দুই ভাইয়ের দই খাওয়ানো – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

দুই ভাইয়ের দই খাওয়ানো : এক গেরামের এক গরীব বৃদ্ধ কৃষকের স্ত্রী কোনো ছেলেমেয়ে না রাখে মারা যাবায় বৃদ্ধ ফিরে বিয়ে করে। বৃদ্ধ কোনো কাজকৰ্ম্ম কোততি না পারায় তার স্ত্রী পেত্যেকদিন তার সাথে ঝগড়াঝাটি করে। বৃদ্ধের একটি ছেলে অলো একদিন। তহন তার স্ত্রী কলো, এতদিনতো দুইজন ছিলাম এহন অলাম তিনজন, কাজকর্ম না কললেতো আর সংসার চলে না।

দুই ভাইয়ের দই খাওয়ানো - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

তুমি কাজের সন্ধানে বের হও। কিন্তু স্ত্রী যত যাই বলুক না কেন বৃদ্ধ ঘর হতে কোনো মতেই বের হয় না। তার স্ত্রী এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে যা পায় তাই দিয়ে সংসার চলে। আর সারাদিন শেষে বাড়ি ফিরে বৃদ্ধ স্বামীকে শুধু গালিগালাজ করে। দু’বছর পর তাদের আরও একটি ছেলে হয়। তখন স্ত্রী বলে আগে ছিলাম তিনজন এখন হলাম চারজন।

কাজকর্ম না কললেতো আর সংসার চলে না। কিন্তু বৃদ্ধ কিছুই করতে রাজি হয় না। স্ত্রী ঝগড়াঝাটি করেই চলে। স্ত্রীর গালমন্দ শুনে একদা বৃদ্ধ ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে বের হলো কাজের সন্ধানে। ঘুরতে ঘুরতে সে এসে পড়ে মজুর বিক্রির হাটে। সেখানে মজুররা সারি সারিতে দাঁড়ায় মালিকের কাছে বিক্রি হতে। এক এক করে হাটের সব মজুর বিক্রি হয়ে যায় কিন্তু বৃদ্ধকে কেউ কিনতে রাজি হয় না। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়।

এমন সময় এক বিধবা স্ত্রী হাটে আসে মজুর কিনতে। এসে দেখে হাটের সব মজুর বিক্রি শেষ। বৃদ্ধকে দেখে সে বলে, তুমি ধান কাটতে পারবে। বৃদ্ধ বলে আমি সব কাজ করতে পারব। বিধরা তখন বৃদ্ধকে এক সপ্তাহের জন্য কিনে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। বিধবার বাড়িতে এসে পরের দিন বৃদ্ধ গেলো মাঠে কাজ করতে। কিন্তু কাজ করতে করতে সে হাঁপিয়ে উঠল।

[ দুই ভাইয়ের দই খাওয়ানো – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা ]

এইভাবে দুইদিন পার হলো। বৃদ্ধের কাজ দেখে বিধবা মোটেই খুশি নয়। তৃতীয় দিন বৃদ্ধ কাজের সময় পার হয়ে যায় কিন্তু ঘুম থেকে উঠছে না দেখে ডাকাডাকি করতে থাকে। কিন্তু হাজার ডাকাডাকিতেও বৃদ্ধ না উঠায় বিধবা তখন পাশের বাড়ির লোকজনকে ডেকে আনলো। তারা এসে ঘরের দরজা ভেঙে দেখে বৃদ্ধ মরে হয়ে পড়ে আছে। তখন তারা আশপাশের গ্রামে খোঁজ নিয়ে বৃদ্ধের পরিচয় উদ্ধার করে তার বাড়িতে তার মরদেহ পাঠিয়ে দেয়।

 

রুপকথা
রুপকথা

 

বৃদ্ধের স্ত্রী তখন পাড়ার লোকজন ডেকে তার সৎকার করলো। অবশেষে শ্রাদ্ধের দিন বৃদ্ধের স্ত্রী কিছু খিচুড়ি রান্না করে তার দুই ছেলেকে বললো, তোরা বাড়িতে থাক আমি পাড়ার ছেলেমেয়েদের ডেকে আনি। তখন তাদের মা পাড়ার ছেলেমেয়েদের ডাকতে গেল, এমনি সুযোগে দুইভাই হাঁড়ি থেকে প্রায় সব খিঁচুড়ি খেয়ে ফেলল। তারা দুইভাই মা যা রান্না করে সব খেয়ে ফেলে।

মা পাড়া থেকে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ডেকে আনলো খিচুড়ি খাওয়াতে, কিন্তু এসে দেখে তার দুই ছেলে প্রায় সব খিচুড়ি খেয়ে ফেলেছে। তখন মা রেগে গিয়ে দুইভাইকে বেদম প্রহার করল। আর বললো, তোরা মরতে পারিস না, তোরা মরলে আমার হাড় জুড়ায়। এই বলে হাঁড়ির তলায় পড়ে থাকা খিচুড়ি সবার হাতে হাতে অল্প অল্প করে দিল।

এমনি করে দিন যায়। তাদের মা যতদিন রান্না করে রেখে চলে যায় ততদিন তারা সব খেয়ে ফেলে। আর মা বাড়িতে ফিরে দুই ছেলেকে গালিগালাজ করে। আর তাদের মরতে বলে। এইভাবে দিন কাটে। মা প্রতিদিন শুধু তাদের মরতে বলে।

একদা দুই ভাই মনের দুঃখে একদিন ভোর বেলায় বাড়ি থেকে বের হলো মরার উদ্দেশ্যে। দুইভাই হাঁটতে হাঁটতে চলে আসলো দূর গ্রামে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলা। দুইভাই তখন ভয়ে ভয়ে গাছের তলায় শুয়ে পড়লো। রাত গভীর হয়ে এলো। দুইভাই দুটি গাছের তলায় ঘুমিয়ে পড়লো।

পরদিন সকাল বেলায় ঐ পথে ঠাকুর বাড়ির ব্রহ্মচারী চলেছিলো মন্দিরে পুজো দিতে। পথে এসে দেখে একটি বালক গাছের নীচে বসে বসে কাঁদছে। ব্রহ্মচারী জিজ্ঞাসা করলো, তোমার কি হয়েছে বাছা, কাদছো কেন? তখন দুইভাইয়ের বড়ভাই বললো, আমার মা আমাকে মরতে বলেছে, তাই মরতে এসেছি। আমার মরণ দরকার।

 

দুই ভাই দুই ভাইয়ের দই খাওয়ানো - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

ব্রহ্মচারী বললো, তোমার মা তোমাকে মরতে বলেছে কেন? আমরা কোনো কাজ করতে পারি না, শুধু বেশি বেশি খাই বলে আমার গরীব মাতা আমাকে মরতে বলেছে। ব্রহ্মচারী তখন তার হাতে কিছু ফলকারা দিয়ে বললো, এগুলো খেয়ে নাও। আর এই নাও একটি ফুটো পয়সা। এই পয়সা দিয়ে তুমি দোকান থেকে সব কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাও।

বড় বালকটি বললো, এই ফুটো পয়সা দিয়েতো কিছু হবে না। ব্রহ্মচারী বললো, এটা দিলে দোকানদার তোমাকে সবকিছু দেওয়ার পরও অনেক টাকা ফেরত দেবে, তুমি যাও। এই বলে ব্রহ্মচারী সামনের দিকে এগেিয় গেল। একটু এগিয়ে গিয়ে সে দেখে আর একটি গাছের নীচে আর একটি বালক বসে বসে কাঁদছে। সেও বলল, তারা দু’ভাই কাজকর্ম করতে পারে না বলে তাদের মা তাদের মরতে বলেছে। তারা এসেছে মরতে। ব্রহ্মচারী তখন তাকেও একটি ফুটো পয়সা দিয়ে পূর্বের মতোই সবকিছু বলে চলে গেল।

দুইভাই তখন ফুটো পয়সা নিয়ে দোকানে গেল। ব্রহ্মচারীর কথামতো তারা চাল, ডাল, তরিতরকারি সব কেনার পরও আরও অনেক টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরে মাকে বললো, মা আমাদের এক দাদা আমাদের ফুটো পয়সা দিয়েছে, তাই দিয়ে আমরা সব কিনেছি। মাতো বিশ্বাসই করতে চায় না, ভাবে তারা এগুলো চুরি করে নিয়ে এসেছে।

অনেক বোঝানোর পর মা তাদের কথা বিশ্বাস করলো। ব্রহ্মচারীর দেওয়া ফুটো পয়সা ভাঙিয়ে তাদের দিন চলতে থাকে। মাকে আর পরের বাড়িতে কাজ করতে যেতে হয় না। দুইভাই স্কুলে ভর্তি হয়। নিয়মিত স্কুলে যায়। পড়াশোনা করে। একদিন স্কুলের হেডমাস্টারের মা মারা যাওয়ায় শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে সব ছাত্ররা মাস্টারমশায়ের মায়ের শ্রাদ্ধের নেমতন্ত্রে চাল, ডাল, তারকারি দিল।

রুপকথা গুরুকুল দুই ভাইয়ের দই খাওয়ানো - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

সবাই যখন একে একে এক একটি জিনিস দিলো, এরপর আসলো দুই ভাইয়ের পালা। ছোটভাই তখন বললো, মাস্টারমশায় আমি দই দিয়ে দেবো। মাস্টারমশাই বললো, হাজার হাজার লোকের খাবার দই তুমি দিতে পারবে? ছোটভাই বললো, হ্যা মাস্টারমশাই পারব। স্কুল ছুটি শেষে দুই ভাই বাড়ি চলে আসলো। এসে মাকে বললো, মা আমরা মাস্টার মশাইয়ের মায়ের শ্রাদ্ধের নেমতন্ত্রে দই দেবো বলেছি।

এখন কি করা যাবে। অত টাকাতো আমাদের নেই। মা তখন ভাইয়ের ওপর রেগে গিয়ে গালমন্দ করতে থাকে। দুইভাই মনের দুঃখে সারারাত শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। কান্না দেখে পায়। পরদিন নেমতন্ন। সকালবেলায় ডেকে বলে, বনের তোমাদের এক দাদা থাকে। নাম তার কৃষ্ণ। তোমরা দুই গিয়ে কৃষ্ণদাদা, কৃষ্ণদাদা বলে ডাকতে থাকো। তার অনেক টাকা-পয়সা। তোমাদের দইয়ের ব্যবস্থা তোমরা যাও।

এই মিথ্যা বলে তাদের মাঝে পাঠিয়ে দিল ভেবে যে, নেমতন্ত্রের দিন পার তারপর মাস্টারমশায়ের কাছে খুলে বলব। দুইভাই তখন গভীর জঙ্গলে গিয়ে কৃষ্ণদাদা, কৃষ্ণদাদা ডাকতে থাকে। কিন্তু কৃষ্ণদাদাতো না। এদিকে মাস্টারমশায়ের বাড়িতে রান্না-বান্না শেষ, এখন লোকজনকে খেতে বসতে বলতে হবে। তারা দুইভাইতো নিয়ে এলো না। তখন দুইভাইয়ের বাড়িতে লোক পাঠানো হলো।

লোকদেরকে তাদের বললো, তারা সকালে বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। এই খবর পেয়ে মাস্টারমশাই দুঃখে ছাড়াই এদিকে জঙ্গলমাঝে দুইভাইয়ের অনবরত ডাক সত্যি এক কৃষ্ণবর্ণের লোক তাদের দু’ভাইয়ের সামনে হাজির হলো। দুইভাই তখন বললো, তুমি ডাক শুনছো কেন। কৃষ্ণদা বললো, ভাই আমি নদীতে গিয়েছিলাম করতে। তোমাদের কি হয়েছে বলো। দুইভাই সব খুলে বললো।

শ্রী কৃষ্ণ ভগবান দুই ভাইয়ের দই খাওয়ানো - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

শুনে কৃষ্ণদাদা দুটো ছোট ছোট দইয়ের ভাড় এনে দুইভাইয়ের হাতে বললো, যাও তাড়াতাড়ি যাও। এই দই নিয়ে সবাইকে দাও। দুইভাই বললো, এইটুকু দইয়েতো দাদা। দাদা বললো, হবে, তোমরা দুইভাই হাতে পাত্র থেকে পরিবেশন করবে। আর কারও হাতে না। কৃষ্ণদাদা হারিয়ে গেল। দুইভাই দই এসে দেখে লোকজন খেতে বসেছে। মাস্টারমশাই এসে কই। এইটুকু দই দিয়ে কি হবে?

দুইভাই বললো, এতেই মাস্টারমশাই। মাস্টারমশাই তখন রেগে গিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো। সবকিছু খাওয়া দুইভাই দেওয়া শুরু করলো। দুইভাই পাত্র থেকে যখনই একজনের থালায় দেয় তখনই পাত্র দইয়ে পূর্ণ হয়ে মাস্টারমশাই এসে সবাই ভরে দই খাচ্ছে।

এইভাবে দুইভাই হাজার লোককে পরিবেশন মা তহন কাঁদে দুইভাইকে কলো, বাপরে তুরগে মিথ্যে কতা কইলাম, স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণ তুরগে দেছে, তোরা যা তুরগে দাদার কাছে যাইয়ে আমার ক্ষমা দুইভাই তহন আবার কৃষ্ণদাদা কৃষ্ণদাদা বলে ডাকতি থাহে।

আরও পড়ুন:

ছোট রানী ও তার পুত্র বেজী রাজপুত্র – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন