জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয় যৌক্তিকতা কী?

This post is also available in: বাংলাদেশ

জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয় আসলে কিভবে ও কেন? – এই প্রশ্ন এখন সবার। সরকারের পক্ষ থেকে যা জানানো হয়েছে তা আপনাদের অবগতির জন্য জানানো হলো।

জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয়:

১) গত ০৩/১১/২০২১ তারিখে বাড়ানো হয়নি:

সর্বশেষ গত ০৩/১১/২০২১ তারিখের গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কেবল ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধি করে পুনঞ্নিধারণ (ডিজেল-৮০.০০ টাকা ও কেরোসিন-৮০.০০ টাকা) করা হয়। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রবনতা সত্বেও অকটেন ও পেন্রোল মূল্য বৃদ্ধি করা হয়নি।

২) মূল্য বৃদ্ধির ক্রমধারাবাহিকতায় বর্তমান অবস্থা:

২০২১-২২ অর্থ বছরের শুরুর দিকে কোভিড-১৯ এর প্রকোপ কিছুটা হ্রাস পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি এবং ফেব্রুয়ারি’২২ মাসের শেষ দিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির
ক্রমধারাবাহিকতায় তা আরো তীব্রতর হয় যা এখনও অব্যাহত আছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্নডিজেল ও অকটেন-এর মূল্য বৃদ্ধির চিত্র নিন্নরপ:

জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয় আসলে কিভবে ও কেন?

** বিপিসি’র ব্রেক ইভেন অর্থ আন্তর্জাতিক বাজারে যদি ডিজেল প্রতি ব্যারেল ৭৪.০৪ মাঃ ডঃ এবং অকটেন প্রতি
ব্যারেল ৮৪.৮৪ মাঃ ডঃ-এ নেমে আসে তবে ডিজেল ও অকটেন প্রতি লিটার যথাক্রমে ৮০.০০ টাকা ও ৮৯.০০
টাকায় অর্থাৎ বিদ্যমান মূল্যে বিক্রয় করা সম্ভব হত যা এখন প্রায় অসম্ভব ।

৩) বৃদ্ধির ক্রমধারাবাহিকতা:

একইভাবে ভ্রুড অয়েল এর মূল্য জুন”২২ মাসে ব্যারেল প্রতি ১১৭ মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যা এখনও
অব্যাহত আছে।

জ্বালানি তেল জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয় যৌক্তিকতা কী?

8) বিপিসি’র দৈনিক লোকসান ও বর্তমান অবস্থা:

জ্বালানি তেল আমদানিতে সর্বশেষ জুলাই’২২ মাসের গড় প্লাটস রেট অনুযায়ী বিপিসি’র দৈনিক লোকসানের
পরিমাণ ডিজেলে- প্রায় ৭৪,৯৪,৯২,৭০০.০০ টাকা ও অকটেনে প্রায় ২,৯২,২৩,২১৬.০০ মোট- প্রায়
৭৭,৮৭,১৫,৯১৬.০০ টাকা। উল্লেখ্য গত মে/২০২২ ও জুন/২০২২ মাসে লোকসান ছিল প্রায় শতাধিক কোটি টাকা ।
এভাবে গত ফেব্রুয়ারি-জুলাই/২০২২ মাস পর্যন্ত বিপিসি’র প্রকৃত লোকসান/ভর্তুকি দাঁড়ায় ৮০১৪ কোটি টাকার
উপরে । উল্লেখ্য সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ে ডিজেলের মূল্য ১১৪.০০ টাকা করা হলেও জুলাই/২০২২ মাসের গড় হিসেবে
প্রতি লিটারে খরচ পড়বে ১২২.১৩ টাকা অর্থাৎ প্রতি লিটারে তারপরেও ৮.১৩ টাকা লোকসান বিপিসিকে বহন করতে
হবে।

৫) প্রতিবেশীদের দামের পার্থক্যে চোরাচালানের আশঙ্কা:

বর্তমানে (১২/০৭/২০২২ তারিখের তথ্য অনুযায়ী) কলকাতায় ডিজেল লিটার প্রতি ৯২.৭৬ রুপি বা সমতুল্য
১১৪.০৯ টাকায় (১রুপিন গড় ১.২৩ টাকা) বিক্রয় হচ্ছে যা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৪.০৯ টাকা বেশী এবং পেন্ট্রোল
লিটার প্রতি ১০৬.০৩ রুপি বা সমতুল্য ১৩০.৪২ টাকায় পেন্রোল বিক্রি হচ্ছে যা বাংলাদেশ থেকে ৪৪.৪২ টাকা বেশী ।
এ পার্থক্যের কারনে বহু কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আমদানিকৃত জ্বালানি পন্য পাচার হওয়ার আশংকা বিদ্যমান।
তাই মূল্য সমন্বয়ে পার্শবর্তী দেশের সাথে বাংলাদেশের জ্বালানি পন্যের মূল্যের পার্থক্যজনিত পাচার রোধ বিবেচনায়
নেয়া হয়েছে।

৬) বিপিসি’র আর্থিক সক্ষমতা:

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিপিসি’র আর্থিক সক্ষমতা ক্রমাহ্‌য়ে হ্রাস পেতে
থাকে। জ্বালানি পন্যের বিদ্যমান হারে তেল বিক্রয় ও অন্যান্য আয় খাতে গড়ে বিপিসি’র মাসিক জমা/আয় প্রায়
৫,৫০০.০০ কোটি টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এলসি পেমেন্টসহ অন্যান্য খাতে বিপিসি’র ব্যয়
বর্তমানে সব্খশেষ জুলাই/২০২২ মাসে গিয়ে দাঁড়ায় ১০,৩১২.৭৬ কোটি টাকা ।

বিপিসি’র জ্বালানি তেলের অর্থায়নের জন্য ২ মাসের আমদানি মূল্যের সমান হিসেবে প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে সংস্থান রাখা আবশ্যক । বর্তমানে চলতি মুলধন হ্রাস পাওয়ায় মার্চ২০২২ থেকে অদ্যাবধি উন্নয়ন প্রকল্প ও বিবিধ খাত হতে প্রায় ১১,০০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে ভর্তুকিসহ জ্বালানি তেলের মূল্য ও অন্যান্য বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।

গত ৩১-০৭-২০২২ তারিখে বিপিসি*র হিসাবে সামগ্রিকভাবে অর্থ জমা/সংস্থান রয়েছে প্রায় ২২০০০ কোটি টাকা যা দিয়ে আগ্/২০২২ মাসের পর আমদানি ব্যয় অর্থায়ন করা সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য বিপিসি”র জন্য জাতীয় বাজেটে কোন অর্থ সংস্থান রাখা হয়নি। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট অবিগ্নিত রাখার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বিপিসির আর্থিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখা জরুরী ।

 

জ্বালানি তেল 3 জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয় যৌক্তিকতা কী?

 

৭) মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের প্রভাব:

২০১৬ সালে সরকার যখন জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস করে পুনঃনির্ধরিণ করে তখন ডলার ও টাকার বিনিময় হার ছিল
৭৯.০০ টাকা । ০৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখ সরকার যখন জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে তখন ডলার ও টাকার বিনিময়
হার ছিল ৮৫.৮৫ টাকা, যা বর্তমানে ৯৩.৫০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অধিকন্তু, বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে
ব্যাংকসমূহ ৪0 রেটে বিপিসি’র এলসি খুলতে অনিহা প্রকাশ করায় বাংলাদেশ ব্যাংক মাকেটি রেটে ডলার সংগ্রহের
নির্দেশনা প্রদান করে । ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারনেও জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপিসি’র
ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

৮) বিপিসি’র উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন:

বর্তমানে বিপিসিতে তার পরিচালন সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিজস্ব তহবিল হতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন
প্রকল্প:

  • সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডবল পাইপলাইন
  • ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন
  • জেট এ-১ পাইপলাইন
  • ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ পাইপলাইন

এর মত বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। তাছাড়া ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্পের সমুদয় অর্থ (প্রায় ১৯,৪০৪.৭২
কোটি টাকা) বিপিসির নিজস্ব তহবিল হতে সংস্থানের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন
রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য পুনঃনির্ধারণ/সমন্বয় করা না হলে বর্ণিত প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নে বিপিসি আর্থিক সক্ষমতা
হারিয়ে ফেলবে ।

 

জ্বালানি তেল 4 জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয় যৌক্তিকতা কী?

 

জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ে পরিবহন সেক্টরে তার প্রভাব

১) দুরপাল্লার বাসের(৫২ সিটের) ক্ষেত্রেঃ

ক) যাত্রী আসন ৫১ টির অকুপেন্সি ৭০% হিসেবে যাত্রী সংখ্যা ৩৫.০৭ জন ধরে

খ) বর্তমান ভাড়া যাত্রীপ্রতি- ১.৮০ টাকা/কি.মি

গ) ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ বাসের খরচ বৃদ্ধি – ১০.৪৬ টাকা (প্রতি লিটারে ৩.২৫
কিঃ মিঃ যায় )

ঘ) সে হিসেবে প্রতি কি.মি এ যাত্রীভাড়া বৃদ্ধি – ০.২৯২ টাকা

উ) ডিজেলের মূল্য ৩৪ টাকা বৃদ্ধিতে যাত্রীপ্রতি প্রতি কি:মি এ বাস ভাড়া হবে ১.৮০+০.২৯২ – ২.০৯২ টাকা।

চ) ডিজেলের মূল্য ৩৪ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি:মি এ বাস ভাড়া বৃদ্ধির হার- ১৬.২২%

২) সিটি এলাকার বাসের ৫২ সিটের) ক্ষেত্রেঃ

ক) যাত্রী আসন ৫১ টির অকুপেন্সি ৯৫% হিসেবে যাত্রী সংখ্যা ৪৮ জন ধরে

খ) বর্তমান ভাড়া যাত্রীপ্রতি ২.১৫ টাকা/কি.মি

গ) ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ বাসের খরচ বৃদ্ধি _ ১৩.৬০ টাকা (প্রতি লিটারে ২.৫০
কিঃ মিঃ যায় )

ঘ) সে হিসেবে প্রতি কি.মি এ যাত্রীভাড়া বৃদ্ধি – ০.২৮৩ টাকা

ও) ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে যাত্রীপ্রতি প্রতি কি.মি এ বাস ভাড়া হবে (২.১৫+০.২৮৩)- ২.৪৩ টাকা ।

চ) ডিজেলের মূল্য ৩৪ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি-মি এ বাস ভাড়া বৃদ্ধির হার ১৩.১৬%

 

জ্বালানি তেল জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয় যৌক্তিকতা কী?

 

৩) যাত্রী লঞ্চ-এর ক্ষেত্রেঃ

ক) যাত্রীবাহী লঞ্চের বর্তমান ভাড়া-২.১৯ টাকা/প্রতি কি. মি (ডিজেলের মূল্য-৮০ টাকা/লিটার হিসেবে)

ক) পরিচালন ব্যয়ের 8৫% হল জ্বালানি ব্যয় (37ড/74 কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত)

খ) ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি.মি এ লঞ্চের জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি-৪২% (৩৪/৮০৯১০০-৪২%)

গ) বর্তমানে যাত্রী ভাড়ার প্রেক্ষিতে পরিচালন ব্যয়ের বিভাজন অনুযায়ী জ্বালানি খরচ বাড়বে – ২.১৯ টাকার 8৫% হিসেবে-০.৯৯ টাকা

ঘ) ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে প্রতি কিঃ মিঃ যাত্রী ভাড়া বৃদ্ধির পরিমান- ০.৪১৫৮ বা ০. ৪২ টাকা (০.৯৯ _
এর ৪২%)

উ) ডিজেলের মূল্য ৩৪.০০ টাকা বৃদ্ধিতে লঞ্চের ভাড়া হবে (২.১৯ + ০.৪২)- ২.৬২ টাকা

চ) ডিজেলের মূল্য ৩৪ টাকা বৃদ্ধিতে প্রতি কি:মি এ লঞ্চে ভাড়া বৃদ্ধির হার. ১৯.১৮%

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

“জ্বালানি তেলের মূল্যে সমন্বয় যৌক্তিকতা কী?”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন