পলাশীর যুদ্ধ [ Battle of Plassey ], ২৩ জুন ১৭৫৭ [ 23 June 1856 ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

পলাশীর যুদ্ধ [ Battle of Plassey, Battle of Palashi ] ২৩ জুন ১৭৫৭ [ 23 June 1856 ] :  ভাগীরথী নদীর তীরে অখ্যাত এক গ্রাম, পলাশী। পলাশ ফুলের নামের সাথে মিলিয়ে গ্রামের নাম পলাশী। প্রতি বসন্তে পলাশ ফুলের লালে লাল হয়ে ওঠে ভাগীরথীর দু’কূল। সেদিনও ভাগীরথীর দু’কূল ছিল লালে লাল। কিন্তু পলাশ ফুলের লালে নয়, ব্রিটিশ সৈনিকদের উলের তৈরি ইউনিফর্মের লালে। কর্নেল রবার্ট ক্লাইভের ২১০০ পদাতিক সেনার পোশাকের রং লাল। কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ হলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদাতিক বাহিনীর কমান্ডার।

পলাশীর যুদ্ধের শেষে মীরজাফর ও লর্ড ক্লাইভের সাক্ষাৎ, ফ্রান্সিস হেম্যান (১৭৬২)
পলাশীর যুদ্ধের শেষে মীরজাফর ও লর্ড ক্লাইভের সাক্ষাৎ, ফ্রান্সিস হেম্যান (১৭৬২)

 

বাংলার স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া আর তীব্র গরমে অতিষ্ঠ ক্লাইভের সিপাহীরা। ভাগীরথী নদীর পাশেই একটি আমের বাগান। স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ার তীব্র গরম থেকে বাঁচতে সিপাহীরা তাঁদের বেয়নেটওয়ালা গাদাবন্দুক হাতে ঢুকে পড়ল ওই আমের বাগানে। সবাই বাগানটাকে ‘লক্ষবাগ’ বলে জানে। উদ্দেশ্য তীব্র গরমের অত্যাচার থেকে একটু নিষ্কৃতি। ব্রিটেনের শীতের জন্য সিপাহীদের উলের ইউনিফর্ম যতটা আরামদায়ক, বাংলার ভ্যাপসা গরমে সেই ইউনিফর্ম ততটাই অসহ্য।

পলাশী ২৩ জুন ১৭৫৭ [ Palashi 23, June 1856 ]

 

তবে আমের বাগান শুধু তীব্র গরম থেকে রক্ষা করছে না, শত্রুর আক্রমণেও প্রাকৃতিক বর্মের মতো কাজ করছে। দুধের মতো সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশপানে ধেয়ে উঠছিল, দেখেই বোঝা যায় সিরাজ-উদ-দৌলার গোলন্দাজ বাহিনী গোলা বর্ষণ শুরু করেছে। কখনো কখনো কামানের গোলা আঘাত করছে গাছের গায়ে, ভাঙা কাঠের টুকরা আর সহস্র ঝরা পাতা ছিটকে পড়ছে দিগবিদিক। কিন্তু বড় বড় আম গাছের প্রাকৃতিক বর্মের কল্যাণে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে ক্লাইভের সিপাহীরা।

নবাবের সেনাবাহিনীতে সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজার। ৩৫ হাজার পদাতিক, আর ১৫ হাজার অশ্বারোহী। বিরাট এই বাহিনী ক্লাইভের পদাতিক সেনাদের বিহ্বল আর অসহায় সেনাদলে পরিণত করতে যথেষ্ট। ঠিক যেমনটা করেছিল এক বছর আগে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে।

পলাশীর যুদ্ধের মানচিত্র
পলাশীর যুদ্ধের মানচিত্র

 

ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের অভিযানের ফলাফল ছিল কলকাতার কুখ্যাত অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ড। সেই অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ডে নবাবের সেনারা ১৪৬ জন ইংরেজ বন্দিকে মাত্র ২০ বর্গমিটারের একটা অন্ধকূপে বন্দি করে রাখে, পরদিন সকাল নাগাদ বন্দিদের মধ্যে মাত্র ২৩ জন জীবিত ছিল।

ক্লাইভের ওই সেনাদলকে পাঠানো হয়েছিল বাংলায় অবস্থিত ব্রিটিশ কারখানাগুলোকে উদ্ধার করার জন্য। জানুয়ারিতে ক্লাইভ কলকাতা দখলে নিয়েছিলেন, মার্চ মাস নাগাদ ফরাসিদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন বিখ্যাত চন্দননগর। এবার তিনি অগ্রসর হয়েছেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

নবারের বিরাট বাহিনী মুর্শিদাবাদ থেকে রওনা হয়েছে ব্রিটিশদের একটা উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য। বেঙ্গল, মাদ্রাজ আর বোম্বে থেকে আনা ২০০০’র বেশি স্থানীয় পদাতিক সেনার পাশাপাশি ৬০০ ইউরোপীয় সৈন্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল কমান্ডার ক্লাইভের বাহিনী। বহু প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়েই বাহিনী শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল পলাশীতে।

ওই এলাকায় নবাবের অসাধারণ হান্টিং লজ ছিল, নাম পলাশী হাউজ। এই পলাশী হাউজকেই নিজের হেডকোয়ার্টার বানিয়ে নিলেন কমান্ডার ক্লাইভ। সূর্যোদয়ের সময় পলাশী হাউজের ছাদে উঠে কর্নেল ক্লাইভ দেখলেন নবাবের সেনাবাহিনীর তিনটি দল তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে তাঁকে।

অতঃপর সকাল আটটা নাগাদ নবাবের ফরাসি গোলন্দাজ বাহিনী ক্লাইভের অবস্থানের দিকে গোলা বর্ষণ করতে শুরু করলে শুরু হলো বিখ্যাত পলাশীর যুদ্ধ। ক্লাইভ তাঁর সৈন্যদের আমবাগানের সামনের নালার কাদার ঢিবির পেছনে অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দিলেন।

মীরমদন আমৃত্যু লড়ে গেছেন
মীরমদন আমৃত্যু লড়ে গেছেন

 

যুদ্ধে যে কোনো এক বাহিনীর পরাজয় হবেই। পলাশীর যুদ্ধের জয় পরাজয় যেন নির্ধারিত ছিল। ভাগীরথীর বালুময় তীর যেমন গোপন কোনো এক দুরভিসন্ধিতে সর্বদা আকার বদলায় আর নদীর গতিপথ পাল্টে দেয়, ঠিক তেমনই ভাগীরথীর তীরে সেই পলাশীর যুদ্ধ যেন কোনো এক অজানা দুরভিসন্ধিতে দিক বদলে ছিল। নবাবের সেনাবাহিনীর তৃতীয় ডিভিশনের নেতৃত্বে ছিলেন মীরজাফর। তিনি যুদ্ধে অংশ না নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে চেয়ে চেয়ে দেখলেন।

নবাবের বাহিনী টানা চার ঘণ্টা গোলাবর্ষণ করল। কপালে দুশ্চিন্তার রেখা নিয়ে পলাশী হাউজের ভেতর আলোচনায় বসলেন কর্নেল ক্লাইভ। এদিকে শুরু হলো প্রবল ঝড় বৃষ্টি, ভিজিয়ে দিল পলাশীর প্রান্তর, সাথে ভিজিয়ে দিল নবাবের কামানের গোলাবারুদ। অন্যদিকে প্রস্তুতি ব্রিটিশ বাহিনী ভালোই নিয়েছিল, ত্রিপল সাথে নিয়েই যুদ্ধে এসেছিল। বৃষ্টি শুরু হতেই ব্রিটিশরা ত্রিপল দিয়ে ঢেকে ফেলল নিজেদের গোলাবারুদ।

গোলাবারুদ ভিজে গিয়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ায় নবাব তাঁর বাহিনীকে পিছু হটার নির্দেশ দিলেন। তখন সময় বিকেল তিনটা। এই সুযোগে চতুর ক্লাইভ তাঁর বাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। ব্রিটিশ বাহিনীর মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণে বেশ চড়া মূল্য দিতে হলো নবাবের বাহিনীকে। নবাবের সবচেয়ে বিশ্বাসী সেনাপতি ও গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান বকশি মীর মদন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হলেন। নিহত হলেন বন্দুকবাহিনীর প্রধান বাহাদুর আলি খান, আর্টিলারির ক্যাপ্টেন নুয়ে সিং হাজারী।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ ব্রিটিশ বাহিনী তাদের গাদা বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশৃঙ্খল নবাব-বাহিনীর উপর। যুদ্ধ শেষ হলো। ফলাফল যেটা হলো, সেটা ২৪ বছর বয়সী নবাবের ভয়ানকতম দুঃস্বপ্নটাই সত্যি হলো এবং তিনি উটের পিঠে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেন। তাঁর বাহিনীও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে কিছুদিন পর ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হন সিরাজ-উদ দৌলা। নবাবকে হত্যা করে তাঁর জায়গায় বাংলার পুতুল নবাব করা হয় ষড়যন্ত্রকারী সেনাপতি মীরজাফরকে।

হয়তো বিজয়ী ক্লাইভ বা বিজিত সিরাজ-উদ-দৌলা কেউই সেদিন সেই যুদ্ধের ব্যাপকতা এবং সুদূরপ্রসারী ফলাফল অনুধাবন করতে পারেননি। ভারতের ইতিহাসে পানিপথ আর পলাশী যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল পানিপথ নামক ধূলিধূসর গ্রামে মুঘল সম্রাট বাবর যেমন ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে ভারতের ইতিহাসে এক বিরাট পরিবর্তন এনেছিলেন, ঠিক তেমনি পলাশী নামক এক ধূলিধূসর গ্রামে কর্নেল ক্লাইভের কাছে সিরাজ-উদ- দৌলার পরাজয় সমগ্র ভারতের ইতিহাসকে ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছিল।

২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আমবাগানে ব্রিটিশ সৈন্য, নিচে বাঙালি সৈন্যদের গুলি করছে
২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আমবাগানে ব্রিটিশ সৈন্য, নিচে বাঙালি সৈন্যদের গুলি করছে

 

১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মীরজাফরের উত্তরসূরি মীর কাসেমের পরাজয় ঘটে। সেই পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় নবাবী যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে। আর তারপরের ঘটনা আরও অভূতপূর্ব। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাধারণ একটা ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে এই সমগ্র প্রদেশের অধিকর্তা এবং প্রশাসক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, এটা কেউ কখনও হয়তো চিন্তাও করেনি। কোম্পানির অধীনে থাকা এই বিরাট প্রদেশের উত্তরে হিমালয়, পশ্চিমে বিহার আর পূর্বে পূর্বাঞ্চল পর্বতমালা।

ইন্ডিয়ান এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের ঘর্ষণে কোনো এক সুদূর অতীতে জন্ম হয়েছিল হিমালয় পর্বত শ্রেণির। সেই বিরাট পর্বতশ্রেণি থেকে উৎপন্ন হয়ে সহস্র বছর ধরে বয়ে চলেছে গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্র। বয়ে নিয়ে এসেছে বিপুল পরিমাণ পলি, জন্ম দিয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী-অববাহিকা।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই এই অববাহিকা ভীষণ রকম উর্বর এবং সারা বছর চাষাবাদের উপযোগী 1 (এই অববাহিকা প্রশস্তে সর্বোচ্চ ৩৫৪ কিলোমিটার, হিমালয়ে উৎপন্ন নদীগুলো সারাবছর বুকে করে পলি বহন করে এই অঞ্চলের উপর দিয়েই বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়।) ইতিহাসবিদ ভিন্সেন্ট স্মিথ তাঁর ‘দ্য অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন, “গঙ্গার নিম্ন অববাহিকা যেই শক্তির অধীনে থাকবে, সেই শক্তিই সমগ্র উত্তর ভারত শাসন করবে।”

ক্লাইভের হাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী প্রদেশ বা সুবা। মুঘল সাম্রাজ্যের মোট রাজস্বের অর্ধেকই আসত বাংলা থেকে। ১৫৭৬ সালে এই অঞ্চল দখল করার মাধ্যমেই সম্রাট বাবর ভারত উপমহাদেশে মুঘল শাসনকে সুসংহত করেছিলেন।

সেই যুদ্ধের দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলা আবার সারা ভারতবর্ষের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আসে। পলাশীর যুদ্ধের ১০০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলার সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশরা শিখ ও মারাঠা সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। মোটকথা, পলাশীর যুদ্ধ মূলত সমগ্র ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শত বছরের শাসনের সূচনা করেছিল।

পলাশীর যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলাকে ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছিল
পলাশীর যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলাকে ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছিল

 

ব্রিটিশদের বাণিজ্য কুঠি ফোর্ট উইলিয়ামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কলকাতা শহর পরবর্তী ১৩২ বছর ছিল কোম্পানি শাসিত ভারতের প্রশাসনিক রাজধানী। কলকাতা, বোম্বে আর মাদ্রাজ ছিল ব্রিটিশ শাসনের সামরিক শক্তির তিন কেন্দ্র। ধীরে ধীরে কোম্পানি সম্পূর্ণ গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল, পঞ্চনদের দেশ ও ডেকান অঞ্চলকে নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেয়।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের আগপর্যন্ত অব্যাহত ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জয়যাত্রা। কোম্পানির পর আরও ৯৯ বছর ভারতবর্ষে চলেছে ব্রিটিশরাজের শাসন, আর বাংলা ছিল ব্রিটিশ রাজ-মুকুটের সবচেয়ে মূল্যবান আর উজ্জ্বল রত্ন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ যখন বাঙালি মধ্যবিত্তের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে লাগলো তখন বাংলা প্রদেশ হয়ে উঠল ব্রিটিশদের রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার গবেষণাগার। ব্রিটিশদের বিখ্যাত “ভাগ করো এবং শাসন করো” নীতিতে ১৯০৫ সালে বাংলাকে দু’ভাগে ভাগ করা হলো। পূর্ববাংলা পেল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা, আর পশ্চিমবঙ্গ গেল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের কাছে। এই বঙ্গভঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতেই নোবেলজয়ী সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুঃখ ভরে লিখেছিলেন, “আমার সোনার বাংলা…”

১৯১১ সালে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় এবং রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নেয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই বাংলাকে একত্রিত হতে দেখেছিলেন, কিন্তু ১৯৪৩ সালে ৩০ লক্ষ বাঙালিকে অনাহারে মরতে দেখেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা যখন যুদ্ধের রসদ হিসেবে বিপুল পরিমাণ ধান আর গম মজুদ করতে লাগল, তখন এর ফলে ভারতবর্ষে খাদ্যের ঘাটতি দেখা দিতে লাগলো।

এমনকি যখন সমগ্র ভারতবর্ষে খাদ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, ব্রিটিশ প্রশাসন তখনও বাংলা থেকে ধান রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছিল। সমগ্র ভারত পতিত হয়েছিল। স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে। একমুঠো খাবারের খোঁজে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন ভীড় করেছিল শহরগুলোতে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল অবশ্য এই দুর্ভিক্ষের জন্য ভারতীয়দেরকেই দায়ী করেছিলেন, ওয়ার কেবিনেটের (War Cabinet) এক ব্রিফিং-এ তিনি বলেছিলেন, “ভারতীয়রা খরগোশের মত বংশবৃদ্ধি করে, এইজন্যই ওদের দেশে দুর্ভিক্ষ হয়।” আরেকবার তিনি ব্রিটিশ রাজদরবারের তৎকালীন ভারতবিষয়ক মন্ত্রী লেওপল্ড আমেরিকে বলেছিলেন, “ভারতীয় লোকগুলো দেখতেও পশুর মতো, এদের ধর্মও পশুর মতো।”

মীরমদন, নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খানের স্মারকস্তম্ভ,পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র
মীরমদন, নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খানের স্মারকস্তম্ভ,পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র

 

অনেক ভারতীয়ের মতে, ওই দুর্ভিক্ষ ছিল বহুদিনের শোষণ আর অপশাসনের চরম পরিণতি, সর্বনাশের বীজ বপন করা হয়েছিল বহু আগেই সেই পলাশীর যুদ্ধে। ষাটের দশকে নিজের ডায়েরিতে শেখ মুজিবুর রহমান, পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, লিখেছিলেন:

মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ১৮শ শতাব্দীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলাদেশ দখল করে, তখন বাংলায় এত সম্পদ ছিল যে, মুর্শিদাবাদের কজন ব্যাবসায়ি গোটা বিলেত শহর কিনতে পারত। সেই বাংলা এই দুরবস্থা দেখেছিল যে, মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মার চাটছে।

কুকুর মানুষ এক সাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবার জন্য কাড়াকাড়ি করছে। ছেলেমেয়েদের রাস্তায় ফেলে দিয়ে কোথায় পালিয়ে গেছে। নিজের ছেলেমেয়েদের বিক্রি করতে চেষ্টা করছে ক্ষুধার জ্বালায়। কেউ কিনতেও রাজি হয় নাই।

দুর্ভিক্ষের পর এলো রক্তের বন্যা। ১৯৪৬ সালে বাংলা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মুসলিম লীগের এই নেতা ‘ডাইরেক্ট একশন ডে’র ডাক দেন। এই ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র ফলে বর্বরোচিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা সেটাই ১৯৪৭ সালে ভারতকে বিভাজনের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

ভারতীয় মুসলিমদের নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান নামক নতুন দেশ, সেখানে মুসলিম বাঙালিরা ঠাঁই পায় পূর্ব পাকিস্তানে। ভারত বিভাগের সিকি শতাব্দী পরে, ভাগীরথীর তীরের সেই নিরিবিলি পলাশী নামক আবার বাংলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের সাক্ষী হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

আরও পড়ুন:

রাজনৈতিক শব্দকোষ [ Glossary of Politics ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন