভাষ বৈরাগীর পালা গান বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।

শাহপুর ‘নাপপ’; রূপরামপুর নাট্যসংঘ, শাহপুর মোহনা নাট্যগোষ্ঠী, ডুমুরিয়া যুবনাট্যদল, শিরিন যাত্রাদল, সবুজ অপেরা, চারণিক অপেরা প্রভৃতি যাত্রা ও নাট্যগোষ্ঠী উপজেলার যাত্রা নাটকের ধারাকে রহমান রেখে উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।

ডুমুরিয়া উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা:

বিগত কয়েক বছরে ডুমুরিয়ার পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ৪৬৭ কিমি কাঁচা সড়ক থাকলেও ৬১ কিমি পাকা সড়ক, ৭৬ কিমি আধাপাকা সড়ক এবং ৩২ নটিক্যাল মাইল নৌপথ। মানুষ ভ্যান, রিক্সা, মোটর সাইকেল, বাস, স্কুটার, সাইকেল, নৌকা, ট্রলার যোগে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করে। অবশ্য মোবাইল ফোন ছাড়াও টেলিফোন, টেলিগ্রাফও এখন দূরদেশে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।

যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বহুল পরিমাণে নির্ভরশীল। হাটবাজারের ক্ষেত্রেও তাই। ডুমুরিয়া উপজেলায় ছোট বড় মিলিয়ে হার্টের সংখ্যা ৬২টি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ডুমুরিয়া, শাহপুর, চুকনগর, খর্ণিয়া, থুকড়া, শলুয়া, শোলগাতিয়া, রঘুনাথপুর আমভিটা, মিকশিমিল, হাসানপুর, বানীয়াখালি, প্রভৃতি।

প্রতি বছরই এই উপজেলায় নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিশেষ উপলক্ষ্যে ছোটখাটো মেলাও বসে। যেমন- বৈশাখী মেলা, চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, বলাই সাধুর আশ্রমের মেলা, ফকিরের থান মেলা প্রভৃতি। সামাজিক অন্যান্য উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্যেই রয়েছে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজা, নবান্ন, বাসন্তীপূজা, কালীপূজা, চড়ক পূজা, রাস পূর্ণিমার স্নান, জেকের আসকার ও মাহফিল, ওরস মোবারক ইত্যাদি।

ডুমুরিয়া উপজেলা স্মৃতিসৌধ
ডুমুরিয়া উপজেলা স্মৃতিসৌধ

 

বিবাহ উৎসবের ক্ষেত্রে হিন্দু সমাজে স্ববর্ণে বিয়ের ব্যাপারে কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও অসবর্ণ বিয়েও ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পাচ্ছে। মুসলমান সমাজে সেই অর্থে বর্ণ বিভাজন না থাকলেও কোথাও কোথাও বংশগত ঐতিহ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। উভয় সম্প্রদায়ের বিয়েতে মেয়েলি গান ছাড়াও মাইক, ব্যান্ডপার্টি, সাধ্যমতো পানাহার, ও রঙ্গরসিকতার প্রচলন দেখা যায়।

অন্যান্য অনুষ্ঠান এবং আঞ্চলিক প্রথার মধ্যে অন্নপ্রাশন, আকিকা ছাড়াও রয়েছে শুভ কাজের শুরুতে পীর-ঠাকুরের দরগাহ-মন্দিরে অনুমতি প্রার্থনাপূর্বক মানত, গাছের প্রথম ফলটি মন্দির দরগায় দান, সন্তানের নাম রাখার জন্য পীর-ঠাকুরের সিদ্ধান্ত, পর্দাপ্রথা, ঘোমটা দেওয়া, শ্রাদ্ধ, মস্তক মুণ্ডন প্রভৃতি।

ডুমুরিয়া উপজেলার অর্থনীতি :

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ডুমুরিয়া পূর্বের তুলনায় অনেক স্বচ্ছলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এক সময় বিল ডাকাতিয়ার অভিশাপে উত্তর ডুমুরিয়ার বহু সংখ্যক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করলেও এখন সেই বিল মৎস্য চাষ এবং কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিশাল ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে পূর্বেকার সেই দারিদ্র্য আর তেমনটা নেই।

এ এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মধ্যে ধান, পাট, তিল, শাক সবজি অন্যতম। কৃষিকাজের পাশাপাশি বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ বেত-বাঁশ-মাদুর কাতা-তাঁত প্রভৃতি কুটির শিল্পেও নিয়োজিত। মাঝারি শিল্পের মধ্যে রয়েছে বরফকল, ধানকল, কাঠকল (স’মিল), ডালকল, তেলকল, হলুদ কল প্রভৃতি। মৎস্য চাষেও ডুমুরিয়া ব্যাপক সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হচ্ছে।

এখানে প্রধানত গলদা চিংড়ির চাষ হলেও রুই কাতলা-মৃগেল প্রভৃতি মৎস্য চাষের পরিমাণও কম নয়। একটি মৎস্য বীজ উৎপাদন কেন্দ্র এবং দুইটি কৃত্রিম মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র মূলত এসব মাছের পোনা যোগান দিয়ে। থাকে। এছাড়া গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া প্রভৃতি গবাদি পশুর ব্যাপক পালন লক্ষণীয়।

 

ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

 

উপজেলাতে একটি কেন্দ্রীয় পশুপালন অফিস এবং একটি শাখা অফিস রয়েছে। গবাদি পশু ছাড়াও ব্যক্তিগত ভাবে এবং ব্যবসায়িক ভিত্তিতে দেশি জাতের হাঁস-মুরগি ছাড়াও বিদেশি জাতের কক, বয়লার প্রভৃতি মুরগির বহুসংখ্যক খামার গড়ে উঠেছে। কিছু সংখ্যক মানুষ ব্যবসা, দিনমজুরি, পরিবহন সেবাকে তাদের অর্থকরী পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কিংবা করতে বাধ্য হয়েছে।

এ উপজেলাতে বেকার সমস্যা তেমন প্রকট না হলেও দিনমজুর, স্বল্প শিক্ষিত যুবক এবং মহিলাদের মধ্যে বেকার সমস্যা বিদ্যমান। ভিক্ষাবৃত্তির পরিমাণ নিতান্তই নগণ্য। তবে এ উপজেলার পাকা, আধাপাকা, টিনের কাঠের ঘরবাড়ি গুলোর অল্প ফাঁক ফোঁকর দিয়ে তাকালে কিছু সংখ্যক কাঁচা বা কুঁড়েঘরের সন্ধান অবশ্য মেলে।

ডুমুরিয়া উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবেশ :

ডুমুরিয়া উপজেলার বেশির ভাগ মানুষই স্বাস্থ্যবান এবং কর্মক্ষম। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্যে ১৯৭৫ সালে ৩৩ শয্যাবিশিষ্ট ডুমুরিয়া থানা পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠে। বান্ধা, রংপুর, রঘুনাথপুর চুকনগর, বরুনা, মিকশিমিল, নোয়াকাটি, কালিকাপুর গ্রামে স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামসমূহে বহু সংখ্যক পল্লি চিকিৎসক রয়েছেন। এদের মধ্যে এ্যালোপ্যাথিক এবং হোমিওপ্যাধিক উভয় শ্রেণির চিকিৎসক আছেন।

উপজেলা সদরে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং একটি কেন্দ্রীয় পরিবার পরিকল্পনা অফিসের অধীনে ১৩টি শাখা অফিস রয়েছে। উপজেলায় ৭টি প্রাইভেট ক্লিনিকও আছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবাদান কল্পে। এসবের পাশাপাশি আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্রমতে লোকজ ও ভেষজ চিকিৎসার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ এবং নির্ভরতা পরিলক্ষিত হয়।

 

ডুমুরিয়া উপজেলার ভদ্রা নদী
ডুমুরিয়া উপজেলার ভদ্রা নদী

 

স্বাস্থ্যের সাথে পরিবেশের একটি বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে। সে কারণে আবহাওয়া এবং পরিবেশগত কারণে উপজেলায় মৌসুমী সর্দি, কাশি, জ্বর, আমাশয়, কলেরা, খোঁস-পাচড়া, বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব প্রতি বছরই কমবেশি ঘটে।

দক্ষিণ ডুমুরিয়াতে লবণাক্ত পানির কারণে পেটের পীড়া বেশি দেখা যায়। পানীয় জলের চাহিদা পূরণের জন্য এখনও কিছু সংখ্যক মানুষকে পুকুরের আশ্রয় নিতে হয়। অবশ্য উপজেলাতে ১০৯৭টি গভীর এবং ২০২৭টি অগভীর নলকূপ ব্যাপক মানুষের পানীয় জলের যোগান দিচ্ছে। নলকূপের পানি পানের ফলে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আর্সেনিক জনিত সমস্যার উদ্ভব ঘটেনি।

ডুমুরিয়া উপজেলার স্মরণীয় ঘটনা :

এ উপজেলাতে বিভিন্ন সময় অনেকগুলো আলোড়ন সৃষ্টিকারী স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে যার কোনো কোনোটি আঞ্চলিকতার সীমানা পেরিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঘটনার অংশ হিসেবে পরিগণিত। এসব ঘটনার কোনোটি ইতিবাচক, কোনোটি আবার নেতিবাচক।

যেসব ঘটনা মানুষের মনে দাগ কেটে আছে কিংবা তার ভয়াবহতা স্মরণ করে আতকে উঠতে হয়; তার মধ্যে রয়েছে ১৭৬৯-৭০ সালের দুর্ভিক্ষ—যেটি ইতিহাসে ছিয়াত্তরের (১১৭৬) মন্বন্তর নামে খ্যাত। একদিকে খরার কারণে শস্যহানি অন্যদিকে লর্ড ক্লাইভের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার ফলে সৃষ্ট অব্যবস্থার কারণে এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়।

 

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিস
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিস

 

ক্ষেতে লোনা পানি প্রবেশের ফলে শস্যহানির কারণে ১৮৯৭, ১৯২১, ১৯৪৩ সালে কৃত্রিম খাদ্য সংকটের ফলে সৃষ্টি হয় দুর্ভিক্ষ যা পঞ্চাশের (১৩৫০) মন্বন্তর নামে পরিচিত। ১৯৬৮, ১৯৭০, ১৯৭৮, ১৯৮১ সালের বন্যায় গাছ-পালা, ফসলের ক্ষয়ক্ষতিসহ গবাদি পশু ও বহু সংখ্যক প্রাণহানি ঘটে।

অন্য ঘটনাবলির মধ্যে রয়েছে ১৭৬৯, ১৭৯১, ১৯৬৫, ১৯৭৯ সালের খরা, ১৯০৯, ১৯১৯, ১৯৬১, ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৭০ সালের ঝড় ও প্লাবন, ১৯৮৫ সালের প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং হিন্দু-মুসলমানের দেশান্তর।

 

আরও পড়ুন:

ডুমুরিয়া উপজেলা উইকি

খুলনা জেলা

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন