পাইকগাছা উপজেলা, খুলনা

This post is also available in: বাংলাদেশ

পাইকগাছা উপজেলার আয়তন ৪১১.১৯ বর্গ কিমি। উত্তরে তালা ও ডুমুরিয়া উপজেলা, দক্ষিণে কয়রা উপজেলা, পূর্বে বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলা, পশ্চিমে তালা ও আশাশুনি উপজেলা। প্রধান নদী কপোতাক্ষ, শিবসা ও ভদ্রা। উপজেলা শহর ৯ টি ওয়ার্ড ও ৫টি মহল্লা নিয়ে গঠিত। আয়তন ২.১২ বর্গ কিমি। জনসংখ্যা ১৩৬৫৬; পুরুষ ৫২.৫৪। যোগাযোগ : পাকা রাস্তা ১৯ কিমি, আধাপাকা রাস্তা ২৬ কিমি, কাঁচা রাস্তা ২৫৭ কিমি। বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় সনাতন বাহন পাল্কি, নৌকা, গরু ও ঘোড়ার গাড়ি।

পাইকগাছা উপজেলার নামকরণ:

খুলনা জেলা সদর থেকে পাইকগাছা উপজেলার দুরত্ব ৬৫ কিঃ মিঃ। খুলনা জেলা সদর থেকে দক্ষিনে। সরলের দীঘি, সরল খাঁর বাড়ী ও কাছারীর পাশে চাল ধোয়ার পুকুর ও রাসত্মার অপর পাশে থানার পুকুর কালের সাক্ষী হিসেবে আজও বিদ্যমান ।

Paikgachha Upazila Map, পাইকগাছা উপজেলা ম্যাপ
Paikgachha Upazila Map, পাইকগাছা উপজেলা ম্যাপ

 

কয়েকটি গ্রাম সরল খাঁর সৈন্য বা কর্মচারীদের কাজের স্বাক্ষী। সরল খাঁ যে এলাকায় বাস করতেন তার নাম হয় সরল।

গরম্নর রাখালদের আবাসস্থল‘গোপালপুর’ গরম্নরাখার জন্য যেখানে গোশালা ছিল সে গ্রামের নাম ‘ঘোষাল,’ গদাইপুরের নিকটে যেখানে সৈন্যরা গড়কেটে ডাকাতদের বিরম্নদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে ছিল সেটা ‘গড়পার’,প্রাসাদের বান্দিদের আবাসস্থল ‘বান্দিকাটি’,প্রাসাদে বাতি জ্বালানো কার্যে নিয়োজিত কর্মচারীরা যে এলাকায় থাকত‘বাতিখালী’,গাছে চড়ে পাইক-বরকন্দাজরা পাহারা দিত বলে ‘পাইকগাছা’এবং লোক- লস্কর দিয়ে যে দীঘি খনন করা হয়েছিল সে এলাকা ‘লস্কর’ গ্রাম হিসেবে আজও সরল খার কীর্তি বহন করছে।

এভাবেই পাইকগাছা উপজেলার নাম করণ করা হয়।৭ নভেম্বর ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরনের আওতায় পাইকগাছা উপজেলায় উন্নিত হয়।

 

পাইকগাছা উপজেলার শিল্প ও কলকারখানা :

খাদ্য ও খাদ্যজাত ৪৭, বস্ত্র ৪, পাট ও পাটজাত শিল্প ৩, পেপার বোর্ড প্রিন্টিং ৩, ট্যানারি ও রাবার ৪, কেমিক্যাল শিল্প ৭, গ্লাস ও সিরামিক ৮, ইঞ্জিনিয়ারিং ৫৫, ওয়েল্ডিং ২৫।

 

উপজেলা প্রশাসন :

পাইকগাছা থানা সৃষ্টি ১৮৭২ সালে এবং থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৩ সালে। ইউনিয়ন ১০, মৌজা ১৭১, গ্রাম ২১২ প্রাচীন নিদর্শনাদি ও প্রত্নসম্পদ : প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ ও ঢিবি (আগ্রা ও কপিলমুনি)।

 

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান :

মসজিদ ১৫৬, মন্দির ৫৪, গির্জা ৩, তীর্থস্থান ১

 

জনসংখ্যা :

২২৫০৮৫; পুরুষ ৫১.১৪% মহিলা ৪৮.৮৬%। মুসলমান ৬৩.৫১%, হিন্দু ৩৫.০১%, খ্রিস্টান ০.৪০%, বৌদ্ধ ১.০৪%, অন্যান্য ০.০৪%। শিক্ষার হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় হার ৩২.৬%; পুরুষ ৪৩%, মহিলা ২১.৬%। কলেজ ৬, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩৫, নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৩, মাদ্রাসা ৫৮, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭৪, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮৪, কিন্ডারগার্টেন ৩, স্যাটেলাইট স্কুল ১১, মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ৬।

 

পত্র-পত্রিকা :

সাপ্তাহিক সত্যের ঝাণ্ডা।

 

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান :

ক্লাব ৪২, সিনেমা হল ২, পাবলিক লাইব্রেরি ১, শিশুপার্ক ১, সমবায় সমিতি ২২, মিলনায়তন ১।

 

জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশাসমূহ:

কৃষি ৩৫.৪৮%, বন ১.৪৯%, কৃষি শ্রমিক ১৯.৩৩%, অকৃষি শ্রমিক ৭.৪০%, চাকরি ৩.৪১, ব্যবসা ১৫.৫৮%, মৎস্য ও পশুপালন ৪.০৩%, পরিবহন ও যোগাযোগ ১.৯৭%, শিল্প ১.৩%, অন্যান্য ১০.০১%।

 

ভূমি ব্যবহার :

চাষযোগ্য জমি ৩০৫২৩.৬৭ হেক্টর, পতিত জমি ৪৮৫.২২ ফসলি ৭৫.৭২, দো ফসলি ১৮.৮২%, তিন ফসলি ৬.৪৬%।

 

ভূমি নিয়ন্ত্রণ :

ভূমিহীন ৩৪.৭৮%, প্রান্তিক চাষি ২০.৭১%, মধ্যম চাষি ২৩.৫১%, বড় চাষি ২১%।

 

জমির মূল্য :

প্রথম শ্রেণীর আবাদি জমির মূল্য ০.০১ হেক্টর প্রতি ৯০০০ টাকা।

 

প্রধান কৃষি ফসলাদি:

ধান, পাট, গম, ডাল, তিল, পান, হলুদ, আলু, বেগুন। বিলুপ্ত বা বিলুপ্ত প্রায় ফসলাদি নীল, আদা, কাউন, মাষকলাই, আখ, সরিষা। প্রধান ফল-ফলাদি আম, জাম, কাঁঠাল, সফেদা, লেবু, নারিকেল, তাল, সুপারি, কলা, পেঁপে, লিচু।

 

মৎস্য, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগির খামার :

মৎস্য ৯৭২, হাঁস-মুরগি ৪৪, গবাদি পশু ৫০, কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র ১, নার্সারি ৪।

 

পাইকগাছা উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা :

পাকারাস্তা ৩০ কিমি, আধাপাকা রাস্তা ১০০ কিমি, কাঁচা রাস্তা ৪৬৫ কিমি; নৌপথ ১৫ নটিক্যাল মাইল। এখন অধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে।  বিলুপ্তপ্রায় সনাতন বাহন পাল্কি, গরু ও ঘোড়ার গাড়ি, ঠাবুরিয়া নৌকা।

 

শিল্প ও কলকারখানা:

বস্ত্রশিল্প ২, পাট পাটজাত শিল্প বনজ ৬, ট্যানারি ১, ৪, তেলমিল ৭৬, ধানকল ৩৭, উলন শিল্প জাল তৈরি ২৯, বেকারি ২। কুটিরশিল্প মাদুর ও নলখাগড়া শিল্প ৬২২, তাঁত ২৮, সেলাই কাজ ১৬৩, কাঠের কাজ ১০২, মৎস্য শুটকিকরণ ৮৬, স্বর্ণকার ৩০, কামার ১৯, ধাতব শিল্প ২০, বিড়ি শিল্প ৬, গুড় তৈরি ২, পোড়ামাটির শিল্প ১০।

 

হাটবাজার-মেলা :

হাটবাজার ১৯। উল্লেখযোগ্য হাটবাজার পাইকগাছা বাজার, কপিলমুনির হাট, আগড়ঘাটার হাট। মেলা (বারুণী মেলা)। প্রধান রপ্তানি দ্রব্য: পাট, নারিকেল, মৎস্য (চিংড়িসহ সব ধরনের মাছ)।

 

এনজিও কার্যক্রম :

সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা (সাচ), উত্তরণ, সিএসএস, ব্র্যাক, আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, মুকলিত খুলনা।

 

স্বাস্থ্যকেন্দ্র :

উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ১, পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র ১০, ও শিশু সনদ কেন্দ্র ১, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ৭।

 

পাইকগাছা উপজেলা ঐতিহাসিক ঘটনাবলী:

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনা। ৪ জুলাই পাইকগাছা উপজেলার প্রসিদ্ধ আর্থিক কেন্দ্র কপিলমুনি বাজারে, রায়বাহাদুর বিনোদ বিহারী সাধুর বাড়ীতে, রাজাকারের ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। রাজাকার এবং শান্তি কমিটির লোকেরা অত্র এলাকায় ব্যাপক লুটপাট, ধর্ষন, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করতে থাকে।

 

Paikgachha Upazila Health Complex, পাইকগাছা স্বাস্থ্য কপ্লেক্স
Paikgachha Upazila Health Complex, পাইকগাছা স্বাস্থ্য কপ্লেক্স

 

রাজাকারেরা এলাকার সুন্দরী যুবতী মেয়ে ও স্ত্রীদের ধরে নিয়ে ক্যাম্পে রেখে দিতো। মেয়েদের দিনের পর দিন ধর্ষণ করে হত্যা করতো। তারা রত্না নামের একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করার পর তার পেট ফেড়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এ জাতীয় নৃশংস হত্যা কান্ড দেখে এলাকার জনগণ এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা ফুসে উঠে।

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ঐ রাজাকার ক্যাম্পটি দখলের জন্য যুদ্ধকালীন কমান্ডার রহমত উলস্নাহ দাদু ও তার সহযোগী ইউনুস আলী, স,ম, বাবর আলী, আবুলকালাম আজাদ, শাহাদৎ হোসেন বাচ্চু ও যুদ্ধাহত খোকা এর নেতৃত্বে ঐ রাজাকার ক্যাম্প টি দখলের সাড়াসী অভিযান শুরম্নকরেন।

তিন দিন একটানা যুদ্ধের পর ১৫৬ জন রাজাকার ও শামিত্ম কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধাদের হতে বন্দি হন। অত্যাচারী রাজাকার ও শামিত্ম কমিটির ১৫৬ জন সদস্যকে হত্যার মাধ্যমে ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি যুদ্ধের অবসান হয়। ঐতিহাসিক কপিলমুনির ঐ স্থানটি দেখার জন্য আজও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন সেখানে ভিড় জমায়।

পাইকগাছা উপজেলার বিখ্যাত ব্যক্তি:

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পি,সি,রায়) :

বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পি,সি,রায়) ১৮৬১ সালের ২ আগষ্ট খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী রাড়ুলীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৬৬ থেকে ১৮৭০ সাল এ চার বছর কাটে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ১৮৭১ সালে ভর্তি হন কলিকাতার হেয়ার স্কুলে। সেখানে পাঠ শেষে ১৭৭৪ সালে তিনি ভর্তি হন আলবার্ট স্কুলে।

স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়
স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

 

সেখান থেকে তিনি ১৮৭৮ সালে এন্ট্রান্স এবং ১৮৮১ সালে এফ,এ পাশ করেন। ১৮৮২ সালে পেসিডেন্সী কলেজ থেকে অনার্স সহ স্নাতক শ্রেনীতে অসাধারণ মেধার দিয়ে গিলক্রিইষ্ট বৃত্তি নিয়ে চলে যান গ্রেটবৃটেনের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তিনি বি,এস,সি ডিগ্রী নেন। রসায়ন শাস্ত্রে গবেষণারত প্রফুল্ল চন্দ্র মারকুইরাস নাইট্রাইট-এর মত মৌলিক পদার্থ উদ্ভাবন করে চমক দেন বিশ্বকে।

স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ১৮৬৬ সালে সম্মানসূচক পিএইচডি,১৮৮৯ সালে ডিএসসি, ১৯১১ সালে সিআই, ১৯১২ সালে ডিএসসি এবং ১৯৯৮ সালে নাইট উপাধি পান। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন অবিবাহিত। দেশ-বিদেশ তার প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আজও মানব সেবা দিচ্ছে। ফাদার নাইট্রাইট খ্যাত বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী স্যার পি,সি রায় এর রাড়ুলীস্থ বসত ভিটায় গত কয়েক বছর যাবৎ সরকারি উদ্যোগে পালিত হয়ে আসছে তার জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী।

বর্তমানে পি,সি রায়ের জন্ম ভিটা সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংরক্ষণ করছে। দেশ-বিদেশের বিরল সাধনার ক্ষেত্রে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু এর পাশাপাশি সি,সি রায় বাঙালীকে করেছেন মহিমান্বিত। ,সি রায় ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী,দার্শনিক ও শিল্পী। ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন জীবনাবসান ঘটে মহান মণীষী ও বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের।

 

রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু:

রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু ১২৯৬ বঙ্গাব্দের ২৬ বৈশাখ শুক্লাষ্ঠমী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিনোদ ভবনে বড় হয়ে ওঠেন পিতা যাদব চন্দ্র সাধু, মাতা-সহচরী দেবীর কোলে। কপিলমুনি মহাভারতের মুনি কপিলের নামে নামকরণকৃত একটি ছোট জনপদ। তিনি ছোট বেলায় পিতাকে হারিয়ে পড়ালেখা ছেড়েছিলেন মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে।

রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু
রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু

 

পিতৃদত্ত ব্যবসায়ী জ্ঞান ও স্যার পি,সি রায় এর পরামর্শে তিনি ব্যবসা আরম্ভ করেন। তিনি কলকাতায় খাটি সরিষার তেল এর মিল স্থাপন করেন। সেখান থেকে তিনি প্রতিষ্ঠিত হন এবং বর্তমানে কপিলমুনিতে অবস্থিত এই বাড়িতে তিনি জীবন অতিবাহিত করেন। বাংলা ১৩৪২ সালের ৩ মাঘ প্রথিতযশা ও ব্যবসায় জগতের এ দিকপাল পরলোকগমন করেন।

 

আরও পড়ুন:

ফুলতলা উপজেলা, খুলনা

This post is also available in: বাংলাদেশ

“পাইকগাছা উপজেলা, খুলনা”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন