বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কিছু প্রস্তাব – ড : এম এ ওয়াজেদ মিয়া

This post is also available in: বাংলাদেশ

বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কিছু প্রস্তাব – ড : এম এ ওয়াজেদ মিয়া :

১। গণতন্ত্রকে স্থায়ী ও সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, দুর্নীতিমুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ গণপ্রচার মাধ্যম যথা রেডিও-টেলিভিশন সংস্থাগুলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান, শিক্ষাঙ্গনসমূহ থেকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অবসান ঘটিয়ে সুস্থ ও নির্মল শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্ম, বিশ্বাস, গোত্র ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ, শান্তি ও সম্প্রীতির সাথে সহ-অবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবী, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছাত্র-সমাজ, কৃষক-শ্রমিক সংগঠন তথা জনগণের পক্ষ থেকে জোর দাবি উঠেছে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কিছু প্রস্তাব - এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ]
এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ]

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত | স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা এবং দেশের সুদীর্ঘকালের বিভিন্ন আন্দলন, সংগ্রাম ও সর্বোপরি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের বাস্তবায়নের তাগিদেই এ সমস্ত দাবি | উত্থাপিত হয়েছে এবং হচ্ছে।

 

২। এ প্রসঙ্গে প্রথম ইস্যুটি হচ্ছে, জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী ও দেশের সরকার তথা প্রশাসন বিভাগের সকল পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ডের জবাব ও হিসাব গ্রহণকারী এবং দেশের সকল আইন ও বিধি-বিধান প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান সার্বভৌম জাতীয় সংসদের কথা। প্রশ্ন ওঠে, বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় এ সার্বভৌম জাতীয় সংসদে বিভিন্ন পেশাজীবী, কৃষক ও শ্রমিকের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কোন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা।

অনেকেই তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মত পোষণ করেন। অতঃপর, প্রশ ওঠে, এতদুদ্দেশো কি স্থায়ী ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যায় ? এ ব্যাপারে প্রস্তাব করা যেতে পারে যে, সার্বভৌম জাতীয় সংসদকে দুইটি অংশে ( বা কক্ষে ) বিভক্ত করা যেতে পারে, যার একটি হবে সকল ক্ষমতার অধিকারী জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট “প্রতিনিধি সভা” এবং অপরটি সর্ব ব্যাপারে উপদেশ প্রদানকারী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট “উপদেষ্টা সভা”।

[ বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কিছু প্রস্তাব – ড : এম এ ওয়াজেদ মিয়া ]

“উপদেষ্টা সভা’র সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটির প্রাপ্ত সাধারণ ভোটের অনুপাতের ভিত্তিতে নির্বাচিত করা যেতে পারে। উক্ত অনুপাতের ভিত্তিতে নির্বাচিত উপদেষ্টা সভা’র ১০০টি আসন বিভিন্ন পেশাজীবী, কৃষক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে নিম্নোক্ত সংখ্যার বা ভগ্নাংশের ভিত্তিতে বন্টন করা যেতে পারে :

(ক) বৈজ্ঞানিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, আইনজীবী ও অর্থনীতিবিদদের জন্য ২০টি;

(খ) শিল্প-বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী ও শিল্পীদের জন্য ২০টি;

(গ) প্রশাসন-পরিকল্পনা-ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক, আধাসামরিক (প্যারা মিলিটারী), পুলিশ ও আনসার বাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য ২০টি;

(ঘ) মহিলাদের (যাদের অবশ্যই ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রীধারী হতে হবে) জন্য ২০টি;

(৫) কৃষক ও শ্রমিক সমাজের প্রতিনিধিদের (যাদেরকে অবশ্যই ন্যূনতম মাধ্যমিক স্কুল পরীক্ষা সনদপ্রাপ্ত হতে হবে) জন্য ১০টি এবং

(চ) স্বেচ্ছাসেবামূলক আর্থ-সামাজিক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের (যাদেরকে অবশ্যই ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রীধারী হতে হবে) জন্য ১০টি।

এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ]
এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ]

৩। এই ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে বর্তমান সংসদে মহিলাদের জন্য ৩০টি সংরক্ষিত আসনের এবং মন্ত্রিপরিষদের ১০ শতাংশ অনির্বাচিত ব্যক্তি বা বিশেষেজ্ঞদের জন্য ব্যবস্থা রাখার বিধিবিধানের প্রয়োজন হবে না। ‘জাতীয় সংসদ’-এর (প্রতিনিধি সভা’র) “উপদেষ্টা সভা’ হবে একটি স্থায়ী ইনস্টিটিউশন অর্থাৎ এটাকে কখনও কোন ক্ষমতা বা আইন বলে ভেঙ্গে দেয়া যাবে না।

কেবলমাত্র প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর উপদেষ্টা সভা’র ৫০ শতাংশ আসনে নতুন ব্যক্তি নির্বাচিত করতে হবে এবং কোন অবস্থা বা পরিস্থিতিতেই কোন ব্যক্তি একনাগাড়ে দু’বারের বেশি ‘উপদেষ্টা সভা’র সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না। সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিপরিষদের সর্বোচ্চ ১০% উপদেষ্টা সভা’র সদস্যদের মধ্য হতে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নিযুক্ত করতে পারবেন।

উল্লেখ্য যে, কোন সরকারী, আধাস্বায়ত্তশাসিত সরকারী অনুদান বা অর্থ সাহায্যপুষ্ট স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা ইনস্টিটিউশনের সদস্যরা চাকুরিতে নিয়োজিত অবস্থায় অথবা থাকাকালীন সময়ে উপদেষ্টা সভা’র সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না। “উপদেষ্টা সভা’র চেয়ারম্যান রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অথবা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হবেন। এই ব্যবস্থা বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে অধিকতর বাস্তবসম্মত হবে।

৪। আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সাধারণ পরিস্থিতিতে প্রতিটি সংসদ (প্রস্তাবিত প্রতিনিধি সভা) যেন তার পাঁচ বছর মেয়াদকাল পর্যন্ত স্থায়ী থাকতে পারে, তা জাতীয় স্বার্থেই কাম্য। সুতরাং কোন কারণে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও অথবা তাঁর পদ শূন্য হলেও কিংবা সংসদে (প্রতিনিধি সভায়) তাঁর মন্ত্রিপরিষদের বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব পাস হলেও সংসদ (প্রতিনিধি সভা) ভেঙ্গে দেয়া যাবে না। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সংবিধানের বিধানানুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষের পূর্বে কোন অবস্থাতেই সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেয়ার কোন সাংবিধানিক ব্যবস্থা বা বিধিবিধান থাকবে না।

Gurukul Live Logo

 

তবে, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব সংসদে পাস হওয়ার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র জাতীয় সংসদ (জাতীয় প্রতিনিধি সভা) সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংখ্যগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনপুষ্ট বিকল্প সংসদ নেতা নির্বাচিত করতে ব্যর্থ হলেই রাষ্ট্রপতি উক্ত সংসদ (প্রতিনিধি সভা) ভেঙ্গে দিতে পারবেন। এক্ষেত্রেও, সংবিধানের বিধিবিধান মোতাবেক অবশ্যই নতুন সংসদ (প্রতিনিধি সভা) নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫। দ্বিতীয় ইস্যুটি হচ্ছে, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, দুর্নীতিমুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপার। এর নিশ্চয়তা বিধানের জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনসহ সার্বিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির অধীনে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। তাহলে নির্বাচনের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকার অর্থাৎ রাষ্ট্রের কার্যনির্বাহী বিভাগের প্রভাব বহুলাংশে সংকুচিত ও খর্বিত হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে আবশ্যিকভাবে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংবিধানগত মূল আদর্শের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনে রেজিস্ট্রিভুক্ত হতে হবে। দেশের বৈধ প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারদের প্রত্যেকের জন্য পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করতে হবে।

৬। তৃতীয় ইস্যুটি হচ্ছে, রাষ্ট্রের তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা বিধান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এতদুদ্দেশ্যে দেশের বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের কার্যনির্বাহী (অর্থাৎ প্রশাসনিক) বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক (আলাদা) করে এর প্রশাসনসহ সার্বিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির অধীনে ন্যস্ত করা অত্যাবশ্যক। এ ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের বিভিন্ন স্তরে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, ইত্যাদি বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি ‘উপদেষ্টা কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে।

এ ছাড়াও, ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার জন্যে রাষ্ট্রপতির অধীনে একটি “আইন বিষয়ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর” সৃষ্টি করা যেতে পারে। অপরাধ ও অন্যান্য আইন সম্পর্কিত বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের উক্ত অধিদপ্তরের দায়িত্বে নিয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার স্বার্থেই একান্ত প্রয়োজন। সুতরাং, নিম্নতম স্তর হিসেবে থানা (সাবেক উপজেলা) পর্যায়েও ফৌজদারী ও দেওয়ানী উভয় আদালতের ব্যবস্থা করতে হবে।

এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ] তার স্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে শুছেচ্ছা জানাচ্ছেন
এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ] তার স্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে শুছেচ্ছা জানাচ্ছেন

৭। চতুর্থ ইস্যুটি হচ্ছে, মতামত প্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ গণপ্রচার মাধ্যমগুলো যথা রেডিও, টেলিভিশন, ইত্যাদি সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা বিধান করা। এতদুদ্দেশ্যে রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদি গণপ্রচার সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে অন্তত আধাস্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় রূপান্তরিত করা অত্যাবশ্যক। পরবর্তীকালে, এগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করা দরকার। এই প্রসঙ্গ ১৯৯১ সালে দেশের সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী ও শিল্পীদের পক্ষ থেকে প্রণীত ও পেশকৃত সুপারিশমালা সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য ও বিবেচনাযোগ্য।

৮। পঞ্চম ইস্যুটি হচ্ছে, স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলো যাতে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে তার জন্যে সুস্থ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা এবং তারা যাতে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান করতে পারে তার জন্যে বৈধ ও আইনস্বীকৃত সুযোগ ও সুবিধার ব্যবস্থা করা। রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ড সম্পাদনে অর্থকড়ির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কাজেই, রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোকে কিছু অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা সমীচীন হবে।

এতদুদ্দেশ্যে বার্ষিক বাজেটে সাধ্য ও সামর্থামত অর্থ বরাদ্দ রেখে তা স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বন্টন করা যেতে পারে—সাধারণ নির্বাচনে তাঁদের স্ব স্ব প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতের ভিত্তিতে। এ ছাড়াও, বেসরকারী শিল্প-বাণিজ্যিক সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, ইত্যাদি যাতে তাদের স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের অনূর্ধ্ব ১০ ভাগ আয়করমুক্তভাবে যে কোন এক বা একাধিক স্বীকৃত রাজনৈতিক দলকে অনুদান হিসেবে প্রদান করতে পারে তার জন্যে আইনসিদ্ধ ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। দেশের যে কোন নাগরিকের তার নিজস্ব আয়ের অনূর্ধ্ব ১০ ভাগ আয়করমুক্তভাবে যে কোন এক বা একাধিক স্বীকৃত রাজনৈতিক দলকে প্রদান করার সুযোগও রাখা যেতে পারে উক্ত বিধিবিধানে।

৯। ষষ্ঠ ইস্যুটি হচ্ছে, শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা। দেশের শিক্ষায়তনগুলোতে, বিশেষ করে, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে, দেশের বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক সমস্যা ছাড়াও যে বিষয়টি মূলত দায়ী তা হলো, ছেলেমেয়েদের অপ্রাপ্ত বয়সকালে রাজনৈতিক দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে যথেচ্ছ ব্যবহার এবং তাদের লালন-পালনে যথাযথ ও যথোপযুক্ত যত্নের অভাব।

Gurukul Live Logo

 

দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হিসেবে মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবেই, তাতে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের অপ্রাপ্তবয়স্ক কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুগুলোয় সক্রিয়ভাবে জড়ানো কোনমতেই যুক্তিসঙ্গত ও সমর্থনযোগ্য নয়।

সুতরাং, উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন বা দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। অর্থাৎ এ স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা কোন ছাত্র সংগঠনের সদস্য হতে পারবে না। এতদ্ব্যতীত, এ স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা যাতে বিঘ্নিত ও ব্যাহত না হয় তার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মবিরতি, স্ট্রাইক, হরতাল, ইত্যাদি কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। একই কারণে, কারিগরি পলিটেকনিক, ইত্যাদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহও এই বিধিবিধানের আওতাভুক্ত হবে।

উল্লেখ্য, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে সমস্ত ছাত্র সংগঠন থাকবে সেগুলোকে কোন রাজনৈতিক দলের অঙ্গদল হিসেবে বিবেচনা করা শুধু নিষ্প্রয়োজনই নয়, অযৌক্তিকও বটে। এক এক ছাত্র সংগঠন এক এক রাজনৈতিক দলের সমর্থক ও মতাদর্শে বিশ্বাসী হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা সত্ত্বেও, তাদেরকে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দলের অঙ্গদল হিসেবে সরাসরি দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং শাসন-অনুশাসনের আওতাধীন করা কোনমতেই যুক্তিসঙ্গত ও সমর্থনযোগ্য নয়।

এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ] তার পরিবারের সদস্যদের সাথে
এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ] তার পরিবারের সদস্যদের সাথে

১০। বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের স্বার্থেই জেলা, থানা (সাবেক উপজেলা) ও ইউনিয়ন স্তরগুলোর প্রতিটি পর্যায়ে সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদের ব্যবস্থা করতে হবে। এ সমস্ত পরিষদে নির্বাচনের জন্য যারা প্রার্থী হবেন তাঁদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা আরোপ করা যেতে পারে। যেমন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থীর ন্যূনতম প্রাইমারী স্কুল পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা আবশ্যিক হিসেবে শর্তারোপ করা যেতে পারে।

অনুরূপভাবে, থানা পরিষদের নির্বাচনের জন্য প্রার্থীকে ন্যূনতম মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় পাস হতে হবে। জেলা পরিষদ কিংবা পৌরসভা বা পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থীদের অবশ্যই স্নাতক ডিগ্রীপ্রাপ্ত হতে হবে। যারা জাতীয় সংসদের জন্য নির্বাচিত হবেন তাঁরা সে সদস্যপদ বহাল রেখেই কোনক্রমেই উপরোক্ত পরিষদগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তবে, থানা ও জেলা উভয় পরিষদের নীতিনির্ধারণ, বাজেট অনুমোদন ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের তদারকির ব্যাপারে জাতীয় সংসদের সদস্যদের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্তিকরণ একান্তই প্রয়োজন।

কারণ, জাতীয় সংসদে ভূমিকা পালন ছাড়াও জনগণ সাংসদদের কাছ থেকে আরও অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। সুতরাং যানা ও জেলা উভয় পরিষদেও জাতীয় সংসদের সদস্যগণ যাতে প্রয়োজনীয়। ভূমিকা পালন করতে পারেন তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সে সম্পর্কে পরবর্তী নিবন্ধে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হবে। তবে, যে জিনিসটি বিবেচনায় রাখা একান্ত দরকার তা হলো এই যে, ইউনিয়ন, থানা কিংবা জেলা পরিষদের কোন নীতিনির্ধারণ, বাজেট অনুমোদন, উন্নয়ন কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্পর্কিত প্রতিটি ব্যাপারে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট পরিষদের সভায় গৃহীত হতে হবে।

এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ]
এম এ ওয়াজেদ মিয়া [ M. A. Wazed Miah ]

পরিষদগুলোর প্রধানদের ভূমিকা হবে কেবলমাত্র প্রশাসনিক অর্থাৎ নির্বাহী। পরিশেষে, যে দুটি বিষয় উল্লেখ করা একান্ত প্রয়োজন তা হলো:

(ক) থানা পরিষদের অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে এবং

(খ) জাতীয় কার্যনির্বাহী বিভাগের কোন মন্ত্রণালয় কোনও অজুহাতে উপরোক্ত পরিষদগুলো তাদের স্ব স্ব মেডান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভেঙ্গে দিতে পারবে না।

কোন বিশেষ কারণে যদি উপরোক্ত পরিষগুলোর কোন পরিষদকে বিলুপ্ত করার একান্ত প্রয়োজন দেখা দেয়, কিংবা কোন পরিবানের চেয়ারম্যানসহ কোন সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আইন লংঘন বা অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিচার বিভাগের অর্থাৎ সর্বোচ্চ আদালতের মতামত, সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কোনও অবস্থাতেই অন্য পন্থায় নয়। অর্থাৎ দেশের কার্যনির্বাহী বিভাগ (সরকার)-এর আদেশবলে নয়।

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

“বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কিছু প্রস্তাব – ড : এম এ ওয়াজেদ মিয়া”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন