বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন ও মহিউদ্দিন আহমেদ পাকিস্তানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকার গুলো “পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর” নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছিলো “দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে”। সেখান থেকে তথ্য উপাত্ত নিয়ে আমরা এই সিরিজটি করছি। বইটি ক্রয় করে আরও বিস্তারিত জানুন। আজ জানবো “বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর” সম্পর্কে।

 

বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ] - বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,
বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,

Table of Contents

বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]

১৯৭১-এ যে সব ঘটনা ঘটেছিল সে সম্পর্কে আপনার যা মনে পড়ে তা বলবেন কি?

 

বেনজীর ভুট্টো : ১৯৭১-এর গৃহযুদ্ধের সময় আমি ছাত্রী ছিলাম। এই গৃহযুদ্ধের পরিণতিতে স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ ও জাতি হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এ সময়ে আমার বাবা দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বাবার কাছে আমি শুনেছি, জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমর্পণের পর ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। কেননা সামরিক অফিসাররা ঐ সময় তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। দেশের মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো তখন পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা। তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে সামরিক কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। তবে দেশ এভাবে ভেঙে যাবার পরও সামরিক বাহিনী ক্ষমতার চারপাশে ওঁৎ পেতে থাকে। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। কেননা সেনাবাহিনীর ডিভিশনগুলোর কর্মকর্তাদের এক বৈঠক ডাকা হলে যা কিছু বিপর্যয় ঘটে গেছে সে জন্য তাদের মধ্যে অত্যন্ত মারমুখী মেজাজ লক্ষ্য করা যায়। জনসাধারণও, বিশেষ করে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত জনসভার সময় রাস্তায় বেরিয়ে আসে।

বাবা বলেছিলেন, ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুরকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চান। আর এরপর ক্ষমতা ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর, যাতে নতুন সরকার সবকিছু ধোয়ামোছা তকতকে অবস্থায় কাজ শুরু করতে পারে। ইয়াহিয়া বলেছিলেন যে, শেখ মুজিব সবকিছুর মূল। তাঁকে যে তিনি আগেই হত্যা করেননি সেটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল। তিনি যদি তখনই তা করতেন তাহলে এতকিছু ঘটত না।

বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,
বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,

আমার বাবা বলেছিলেন, না ওটা করবেন না। কেননা বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে তাদের নেতা হিসাবে গ্রহণ করেছে, আর আমরাও এখন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চাই। আমরা একটি একক দেশ ছিলাম। বাঙালীরা যদি আমাদের সঙ্গে থাকতে অসুখী বোধ করে থাকে সেটি ওরা করতে পারে। আমাদেরকে আবার ওদের কাছে যেতে হবে। শেখ মুজিবের যদি কিছু হয়, তাহলে বাঙালী জনসমষ্টির সঙ্গে আমাদের আবার সেতুবন্ধন গড়ে তোলার কাজটি ঢের বেশি কঠিন হয়ে উঠবে।

তিনি সত্যিকারভাবেই তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তাঁর সহযোগীদের বোঝাতে সক্ষমও হন।

আমার বাবা ক্ষমতা হাতে নেবার পর তিনি শেখ মুজিবের সাথে দেখা করবেন বলে বার্তা পাঠিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল তাঁর সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হওয়া। কিন্তু শেখ মুজিব এ রকম উদ্যোগের গোড়াতে আশঙ্কা করেছিলেন, ওরা আমাকে হত্যা করতে আসছে। কিন্তু আমার বাবা যখন তাঁর কক্ষে প্রবেশ করে হাসিমুখে বললেন, কেমন আছেন? জবাবে শেখ মুজিবুর রহমান জানতে চাইলেন, এখানে কী করতে? আমার বাবা বললেন, “আমি এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট।” এরপর তাঁরা কোলাকুলি করেন।

আমার বাবা এরপর তাঁর সঙ্গে বসে পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁকে জানালেন। শেখ মুজিবের রেডিও শোনার কোন সুবিধা তখন ছিল না। তাই অবশিষ্ট বিশ্বে তখন কী ঘটছে তা জানার উপায় তাঁর ছিল না। আমার বাবাই তাঁকে বলেছিলেন, আমরা নতুন করেই সবকিছু শুরু করতে চাই। সবকিছু ঘটে গেছে, শোধরাবার কোন উপায় আমাদের হাতে নেই। তবে আমি আপনাকে একান্ত অনুরোধ করছি এমন কিছু একটা করুন যাতে কোনভাবে পাকিস্তানকে একত্রে রাখা যায়।

বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,
বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,

হতে পারে সেটি হবে এক ধরনের শিথিল ফেডারেশন। কনফেডারেশনও হতে পারে। দুটি দেশ হলেও আপত্তি নেই। পররাষ্ট্রনীতি এক রেখে কিংবা কোন প্রকার কাঠামোর মধ্যে রেখে কিংবা এমনকি নামমাত্র প্রধানের অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পদ রেখেও কমিটি করা যেতে পারে। দেশকে একসাথে রাখার একটা উপায় আপনি খুঁজে বের করবেন, সেই অনুরোধ আমি জানাই আপনাকে।

শেখ মুজিব জবাবে বলেছিলেন, আমাকে ফিরে গিয়ে আমার লোকজনের মনোভাবটা বুঝতে হবে। কেননা আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছি। তিনি আমার বাবাকে এ অঙ্গীকার করেছিলেন যে, কোন শিথিল ফেডারেশন কিংবা এমনকি কোন এক ধরনের কনফেডারেশন কাঠামোতে কোনভাবে দু’দেশকে এর পরেও সম্পর্কিত রাখা যায় কি না তার জন্য কোন রকম একটা উপায় বের করার জন্য তিনি চেষ্টার ত্রুটি করবেন না।

আমার বাবা বলেছিলেন, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের নীতি মেনে নিচ্ছি। আর তাতে বাংলাদেশ যদি ঐ কনফেডারেশন বা ফেডারেশনের শীর্ষ পদটি জয় করে, ভাল কথা। বাবা শেখ মুজিবকে এই বলে অনুরোধ জানান, এক্ষুনি আপনি বাংলাদেশে ( অবশ্য সে সময় তিনি ছিলেন একজন বন্দী) মানে ঢাকায় ফিরে যাবেন না। আমি চাই, আপনি প্রথম লন্ডনে যান যাতে করে চিন্তাভাবনা করে দেখার কিছুটা অবকাশ আপনার মেলে, আর আপনাকে যাতে অবিলম্বে কোন সিদ্ধান্তে আসার মতো অবস্থায় পড়তে না হয়।

শেখ সাহেব যখন লন্ডন যান আমার বাবা তখনও আশা করছিলেন শেষ মুহূর্তে একটা কিছু সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে। তবে তা হবার ছিল না। শেখ মুজিব ঢাকায় অবতরণ করেই বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করে এক বিবৃতি দিলেন। এ সত্ত্বেও পাকিস্তানের জনসাধারণ আজ অবধি মনে করে, অতীতে যা-ই ঘটে থাকুক স্বাধীনতার অভিন্ন সংগ্রামের ঐতিহ্যে আর এক সময়ে অভিন্ন স্বদেশ সৃষ্টির সুবাদে আমরা একত্রে সম্পর্কসূত্রে গাঁথা।

বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,
বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,

একটা দেশ বা জাতি হয়ত বা আর হবে না। তবু সম্ভবত একটি কনফেডারেশন গড়ার জন্য বাংলাদেশের জনগণের সাথে একত্রে কাজ করা আমাদের উচিত হবে। আমরা সার্ক আঞ্চলিক সহযোগিতা সংগঠনে একযোগে কাজ করতে পেরে নিশ্চয়ই আনন্দিত। এ এক চমৎকার ফোরাম যেখানে আমাদের সকলের একত্রিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আমার প্রজন্মের মানুষগুলোর জন্য এমন প্রত্যাশা আজও স্বপ্ন হয়ে আছে।

আমি জানি না বাংলাদেশের সাথে যাদের কখনও পরিচয় হয়নি পাকিস্তানের সেই নতুন প্রজন্ম কী ভাবে। তবে আমাদের প্রজন্মে এখনও একটা অনুভূতি হলো এই যে, এমনকি কনফেডারেশন কাঠামোর মধ্যেও যদি উপমহাদেশের দুইটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এক হতে পারে তাহলে সেটি হবে উভয় দেশের অভিন্ন কল্যাণের পথে এক ধাপ অগ্রগতি।

পরবর্তীকালের পাকিস্তানে আমি জানি, আমরা পাকিস্তানীরা বাংলাদেশের সাথে একটা সমঝোতায় আসতে এবং যে শত্রুতা ও বৈরীভাব এখন রয়েছে তা ঝেড়ে ফেলতে চাই। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ঘৃণা ছিল ঐ সময়ে যার কারণ অনুমিত ক্ষোভ-অভিযোগ, অনুমিত হামলার। যুদ্ধ বড় নোংরা জিনিস—তা গৃহযুদ্ধ, বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ কিংবা দেশ ভাঙার যুদ্ধ – যাই-ই হোক। যুদ্ধের সময় কদর্য, কুৎসিত ঘটনা ঘটে। আর এ রকম অনেক ঘটনাই অনিবার্যভাবে ক্ষতের দাগ রেখে গেছে।

বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,
বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,

১৯৭১-পরবর্তী পরিস্থিতি কেমন ছিল পাকিস্তানে?

বেনজীর ভুট্টো : খুবই কঠিন পরিস্থিতি ছিল সেটি। কেননা আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে যখন একটা সমঝোতায় পৌঁছতে চাচ্ছিলাম সেই সময়টায় পশ্চিম পাকিস্তানে বাঙালীদের অনুমিত নিষ্ঠুরতা নিয়ে প্রচুর আবেগ-উত্তেজনা ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানীদের তরফ থেকে অনুমিত বর্বরতার আবেগানুভূতি ছিল যেমন বাঙালীদের, তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানীদেরও আবেগানুভূতি ছিল পূর্বের অনুমিত নিষ্ঠুরতা নিয়ে। কিন্তু আমার বাবা তখন মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন দেশের সাথে আলোচনায় নিয়োজিত হন।

ঐ সময় ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে বাদশাহ ফয়সলের সাথে আমার বাবাও যুগ্ম সভাপতিত্ব করেন। শেখ মুজিবকে এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয় ও সমাঝোতা অনুযায়ী বাংলাদেশকে ওআইসিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিভিন্ন মুসলিম দেশ পাকিস্তানকে অনুরোধ জানায়।

এ রকম এক পটভূমিকায় শেখ মুজিব পাকিস্তানে আসেন। লাহোরের শালিমার উদ্যানে এ সময় আমি আমার বাবার পাশে ছিলাম। আমার মনে আছে, শেখ মুজিবকে সে সময় উল্লসিত সংবর্ধনা দেয়া হয়। জনসাধারণ অত্যন্ত উৎফুল্ল ছিল। আমার বাবা ও শেখ মুজিব লিবীয় নেতা গাদ্দাফি ও ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাতের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাবা ও শেখ মুজিব পরপের কোলাকুলি করলেন। জনগণ এ দৃশ্যে তুমুল হর্ষধ্বনি করে ওঠে। কারণ তাদের মনে হয় আমার বাবা ও শেখ মুজিব যথাক্রমে রয়ে যাওয়া পাকিস্তান ও সদ্যজাত বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক।

বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,
বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,

তাঁদের মিলন দৃশ্যে জনতা আশার ঝিলিক দেখতে পায়— যে হৃদয় ভেঙে গেছে হয়ত আবার তা জোড়া লাগানো সম্ভব হবে। এ সময় বহু বিতর্কিত ইস্যু ছিল। ভারত তখন যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানী সৈনিকদের বিচার করার হুমকি দিচ্ছিল। আমাদের যুদ্ধবন্দী ছিল ৯০ হাজার। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে দরকষাকষিমূলক আলোচনার মাধ্যমে এসব সমস্যার নিষ্পত্তি করা হয়।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে পাওনা সম্পদ ও দায়ের ইস্যু ছিল। তবে কোন কোন কারণে এ ইস্যুটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। আরও একটি সমস্যা ছিল। সেটি হলো বিহারীদের পাকিস্তানে প্রত্যাবাসনের সমস্যা। এই বিহারীরা হলো বঙ্গদেশীয় সীমানা সংলগ্ন ভারতের বিহার প্রদেশের লোক। এরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসী হয়েছিল।

এরা ছিল মোহাজির। এরা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল গৃহযুদ্ধে। তাই এই মর্মে একটা সমঝোতা হয়েছিল যে, ১ লাখ ৬০ হাজার বিহারীকে পাকিস্তানে এনে পুনর্বাসিত করা হবে। এবং এটি করা হয় আমার বাবা শাসন ক্ষমতায় থাকাকালে। এর পরবর্তীকালে কোন এক সময়ে—ঠিক কোন সময়ে আমি খুব একটা জানি না, বাংলাদেশের অবশিষ্ট বিহারীদের নিয়ে কথা ওঠে।

বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,
বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী [ Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan ] File Photo,

পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বী এই বিহারী ও বাংলাদেশের দায়দেনা সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

বেনজীর ভুট্টো : আমি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমার মনে হয়েছিল একটা গোটা নতুন প্রজন্মের লোকজন এখন বড় হয়ে উঠেছে যারা পাকিস্তানের কথা সত্যিকারভাবে জানে না। ওরা শুধু ওদের বাপ-মায়ের কাছ থেকে এ সম্পর্কে শুনেছে। ওদের জন্ম বাংলাদেশে। ওখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ওদের লেখাপড়া শুরু। বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় আছে ওদের। আমিও বুঝেছিলাম, সামাজিক ও জাতিগোষ্ঠীগত সংহতি বিধানের বেলায় বহু ইস্যু অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

আমাদের এখানেও এখন জাতিগোষ্ঠীগত প্রচুর আবেগানুভূতি রয়ে গেছে। আর সে কারণেই পাকিস্তান একটি ফেডারেল কাঠামোর রাষ্ট্র, কোন সমজাতীয় জনসমষ্টির দেশ বা জাতি নয়। তবে বাংলাদেশ সে তুলনায় ঢের বেশি সমজাতীয় জনভূভাগ। অর্থাৎ আপনাদের রয়েছে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টি, আর কার্যত মাত্র একটি সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগোষ্ঠী।

পাকিস্তান এমনটি নয় বলেই আমরা উপলব্ধি করেছিলাম। এ কারণেই যে পাকিস্তান রয়ে গেছে সেই দেশটিতে গুরুতর গোলযোগ দেখা দেবে। তাই বিহারীদের যদি পাকিস্তানে পুনর্বাসিত করতেই হয় তাহলে আগে স্বচ্ছতা বজায় রেখে একটা আদমশুমারি করতে হবে। এটি এমনিভাবে করতে হবে যা সকলের কাছে হবে গ্রহণযোগ্য। এর প্রথম কাজ হবে বাংলাদেশে কতজন বিহারী এখন রয়ে গেছে তা নির্ধারণ করা।

যদি ভুট্টো সাহেবের সময় এক লাখ ৬০ হাজার এসে থাকে, আর তারপরে যদি আরও থেকে থাকে, আরও বিহারীকে পাকিস্তানে আনাও হয়, এরপরেও হয়ত কেউ বলবে, আরও রয়ে গেছে। তাই আমাদের পয়লা ভাবনা হলো বাংলাদেশের বিহারীদের একটা আদমশুমারি হতে হবে।

Benazir Bhutto Former Prime Minister of Pakistan File Photo বেনজির ভুট্টো 61 বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান তার নিজের জাতিগোষ্ঠীগত সমস্যার ব্যাপকতার আলোকে সব বিহারীকেই নিতে পারে না। এ জন্যই আমরা মনে করেছিলাম, এ ব্যাপারে ওআইসি’র পক্ষ থেকে একটা সাড়া আসা উচিত। তার আওতায় বিহারীদের সমস্যার পর্যায়ক্রমে সমাধান হওয়া উচিত। প্রতিটি মুসলিম দেশকেই একটা নির্ধারিত ও স্বীকৃতসংখ্যক বিহারীকে তাদের নিজ নিজ দেশে নিতে হবে যাতে এ সমস্যার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি চিরকালের মতো হয়ে যায়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিহারীরা ভাল থাকতে চায় – অবশ্য সবাই উন্নততর অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা চায়, প্রত্যেকেই তাদের সন্তান-সন্ততিদের জন্য উন্নততর ভবিষ্যৎ চায়। তাই আমি বলব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ – এ দু’টি দেশের মধ্যকার সবচেয়ে জরুরী সমস্যাগুলো হলো বিহারীদের প্রত্যাবাসন এবং দায়-সম্পদ বণ্টন প্রশ্ন।

আমি তবুও মনে করি, দুই দেশের জনগণের মধ্যে গভীর সম্পর্কের একটা বন্ধন রয়েছে। আমি যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, বাংলাদেশের মানুষ আমাকে যে প্রীতি ও ভালবাসা জানিয়েছে তাতে সত্যিই আমি অভিভূত হয়েছি। অবশ্য এর আগেও যে আমি ঢাকার কথা শুনিনি তা নয়।

আমার বাবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে মাঝে মাঝে ঢাকায় যেতেন। যখনই তিনি ঢাকা থেকে ফিরতেন আমাদের জন্য রসমালাই নিয়ে আসতেন। সেই রসমালাই আসত টিনে ভর্তি হয়ে, আসত চমৎকার রেশমী শাড়ি কাপড়। এ সবের পটভূমিতে ঢাকায় গিয়ে এ রকম বিপুল প্রীতি-ভালবাসা পেয়ে আমার একান্ত অভিভূত না হয়ে উপায় ছিল না।

মনে পড়ে ১৯৭৪-এর কথা। সে সময় শেখ মুজিব পাকিস্তানে এসেছিলেন। তাঁকে পরম ভালবাসায় গ্রহণ করা হয়েছিল। যদি আমরা ক্ষণিকের জন্য হলেও রাজনীতিকে পাশে ঠেলে রাখতে পারি তাহলে আমার মনে হয়, গৃহযুদ্ধ যত কদর্য, ভয়ানক কুৎসিতই হোক না কেন, দু’দেশের জনগণের বুকের গভীরে রয়েছে পরস্পরের প্রতি গভীর মমত্ব, উষ্ণতা, প্রীতি ও ভালবাসা।

আমার ঐ সময় মনে হয়েছিল দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে দু’দেশের উচিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা। অবশ্য আমরা জানি, বড় পড়শী পরিবেষ্টিত ছোট দেশগুলোর যা হয়ে থাকে তেমনি বাংলাদেশের এ ব্যাপারে সমস্যা রয়ে গেছে। আমরা এসব সমস্যার ব্যাপারে সংবেদনশীল ও বটে।

Benazir Bhutto Former Prime Minister of Pakistan File Photo বেনজির ভুট্টো 60 বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

আর ঐ রাতের কথা মনে পড়ে যে রাতে শেখ মুজিব মারা যান। আমার মনে আছে, আমরা তখন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রধানমন্ত্রী ভবনে থাকতাম। আমার বাবার থাকার কক্ষটি ছিল ভবনের একটু বাইরে। আর মূল ভবনের ভিতরে ছিল তিনটি শয়নকক্ষ— আম্মু এক নং, আমি দুই নং ও আমার বোন সানি তিন নং কক্ষে থাকতাম। আমার দরজায় শব্দ শোনা গেল। বাবা বললেন, ওঠো, তোমরা ওঠো। আমি বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। তখন আমি তরুণ বয়সী। বয়স তখন হয়ত আমার ২০-এর কোঠায়, আমার ঠিক মনে নেই।

আমি বললাম, ‘ব্যাপার কী, কী হয়েছে।’ তিনি জবাবে আমাকে তাঁর ঘরে যেতে বললেন। আমরা সবাই তাঁর ঘরে গেলে তিনি বললেন, এক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেছে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবকে তাঁর লোকেরাই হত্যা করেছে। এরপর আমরা বাকি রাত জেগে রইলাম। আস্তে আস্তে খবর আসতে শুরু করল। আর সে রাতে ঐ ঘরের নীরবতা— ভয়ঙ্কর নীরবতার কথা মনে আছে। এর কারণ, খবর খুবই মর্মান্তিক রকমে ভয়ঙ্কর মনে হলো।

প্রথমে বলা হলো, বাংলা বাবু না বাংলা বন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর জানা গেল তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। পরে—তাঁর কন্যাদের হত্যা করা হয়েছে। পরে আরও খবর এলো, কিছু শিশু শোবার খাটের নিচে ছিল। সেখান থেকে টেনে বের করে তাদেরও হত্যা করা হয়েছে। আমরা সকলেই শেখ মুজিবের জন্য শোক প্রকাশ করলাম। কেননা পাকিস্তানী হিসাবে তাঁর সম্পর্কে আমাদের মিশ্র অনুভূতি থাকলেও তিনি তো এক স্বাধীন দেশ ও জাতির আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

সর্বোপরি, নীতিবাদী ব্যক্তি হিসাবে তিনি ব্যাপক পর্যায়ে শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। তিনি এমনকি মৃত্যুর মুখে তাঁর নিজ নীতিতে অবিচল ছিলেন। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী, অল্পের জন্য তাঁর প্রাণরক্ষা পেয়েছে। তিনি হয়ত ভেবেছিলেন, রেহাই তিনি পাবেন না, তাঁকে মরতে হবে। আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসাবে তাঁর জন্য ছিল অগাধ শ্রদ্ধা – এমন একজন মানুষের ওপর এ ধরনের ট্র্যাজেডি নেমে আসায় বিষাদ নেমে আসে। তিনি ছিলেন তাঁর দেশ ও জাতির জনক। আর জাতির জনকের পরিণতি যদি এই হয় তাহলে তেমন পরিস্থিতি আমাদের জন্য খুব শুভ হতে পারে না।

ঐ সময় আমার মনে আছে, এমন আলোচনাও হয়েছে যে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বলতে সত্যিকার অর্থে তেমন কিছুই ছিল না। মনে পড়ে, পরের দিনগুলোতে লোকজনের মুখে যেসব আলোচনার থৈ ফোটে সে সবের কথা বলতে শুনলাম—আরে, ক্যুদেতা করতে বড়জোর একটা ট্যাঙ্ক হলেই হলো। কারণ বাংলাদেশের তখন পুরনো সেকেন্ডহ্যান্ড ট্যাঙ্ক বৈ কিছু ছিল না। এ ট্যাঙ্কগুলো কোত্থেকে যোগাড় করা? একটা গভীর বিষাদ নেমে এসেছিল এই ভেবে যে, নিজের লোকেরাই তাদের জাতির পিতাকে এমন বর্বরোচিত নিষ্ঠুরতায় হত্যা করতে পারে!

Benazir Bhutto Former Prime Minister of Pakistan File Photo বেনজির ভুট্টো 59 বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

বাংলাদেশের মানুষের তা মনে নাও হতে পারে!

বেনজীর ভুট্টো : আমার বিশ্বাস, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়েই এখন পরিণত অবস্থায় এসেছে উপলব্ধির দিক থেকে। পাকিস্তানে আমরা স্বীকার করি যে, বাংলাদেশের স্বীয় পরিচয় রয়েছে। ওদেশের জনগণের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। তাদের স্বার্থ অবশ্যই তাদের নিজেদেরকেই দেখতে হবে। তবু আমি মনে করি, ওরা দু’দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখতে চায়।

আমাদের উচিত নানা সেমিনার, আলাপ-আলোচনার অনুষ্ঠান করে, দু’দেশের বুদ্ধিজীবীদের পরস্পরের দেশে ভ্রমণ বিনিময় করে এ অনুভূতি ও উপলব্ধিকে আরও জোরদার করে তোলা। আমাদের জনসাধারণ বাংলাদেশের খবরাখবরে খুবই উৎসুক। প্রেসিডেন্ট এরশাদ বা তাঁর বিচার – যে খবরই হোক অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পাকিস্তানের জনসাধারণ শোনে, পড়ে।

বেগম জিয়া কী করছেন, শেখ হাসিনা কী করছেন আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করে। বহুকাল আগে ১৯৮৪ বা ১৯৮৫-তে শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। লন্ডনের অক্সফোর্ড ও কেম্ব্রিজ ক্লাবে আমাদের দেখা হয়। এ সাক্ষাতের আয়োজন করেছিলেন চৌধুরী… হ্যাঁ, তাঁর নাম আমার মনে পড়ে, আবুল হাসান চৌধুরী। তিনি এখন আপনাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। চৌধুরী তখন ছিলেন জিসাস কলেজে। আমি ছিলাম লেডি মার্গারেট হলে। তিনিই এ সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছিলেন।

তখন আমরা বয়সে তরুণ, আমাদের মাঝে তখন উত্তেজনা ছিল প্রবল। বেশ কয়েক বছরের ব্যবধানে পরবর্তীকালে যখন আবার দু’জনের সাক্ষাৎ ঘটেছে তখন আমাদের আবেগ যথেষ্ট প্রশমিত।

Benazir Bhutto Former Prime Minister of Pakistan File Photo বেনজির ভুট্টো 58 বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

আমরা পাকিস্তানীরা অত্যন্ত গভীর আগ্রহের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাগুলো লক্ষ্য করি। আমাদের খবরের কাগজে ঐ সব ঘটনার খবর ফলাও করে ছাপা হয়। আপনাদের দেশে ডিক্টেটরের শাসনের একাধিক পর্যায় কেটেছে। আমাদের নিজেদেরও এর পাল্লায় পড়তে হয়েছে। এরপর আমাদের দেশে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন হয়েছে, হয়েছে আপনাদের দেশেও। আমাদের দেশে পরে কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আপনাদের দেশেও। দেখা যায়, দু’টি দেশের ওপর দিয়ে একই ধরনের জোয়ার-ভাটার খেলা চলেছে, এসেছে একই ধরনের প্লাবন—এই তো মোটামুটি যা আমার মনে পড়ে।

কিছুদিন আগে নওয়াজ শরীফ বলেছেন, ‘৭০-এর নির্বাচনের রায় যদি ‘৭১-এ বাস্তবায়িত হতো তাহলে দেশ আলাদা হয়ে যেত না। কিন্তু অনেক বই লেখা হয়েছে, যেগুলোতে আভাস দেয়া হয়েছে পিপিপিই ছিল এতে অন্তরায়। আপনার বক্তব্য কী?

 

বেনজীর ভুট্টো : আমি এর ব্যাখ্যা দেব। শেখ মুজিব ৬ দফা চেয়েছিলেন যার আওতায় মাত্র ছয়টি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে। প্রতিটি প্রদেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে তাদের নিজ নিজ ব্যবসা বাণিজ্য, প্রতিটি প্রদেশের থাকবে নিজ নিজ মুদ্রা ব্যবস্থা বা কারেন্সি। যদি তাই হয় তাহলে কেন্দ্রের প্রতিরক্ষা খাতের ব্যায় প্রদানের জন্য কে প্রদেশগুলোকে বাধ্য করবে?

আমরা বাস্তবিকপক্ষেই টের পাচ্ছিলাম, এ হলো আসলে নেপথ্যে স্বাধীনতার দাবি যে স্বাধীনতা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোর জন্যও। স্নায়ুযুদ্ধ যখন তুঙ্গে সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন সত্যিকার অর্থে চেয়েছিল কমিউনিজমের বিরুদ্ধে একটা ব্যূহের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তান ভেঙে যাক। তার এ চাওয়াটা কেবল ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার জন্যই নয়।

আমাদের মনে হয়েছিল, ভারতও এতে পুলকিত বোধ করে। কেননা তারা বলেছিল, স্বাধীনতার পর পাকিস্তান খুব বেশিকাল টিকবে না, ধসে পড়বে। আমরা মনে করেছিলাম ৬ দফা বাস্তবায়নের অর্থ হবে ১৯৭১-এ পাকিস্তানের খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাওয়া। এ কারণেই আমরা ৬ দফার বিরোধিতা করেছিলাম। ৬ দফা কায়েম হলে আজকের পাকিস্তানের অস্তিত্বও থাকত না। ৬ দফার দফাগুলো ছিল এই–বৈদেশিক বাণিজ্য থাকবে প্রদেশগুলোর হাতে; নিজ নিজ কারেন্সিও থাকবে প্রদেশগুলোর।

Benazir Bhutto Former Prime Minister of Pakistan File Photo বেনজির ভুট্টো 57 বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

এ অবস্থায় কি তাহলে দেশকে একত্রিত রাখা যাবে? কোন সেনাবাহিনীর অস্তিত্বও থাকত না। কোন সেনাবাহিনী না থাকলে পররাষ্ট্রনীতিরও কোন দরকার থাকে না। তাই আমার ধারণা, এ সব পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয়ত, ‘৭০-এর নির্বাচনে তৎকালীন পাকিস্তানের দু’টি অংশ ভিন্ন ভিন্ন রায় দিয়েছিল। পূর্বাঞ্চলের রায় ছিল দেশ ভাঙার অনুকূলে। কেননা ৬ দফা কার্যত দেশ ভাঙারই শামিল। ওদিকে পশ্চিমাঞ্চলের রায় ছিল ৬ দফার বিরুদ্ধে।

পশ্চিম পাকিস্তানের কেউ ৬ দফার পক্ষে ভোট দেয়নি, বরং পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এ অবস্থায় একটি রায়কে মেনে নেয়া, অন্যটিকে অস্বীকার করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্যই একটি আপোসরফা ছিল জরুরী বিষয়, বিশেষ করে যখন দেশ দু’টি বিবপরীত মেরু অভিমুখী রায় দিয়েছে।

তৃতীয়ত, ভুলে যাওয়া উচিত নয়, ১৯৭০-এর পূর্বাঞ্চলের নির্বাচনে সত্যিকার অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। মওলানা ভাসানী নির্বাচন বয়কট করেছিলেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। মওলানা ভাসানী দাবি করেছিলেন, ব্যাপক ও ভয়াবহ বন্যা এবং সামুদ্রিক ঝড়ের কারণে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত রয়েছে। সেখানকার মানুষ ভোট দিতে অক্ষম। শেখ মুজিব এমন এক নির্বাচন জয় করেছিলেন যাতে প্রতিযোগিতা ছিল না।

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত তো পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের। এ কমিশন ছিল কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত। তারাই ১৯৭০-এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। সিদ্ধান্তটি শেখ মুজিবুর রহমানের নয়। ঠিক আছে, শুধু ভাসানীর এলাকাগুলোতেই সামুদ্রিক ঝড়ের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যে সব নির্বাচনী এলাকা বা অঞ্চল ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোতে নির্বাচন স্থগিত রাখার আবেদন তিনি জানিয়েছিলেন।

 

বেনজীর ভুট্টো : আমি বলিনি এ সিদ্ধান্ত তাঁর। আমার বক্তব্য ছিল, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। কারণ যা-ই হোক… আমি বলতে চাই যে, আমি যদি নির্বাচন করি আর নওয়াজ শরীফ না করেন তাহলে সে নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট নির্ঘাত আমার পক্ষেই পড়বে। আর অবস্থা এর উল্টো হলে নওয়াজ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতবেন। ব্রিটিশ শ্রমিক দল যদি নির্বাচনে না লড়ে, টোরিরা ফাঁকা মাঠে গোল দেবে।

আমেরিকার রিপাবলিকানরা নির্বাচনের মাঠে থাকলেও তার পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটিক দল গরহাজির থাকলে শেষের দল জিতবে না। তবে এসব যুক্তি ছাড়াও আমার বলার বিষয় হলো এই—যা আপনাকে মেনে নিতে হবে এমন নয়, সে নির্বাচনটিতে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। মওলানা ভাসানী এ নির্বাচন বয়কট করেছিলেন আর সেটি চলে যায় শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের অনুকূলে।

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

যেভাবেই হোক আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়ে ওঠে।

 

বেনজীর ভুট্টো : পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দলটি একটি ম্যান্ডেটের ওপর জয়ী হয়। আর পশ্চিম পাকিস্তানীরা কোন রকমের একটা সমঝোতা ছাড়া পার্লামেন্টে যোগ দিতে রাজি ছিল না। তাহলে ঐ সময় জনাব ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে কী ধরনের আপোসরফা, কী ধরনের সমঝোতা চেয়েছিলেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : আমি সে ব্যাখ্যাও দেব। ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ১২০ দিনের ভিতর শাসনতন্ত্র স্থির করতে হবে। এ জন্য কায়েদে আওয়াম বলেছিলেন, ১২০ দিনের ম্যান্ডেট আপনি দেবেন না। কারণ সেটিই একটি প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠবে। তাই হয় সময়সীমার এ ম্যান্ডেট বাতিল করুন যাতে পূর্বাহ্ণে আমরা দরকষাকষিমূলক আলোচনার জন্য যথেষ্ট সময় হাতে পাই, না হয় সময়ের সুপরিসর একটা ব্যবস্থা রাখুন। ১২০ দিনের অচলাবস্থা হতে দেবেন না।

অনেক লোকই হয়ত ভুলে গেছে, আমি ভুলিনি। ভুট্টো পার্লামেন্টে যাবেন না—কখনও একথা বলেননি। বরং বলেছিলেন, বাধার কাঁটা রেখে আমরা সমঝোতায় আসতে পারি না। তিনি এ জন্য দু’টি বিকল্প দিয়েছিলেন—এক. হয় জাতীয় পরিষদ বা গণপরিষদ অনুষ্ঠান বিলম্বিত করুন আমাদের দরকষাকষির আলোচনার সময় দেবার জন্য, না হয় সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্য ১২০ দিনের সময়সীমা তুলে নিন। কেননা পশ্চিম যেখানে ৬ দফা প্রত্যাখ্যান করেছে পূর্বাঞ্চল সেখানে সেটি গ্রহণ করেছে। দেশের বিচ্ছিন্নতা কীভাবে এড়ানো যায় ভুট্টো এমন একটা আপোসরফার জন্য তৈরি ছিলেন।

Benazir Bhutto Former Prime Minister of Pakistan File Photo বেনজির ভুট্টো 54 বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

কী ধরনের সমঝোতা চেয়েছিলেন তিনি?

 

বেনজীর ভুট্টো : আমি পড়াশোনার জন্য বিদেশে থাকাকালে আমার কাছে বাবা চিঠির আকারে কার্যত একটি বই লিখেছিলেন। বইটির শিরোনাম প্রথমে ছিল—মাই গ্রেট ট্র্যাজেডি, পরে এটি দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি—এই শিরোনামে ছাপার আকারে প্রকাশিত হয়। আমি ইতিহাস থেকে সমঝোতার খুঁটিনাটি ও সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো মনে করতে পারছি না, তবে তাতে অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনের ব্যবস্থা ছিল, যে আদান-প্রদানের জন্য তাঁরা তৈরিও ছিলেন। তবু একটি বা দু’টি বিষয় ছিল যে সব বিষয়ে তখন সংশয়, দ্বিধা, দোদুল্যমানতা ছিল। সম্ভবত এ সবের ব্যাখ্যা রয়েছে দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডিতে। বইটিতে এ বিষয়ে আমার বাবার নিজের অভিমত রয়েছে।

Benazir Bhutto Former Prime Minister of Pakistan File Photo বেনজির ভুট্টো 53 বেনজীর ভুট্টোর দৃষ্টিতে একাত্তর [ পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর সিরিজ ]
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

বইটি আমি পড়েছি। সুলিখিত এ গ্রন্থে বাস্তবিকপক্ষে সামরিক এ্যাকশনের অনুকূলে যুক্তি দেখানো হয়েছে। এতে রয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানী ভোটারদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রয়াস। তবে এতে সবিস্তার আলোচনাও রয়েছে ৬ দফার।

 

বেনজীর ভুট্টো : এভাবে আমার অবশ্য মনে নেই। তবে বইটি হাতের কাছে থাকলে আমি আমার বাবার সাথে কোন কোন আলোচনার কথা মনে করতে পারতাম। তবে যদ্দুর আমার মনে পড়ে, ৬ দফা মেনে নেয়া নয়, বরং ৬ দফার প্রশ্নে কী ছাড় দিতে তৈরি সে কথা তিনি ঐ বইতে লিখেছেন।

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

জী হ্যাঁ, সে কথা তিনি প্রকাশ্য জনসভাতেও বলেছেন।

 

বেনজীর ভুট্টো : না, প্রকাশ্য জনসভার কথা আমি বলতে চাইব না। কেননা খবরের কাগজে ঘটনাকে বিকৃত করার কুখ্যাতি রয়েছে।

তিনি ট্র্যাজেডি’ কথাটি বলেছেন আসলে নিষ্ঠুর পরিহাসে। আমি জানি না, এটি বাংলাদেশ বা পাকিস্তান কারও জন্য ট্র্যাজেডি ছিল কি না।

 

বেনজীর ভুট্টো : ট্র্যাজেডি হয়ত দু’দেশের জন্যই। ওটা ছিল তাঁর ঐ সময়কার অভিমত।

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

পিপিপি ছয় দফার সাড়ে চার দফা মেনে নিতে সম্মত হয়েছিল। তাই ধরে নেয়া যায়, ওরা সত্যিই খুব কাছাকাছি এসে পৌঁছেছিল। অথচ শেখ মুজিবের সাথে তিনি কী সমঝোত চাচ্ছিলেন তা কেউ জানে না বলেই মনে হয়।

 

বেনজীর ভুট্টো : শেখ মুজিব ছয় দফা নিয়ে চাপ বজায় রাখবেন না—এটি তিনি চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ছয় দফার জন্য যদি ম্যান্ডেট থেকে থাকে আপনার, আমার কাছেও ম্যান্ডেট রয়েছে সেই ছয় দফারই বিরুদ্ধে। তাঁর ও পিপিপির মতে, ছয় দফা আমরা মেনে নিলে আমাদের চোখের সামনেই পাকিস্তান ভেঙে পড়বে। দু’টি নয়, কেবল পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নয়, পাঁচ পাঁচটি দেশের আবির্ভাব ঘটবে।

তাই পাকিস্তানকে রক্ষার বিষয়টি তিনি সুনিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি ছয় দফার আরও দুই একটি দফা মেনে নিতে তৈরি সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের আলোকে। তবে সে ক্ষেত্রে শেখ মুজিব বা আওয়ামী লীগকেও কোন না কোন বিষয় ছাড় দিতে হবে। এ সব বিষয়ের কথা তিনি তাঁর ঐ বইতে লিখেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, মুক্তিবাহিনী ঐ সময় গোটা ঢাকা নিজেদের কব্জায় নিয়ে নিয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র মূলত ঝরে পড়েছিল…।

তৃতীয়ত, তিনি আগে থেকে এ সব জানতেন না…।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

এটি কোন সময়ের ঘটনা? ‘৭১-এর ২৫ মার্চের?

 

বেনজীর ভুট্টো : বিদ্রোহীদের ওপর সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউন কিংবা সামরিক এ্যাকশন শুরুর সময়কার।

কিন্তু সামরিক কমান্ডাররা তো ঐ সময় দাবি করেছিলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে? নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

 

বেনজীর ভুট্টো : আওয়ামী লীগের সাথে দরকষাকষির আলোচনার জন্য ১৯৭১-এর মার্চে ঢাকায় থাকাকালে একটা সময়ে আমার বাবা যে হোটেলে ছিলেন মুক্তিবাহিনী সে হোটেলটি সিল করে দিয়েছিল…।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

সে সময় মুক্তিবাহিনী ছিল না, ওরা ছিল পাকিস্তানী।

 

বেনজীর ভুট্টো : ওরা পাকিস্তানী? আমরা মনে করেছিলাম ওরা মুক্তিবাহিনী। আমি আসলে বলতে চাই, পাকিস্তানী সৈনিকরা উধাও হয়ে গিয়েছিল আর…।

আপনি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কথা বলছেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : তা নয়, আমি সশস্ত্র সামরিক লোকজনের কথাই বলছি।

এ রকম কোন সশস্ত্র সামরিক লোকজনের অস্তিত্ব তখন ছিল না।

 

বেনজীর ভুট্টো : সে জন্য আমি ওদেরকে বলছি মুক্তিবাহিনী। কেননা, আমি মুক্তিবাহিনী বলতে শেখ মুজিবুর রহমানের অনুসারীদের বোঝাতে চেয়েছি, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিল।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

মুক্তিবাহিনী তো অনেক পরের কথা…।

 

বেনজীর ভুট্টো : আমি আপনাকে এখন যা বলছি—তখন আমাকে এগুলো বলা হয়। ওখানে যে এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন চলছিল সে বিষয়ে আমাদের কখনও কোন সন্দেহ জাগেনি। আমাদের সে ধারণা হয়তবা ভুল তবু যা আমি শুনেছি তাই আপনাকে বলছি।

সশস্ত্র দেহরক্ষী বা যারা পরে মুক্তিবাহিনী হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে তারা চাঁদা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে দেয়, বিমানবন্দর ঘেরাও করে, আইন-শৃঙ্খলার বিষয় তদারকি শুরু করে দেয়। আর সবাই হোটেলের ভিতরে এসে আশ্রয় নেয়। ঐ রাতে আবার শেখ মুজিবের সাথে আমার বাবার বৈঠকের কথা ছিল। শেখ মুজিবও বলেছিলেন, তিনি ভুট্টোকে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক পাঠাবেন। আমার বাবা সেই লোকগুলোর জন্যই অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু ওরা আর আসেনি।

তারপরে আচম্বিতেই সে রাতের আঁধার আলোকিত হয়ে ওঠে। গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। সকলেই বুঝতে পারে, একটা কিছু ঘটেছে কিন্তু ঠিক কী ঘটেছে তা সত্যিই কেউ নিশ্চিত হতে পারছিল না। পরে আমার বাবাকে ঐ হোটেল থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সে সময়ই তাঁর সুবিখ্যাত উক্তিটি করেন, “খোদা মেহেরবান, পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে!”

অনেকেই ভেবেছিলেন, লোকজনকে নিরস্ত্র করতে সংক্ষিপ্ত সামরিক এ্যাকশন নেয়া হলে নিঃশ্বাস ফেলার একটা সময় হাতে পাওয়া যাবে। কিন্তু সামরিক এ্যাকশন যখন শুরু হলো তখন আমরা যারা পাকিস্তানে ছিলাম, এ ব্যাপারে তেমন কিছুই জানতে পারিনি। কেননা, এ সময়ে আমাদের খবরের কাগজগুলোতে ছিল কড়া সেন্সরশিপ। তবে সময় এগুতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে এক মাসের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম আসলে কী সব ঘটছে তা নিয়ে আমার বাবা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

ঐ নয় মাসের গোটা সময়টা কি পাকিস্তানে না দেশের বাইরে ছিলেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : দেশের বাইরে ছিলাম।

বিদেশী পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম তো তাহলে আপনার হাতের নাগালেই ছিল।

 

বেনজীর ভুট্টো : ঠিক, কিন্তু আমি বাবার কাছে যা শুনেছি সেটিই বলছি। আমি যখন পাকিস্তান সম্পর্কে ধারণার কথা বলি সেগুলো আমার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের কথা। এখন আমার একান্ত পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে একাত্তর নিজের ধারণা কী তাও আমি বলতে পারি, তবে তার আগে আমার বাবার কথাই শেষ করতে দিন।

তিনি পাকিস্তানে ফিরে এলেন। আর এক মাসের মধ্যেই তিনি উদ্বিগ্ন, অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে উঠলেন। পাকিস্তানী সংবাদপত্রে বাংলাদেশের ঘটনার খবর না থাকলেও বিদেশী পত্রপত্রিকায় যে সব রিপোর্ট বাংলাদেশের ওপর থাকত সেগুলোকে আমরা নির্বোধের মতো ভারতীয় প্রচারণা বলে মনে করতাম। আমরা পাকিস্তানীরা এমন এক বিশেষ ফ্যাশনে মানুষ যাতে করে সবকিছুই আমাদের কাছে ভারতীয় প্রচারণা বলেই মনে হতে থাকে।

বাংলাদেশ থেকে আসা যে সব ছেলেমেয়ে এখানকার স্কুলে ভর্তি হয়েছিল, যে সব লোক আমাদের জানাশোনা তাদের সকলেই নানারকমের ভয়াবহ বিভীষিকাময় কাহিনী আমাদের শোনায়। কেমন করে একজন সামরিক অফিসার ও তাঁর স্ত্রীকে কেটে ছয় টুকরো করা হয়েছিল, কারও চোখ তুলে নেয়া হয়েছিল, ইত্যাকার লোমহর্ষক কাহিনী…।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

এ সব লোকজনের বাংলাদেশে রয়ে যাওয়া আত্মীয়রা এখানে চলে আসতে থাকার সাথে সাথে এ সব কাহিনীও পাহাড় হয়ে উঠতে থাকে। কাজেই এ ছিল এক ভয়ানক দ্বৈরথ। আবেগ-উত্তেজনা চলতে থাকে চরম মাত্রায়।

১৯৭১-এর সেপ্টেম্বরে আমার বাবা প্রকাশ্যে সামরিক এ্যাকশন অবসান ও সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান। পাকিস্তানে তিনিই প্রথম রাজনৈতিক নেতা যিনি এ কাজটি করেন ও এ ধরনের বিবৃতি দেবার জন্য প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন। ফলত রাজনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের তাঁর এ আহ্বানে কেউ সেদিন কান দেয়নি।

একাত্তরের ডিসেম্বরে তিনি এক পাকিস্তানী প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে নিউইয়র্কে আসেন। আমরা তখন পিয়ের হোটেলে ছিলাম। ভয়ানক উদ্বিগ্ন আমার বাবা তখন যে কোন প্রকারে একটা সমাধান চাচ্ছিলেন। তাঁকে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা উভয় দায়িত্বে যুগপৎ বহাল করা হয়— যদিও তিনি এ জন্য আনুষ্ঠানিক শপথ নেননি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ওরা চেয়েছিল আমি শপথ নেবার পর এখানে আসি।

সে ক্ষেত্রে এখানে আমার সমর্থক মহলের অস্তিত্ব থাকত না, কেননা আমি ছিলাম পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধি। বাবা আমায় বলেছিলেন, তিনি এ জন্য শপথ নেননি যে ওরা যা করছে তাদের একজন তিনি হতে চাননি। তিনি বলেন, আমি যদি ঐ শপথ নিতাম তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

তিনি আরও বলেন, দেশের একত্ব বাঁচানোর জন্য পাকিস্তানের প্রয়াস আমি ঠেলে ফেলতে পারি না, আবার যুগপৎ আমি নিজেকে এ বাস্তবতা থেকে দূরে রাখতে চাইছিলাম যে, সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে যাওয়া হচ্ছে না, অথচ এরকম একটা পর্যায়ে এখন এসে গেছে।

আমি বাবার সাথে জাতিসংঘে যেতাম। একটা বিষয় ঐ সময়ে পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, বিশেষ করে সোভিয়েত প্রতিনিধি দলের লোকেরা তাদের ভাষণ ইচ্ছা করে লম্বা করার কৌশল অবলম্বন করে, কারণ তারা ঢাকার পতন দেখতে চায়। যেদিন আমার বাবার জাতিসংঘে ভাষণ দেবার কথা সেদিন তারা আবার তাদের ফিলিবাস্টারিং শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে আমার বাবা বক্তৃতা করার জন্য যে সব নোট তৈরি করেছিলেন তা ছিড়ে ফেলেন। তবে পোলিশ প্রস্তাবটি তিনি ছিড়ে ফেলেননি বলেই কিছু লোক জানায়। আমি তাঁর ঠিক পিছনেই বসে ছিলাম।

তাঁকে আমি অত্যন্ত আবেগময় ভাষণ দিতে শুনি। তিনি বলেন যে, “আপনারা এখানে সকলে ইচ্ছামতো প্রলম্বিত বক্তৃতা করছেন, আপনারা এখন কি লাঞ্চ করার জন্য বিরতি থাকবে, চায়ের জন্য সভা বন্ধ থাকবে। কিংবা কিছুটা বিশ্রাম নেয়া যাক’—এ ধরনের অনাবশ্যক কথাবার্তার তুবড়ি ছুটিয়ে চলেছেন যখন মানুষ মারা যাচ্ছে, ওদের হত্যা করা হচ্ছে।” তিনি বলেছিলেন, আপনাদের এ রকমটা প্রত্যাশিত নয় কারণ, বাস্তবতা বদলে যাচ্ছে।”

তিনি বক্তৃতা দেবার পর বেরিয়ে গেলেন, সামনের সারির আসনের লোকজন তাঁর পিছু নিল। আমি পিছনের সারি থেকে উঠে তাদের অনুসরণ করলাম। সকলে আমরা ফিরে গেলাম পিয়ের হোটেলে। সেখানে সংবাদপত্র ও অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমের লোকজনকে কী বলতে হবে তিনি তার ডিক্টেশন দিলেন। এরপর তিনি একান্তে থাকতে চাইলেন। আমরা দু’জনে নিরিবিলি হতে তিনি বললেন, চলো, আমরা একটু ঘুরে আসি। আমরা পিয়ের হোটেলের কাছাকাছি এলাকায় কিছু সময় ঘোরাফেরা করলাম।

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

বাবাকে অত্যন্ত বিচলিত ও বিমর্ষ মনে হলো। তিনি বললেন, মনে হলো ওরা সবাই অপেক্ষা করছে কখন ঢাকার পতন ঘটবে। আমরা বোধ হয় এখন আমাদের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্ন তথা মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। ঐ দিন তাঁকে খুবই বিমর্ষ মনে হলো। হাজার হোক তিনি সেই মানুষটি যিনি ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা আদর্শভরা দিনগুলোর মাঝে বড় হয়েছেন।

তিনি এ কথাও উপলব্ধি করলেন, বাঙালীদের প্রতি যথেষ্ট অবিচার করা হয়েছে। আমরা যখন ছোট তখন ভাষা প্রশ্নে তাঁর অভিমত ছিল, হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা গ্রহণ করুন কিংবা চারটি প্রদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন ভাষা সম্ভব হলে বেছে নিন। কেননা, এদেশের মানুষ ইংরেজী বলতে ও তাদের দেশী ভাষা বলতে জানত। ঐ সময় কেমন করে উর্দুতে কথা বলতে হয় ওরা জানত না।

এ অবস্থায় বাঙালীরা মনে করতে থাকে, আমাদের ছেলেরা চাকরি-বাকরি পাবে না, কেননা তারা পরীক্ষায় ভাষার কারণে পাস করতে পারবে না, কেইবা ওদের চাকরি দেবে… ওরা তো উর্দু জানে না। এ রকমই একটা অনুভূতি ছিল ভাষা গোলযোগের সময়টায়।

তিনি এও উপলব্ধি করেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠকে শাসন ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করাটাও খুবই অন্যায়। তাঁর ধারণা প্যারিটি বা দেশের দুই অংশের মধ্যে সমতা নীতির তত্ত্ব দিয়ে আমরা বাঙালীদের প্রতি অবিচার করেছিলাম। কেননা, কার্যত আমরা বলতে চেয়েছিলাম “তোমাদের আমরা সমান পাকিস্তানী হিসাবে মানি না…।”

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

আমি রাওয়ালপিন্ডির পেশোয়ার রোডে আমার বাবার সাথে থাকতাম। আমাদের আরও একটা বাড়ি ছিল সিভিল লাইন্সে। আমাদের কাছের পড়শী ছিলেন খাজা শাহাবুদ্দিন ও বগুড়ার মোহাম্মদ আলীরা। আমার মনে আছে আমি তখন খুব ছোট। মায়ের সাথে টি পার্টিতে বেগম শাহাবুদ্দিন এলে আমি সেখানে থাকতাম। তাঁর বিড়ালের আঁচড় দেয়া দাগ এখনও আমার হাতে আছে। বিড়াল বেগম শাহাবুদ্দিনের খুব শখের। আমিও বিড়াল খুবই পছন্দ করতাম।

তাঁদের বাড়িতে অনেকে বেড়াতে আসত। সেখানে দেখা হলে তারা আমার মাকে অনুযোগ জানাত “জানো নুসরাত, ওরা আমাদের পাকিস্তানী মনে করে না। পাকিস্তানীর মতো আচরণ করে না। কিন্তু কেন ওরা আমাদের বিশ্বাস করে না। আমরা তো আর সকলের মতোই পাকিস্তানের জন্য লড়াই করেছি। অথচ ভাবে মনে হয় আমরা পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।” বিদ্যালয়গুলোতেও এ রকম একটা মনোভাব ও অনুভূতি কাজ করত। স্কুলের শিক্ষকরা

বলতেন, পূর্বাঞ্চলের লোকরা ভাত খায়, আকারে খাটো; পশ্চিমের লোকের খাদ্য গম, ওরা লম্বা-চওড়া। এগুলো সত্যিই অত্যন্ত স্থূল রকমের বর্ণবিদ্বেষ। শিশু হয়েও আমি অনুভব করতে পারতাম, ব্যাপারটা অন্যায়। বড় হয়ে বুঝলাম বাঙালীরা কী বলে, বলতে চায়। এটি আমি বুঝেছি বড় হয়ে প্রধানমন্ত্রী হবার পর। আর সে উপলব্ধি হলো—আরেকজন যেমন, ঠিক আমিও তেমনি একজন পাকিস্তানী।

আমি পাকিস্তানী হতে চাই না তা নয় বরং তুমি আমাকে সেই একইভাবে গ্রহণ কর না। পরিতাপের বিষয়, একটা যেন বর্ণ বৈষম্য রয়েই গেছে। আমি আমার শৈশবে যা শুনেছি আর যা বুঝিনি তা এখন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছে। আমি মনে করি, পাকিস্তান যদি ভাঙে সেজন্য পশ্চিমাঞ্চলের হঠকারিতাই দায়ী।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

বাঙালীরা একান্তই পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চেয়েছে। তবে ওরা এক লোক, এক ভোট চায়। আমরা ওদেরকে তা দিতে প্রস্তুত নই। আজকে আমি মনে করি এ কারণেই বাংলায় গোলযোগ শুরু হয়। আমরা বলেছিলাম, জমির ব্যাপারটাও হিসাবে নিতে হবে। তোমাদের জমি আমাদের চেয়ে কম।

এরপর বেলুচিস্তানে গোলযোগ দেখা দেয়। এ ঘটনা ঘটে বাংলাদেশের ঘটনার পরবর্তীকালে। আমরা বেলুচিস্তানকে বলেছিলাম, বেশ, এক লোক এক ভোট হোক। বেলুচিস্তানের জবাব ছিল, বেশ, জমির ব্যাপারটা তাহলে কী? তোমরা যতগুলো প্রদেশ সব যোগ করার পরও তো জমি আমাদের বেশি। আমাদের কথা ছিল—আমরা জমির ব্যাপারটা হিসাবে নেব না, এক লোক এক ভোট দেব।

এখন আমাদের তৃতীয় আদমশুমারিতে হয়ত আবারও আমরা গোলযোগে পড়তে যাচ্ছি। এর কারণ হলো, আমরা সিন্ধী, পাঞ্জাবী, বেলুচ, পাঠান বা মোহাজির যা-ই হই না কেন সেটি কোন বিষয় নয়; আমরা লাহোর, করাচী বা যে কোন জায়গায় বসবাস করতে পারি, আমরা সবাই পাকিস্তানী—এ কথা না বলে বরং লোক গণনার কারচুপির চেষ্টা করছে বাস্তবতাকে না মেনে নেবার জন্য। আর সেটিই আদত সমস্যা। যদি আমরা সবাই মেনে নিই, আমরা সবাই সমান পাকিস্তানী তাহলে কারও কোন এ ধরনের চিত্তবিকার থাকে না।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

বলা হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষকরা হিন্দু ছিল। বাঙালীরা ওদের কাছে শিক্ষা পেয়েছে। তাতে ওদের মুসলমানত্ব কমে গেছে।

 

বেনজীর ভুট্টো : আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর একই জিনিস লক্ষ্য করি। খবরের কাগজে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চলে যে, বেনজীর শতকরা ৭৫ জন হিন্দুকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করেছে। অথচ শিক্ষক নিয়োগে আমার করার কিছুই ছিল না। এমনকি কে চাকরির জন্য আবেদন করেছে, কে করেনি—এসব কিছুই আমি জানতাম না। এ ছাড়াও বিষয়টি প্রাদেশিক এখতিয়ারের। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বিষয়টি সত্যি নয়।

তবে বড় বাস্তবতা হলো এই যে, যদি প্রত্যেক নাগরিকই সমান হয়ে থাকে, এ ধরনের তারতম্য কেন হবে? দুর্ভাগ্যের বিষয়, কোন কোন মহলে এমন তারতম্য করা হয়ে থাকে। আমরা এ সবে বিশ্বাস করি না, কারণ, আমরা যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পদে নিই তখন কীভাবে ওসব জায়গায় এ সব ঘটছে কী করে জানা সম্ভব? আমরা তাই এ সব মেনে নিতে রাজি নই।

কিন্তু যদি আমরা একবার এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারি আমাদের নজরে পড়বে পাকিস্তানের শাসক ও কূলীন গোষ্ঠীর মাঝেই এ জিনিসটির অস্তিত্ব আছে যা কাজে লাগিয়ে তোলপাড় তোলা হয়, আর এ অবস্থায় আপনার রহস্য অজানা থাকার কথা নয়, কেন আপনারা হিন্দুকে শিক্ষক নিয়োগ করেন?

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

তাহলে কি কুলীন শ্রেণীতেই এই জাতিগত পক্ষপাত ঘাপটি মেরে আছে?

 

বেনজীর ভুট্টো : আমার মনে হয় ঠিক কোথায় সেটি আছে সে প্রশ্ন আপনার, বাঙালীদেরই করা উচিত।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস সম্প্রতি জেনারেল নিয়াজির যে বই প্রকাশ করেছে সেটি আপনি দেখেছেন বা পড়েছেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : আমি তাঁর বই পড়িনি। তবে হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট পড়বার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি মনে করি, এ রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুতরভাবে জেনারেল নিয়াজীর প্রতিকূলে গেছে। এ কারণেই জেনারেল নিয়াজীর কী বলার আছে তার চেয়ে বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে নিরপেক্ষ কমিশন কী বলে, সেটিই বরং আমি দেখব। স্পষ্টত জেনারেল নিয়াজী মনে করেছেন, মানুষ অতীতকে ভুলে গেছে। আর তিনি তাঁর পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। তবু হামুদুর রহমান কমিশন কী বলে বরং সেটিই আমার বিবেচ্য।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

পাকিস্তান সরকার হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট প্রকাশ করছে না। আপনিও তো দু’বার ক্ষমতায় ছিলেন, আপনিও তা করেননি, কেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : দেখুন, জনসাধারণ এ জন্য তেমন চাপ সৃষ্টি করেনি, হৈ চৈ তোলেনি।

হৈ চৈ তোলা হলে কি প্রকাশ করতেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার পর আমি নিজে পড়ে দেখার জন্য হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টের একটি কপি চাই। তবে কোন কপি আমি পাইনি। আমি জানি না রিপোর্টের কপিগুলো নিয়ে জেনারেল জিয়া কী করেছেন?

আমার বাবা এ রিপোর্ট প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন বলে আমি জানি। তবে সামরিক কর্তৃপক্ষ এর প্রকাশনার ব্যাপারে আপত্তি জানায়। আমার মনে হয়েছিল, আমরা এখন পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীকে নতুন করে গড়ে তুলছি, সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি।

এ অবস্থায় ১৯৭১-এর ঘটনাবলীকে আবার টেনে তুলে সেনাবাহিনীকে এমন আলোকে দেখাব না, যা এর পুনর্সঞ্জীবিত করার প্রতিকূল হবে। আমি এর আগে বলেছি, যুদ্ধ এক কদর্য কাজকারবার, এ রকম কদর্য, কুৎসিত ঘটনা যুদ্ধে ঘটে থাকে, তাই এগুলো দুর্ভাগ্যজনক।

এরপর জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় আসেন। তিনি এ রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু কখনও তিনি তা করেননি কারণ সামরিক বাহিনী কখনও ঐ রিপোর্ট প্রকাশিত হোক চায়নি। অবশ্য আজকের সামরিক বাহিনী এতে কিছু মনে করবে না। মনে হয়, পাকিস্তানের আজকের সেনাবাহিনী কিছুটা বেশি আলোকপ্রাপ্ত… আমি সামরিক বাহিনী বলতে এর গোয়েন্দা অংশ বাদ দিয়েই বলছি। যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলাম এটি প্রকাশের জন্য কোন চাপ ছিল না। জনসাধারণ কোনভাবে এগিয়ে চলেছিল।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

আগামীতে কি আপনি এটি প্রকাশ করবেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : তাহলে ব্যাখ্যা করেই বলি। ঐ সময় মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয় যে, ২৫ বা ৩০ বছরের বেশি পুরনো কাগজপত্র জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে। তবে ঐ সিদ্ধান্ত নওয়াজ শরীফ উল্টে দেন। ঐ সিদ্ধান্ত এখন বলবত। আমি মনে করি ২৫ বছরেরও বেশি কিংবা ৩০ বছরের মতো ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে।

আমি হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টের একটা কপি চেয়েছিলাম। আমাকে বলা হয়, রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না। আমি যদি সঠিকভাবে মনে করতে পেরে থাকি তাহলে আমি বলব ঐ রিপোর্টের মূলত তিনটি কপি ছিল। একটি কপি ছিল সুপ্রীমকোর্টে, আরেকটি কপি ছিল যে কর্তৃপক্ষ কমিশনকে তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য, এখতিয়ার নির্ধারণ করে দেয় তাদের কাছে আর তৃতীয় কপিটি তখনকার প্রধানমন্ত্রী – আমার বাবার কাছে।

কোট লাখপতের কারাগারে থাকতে আমার বাবা এজিএন কাজীর কাছ থেকে একটি চিঠি পান। তিনি নিজে বা জেনারেল জিয়া হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টের ঐ কপিটি চান যা তাঁর (জনাব ভুট্টো) কাছে রয়েছে। আমার বাবা জানান, ঠিক আছে আমি ওটা আপনাকে দেব – তবে সেটি আমি ঐ কমিশন সদস্যদের উপস্থিতিতে দিতে চাই। কারণ আমি আশঙ্কা করছি যে, আপনারা ঐ রিপোর্টটিতে রদবদল করতে চলেছেন।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

তাঁর এ আশঙ্কা জাগার কারণ, তাঁর বিরোধীরা হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট ছাপার ব্যাপারে সামরিক বাহিনীর অনীহার সুযোগ নিয়েছিল তাঁর (জনাব ভুট্টোর) ঘাড়ে দোষ চাপানোর জন্য। তাই তিনি ঐ রিপোর্টের প্রতিটি পৃষ্ঠায় কমিশন সদস্যদের প্রত্যায়ন ও অনুস্বাক্ষর নেয়ার ব্যাপারে সবিশেষ উদগ্রীব ছিলেন যাতে প্রমাণিত হয় সেটিই মূল হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট। তিনি কাজীর পত্রের জবাব এভাবেই পাঠান। আমিও তাঁকে লিখি। কিন্তু কখনও কোন জবাব পাইনি।

আমার বাবা তখন আমাকে বলেন যে, ঐ রিপোর্টটি আমাদের বাড়ির অমুক জায়গায় একটা ব্রিফকেসে রয়েছে। তুমি ওখানে খুঁজলেই পাবে। আমরা মনে করেছিলাম, ওরা আমাদের বাড়িতে আসছে আর এসে বলবে, হ্যাঁ, ওটা আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে পেতে চাই। আমি ব্রিফকেসে রিপোর্টটি খুঁজে পাই। এভাবে ওটা ওখানে আছে নিশ্চিত হবার পর আমি তাদেরকে ওটা দিয়ে দেবার জন্য তৈরি হই। অবশ্য ওরা আর আসেনি।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

আমাকে, আমাদের সকলকে একের পর এক গ্রেফতার করা হয়। শেষে যে রাতে ওরা বাবাকে ফাঁসিতে লটকায় সেই রাতে আমাদের বাসায় হানা দেয় এবং ঐ রিপোর্টটি নিয়ে যায়। আমার ধারণা, কখনও যাতে ঐ রিপোর্ট সাধারণ্যে ফাঁস না হয়ে যায় সেটি নিশ্চিত করার জন্যই রিপোর্টটি ওরা নিয়ে যায়।

ঐ সময়ই রিপোর্টটি আমি পড়ে দেখেছি। কারণ, ঐ রিপোর্ট সম্পর্কে আমার আগে থেকেই কৌতূহল ছিল আর তাই ঠিক করলাম, এটি যখন হাতছাড়া হতে চলেছে একবার পড়ে নিই। ঐ সময়কার সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল। ঐ সময় সামরিক বাহিনীতে পদোন্নতির গোটা পদ্ধতিই ছিল ভিন্ন। আমি প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঠিক করি, পদোন্নতি একভাবেই হবে। কিন্তু অচিরেই লক্ষ্য করলাম, সময় বদলে গেছে।

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

জেনারেল নিয়াজীর বইয়ের ব্যাপারে আপনি কী যেন বলছিলেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : বইটি আমি পড়িনি। তবে আমি মনে করি, আমার কয়েক বছর আগে পড়া রিপোর্টটিতে জেনারেল নিয়াজী সম্পর্কে তীব্র ধিক্কার ও নিন্দামূলক কথাবার্তা ছিল।

যেহেতু এ রিপোর্ট নিয়ে এখন কথা উঠেছে, বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসাবে আপনি এটি প্রকাশ করার দাবি কি তুলবেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : অবশ্যই আমরা তা করতে পারলে খুশি হব। এখন অনেকটা সময় কেটে গেছে, পানিও গড়িয়েছে ঢের। হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট প্রকাশিত হলে আমি খুব খুশি হব। আমার বিশ্বাস, প্রকৃত ইতিহাসের সাথে জনসাধারণের একটা বোঝাপড়া হওয়া দরকার। হামুদুর রহমান কমিশন ছিল এক স্বাধীন, নিরপেক্ষ কমিশন। এর নেতৃত্বে ছিলেন একজন শ্রদ্ধেয় বিচারক যিনি এমনকি আমার বাবাকেও সমন পাঠিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় তুলেছিলেন ঘটনাবলী সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য রেকর্ড করার জন্য।

প্রকৃতপক্ষে, রিপোর্টটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক, কারণ, এটি কমিশনের একটি রিপোর্ট আর লোকজন কী বলেছে তাও ঐ রিপোর্টে রয়েছে। সেখানে ঐ রিপোর্ট সত্যিকার অর্থে ইতিহাসে নতুন কিছু সারবস্তু যোজনা করবে। এ কমিশনে যে সব ব্যক্তি সাক্ষ্য দেন তাঁদের কেউ জানতেন না, অন্যজন কী বলেছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু কমিশনের সদস্যরা। রিপোর্টটি জনসমক্ষে প্রকাশ না করার বিষয়টি ইতিহাসবিদদের জন্য এক বড় ধরনের বিপর্যয়।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকার দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার ব্যাপারে কী কী করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

 

বেনজীর ভুট্টো : আমার মনে হয়েছিল দু’দেশের সাধারণ মানুষ পর্যায়ে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্কের উন্নতি হওয়া উচিত। তবে আমার এও উপলব্ধি ঘটে যে, সার্কের মাধ্যমে একযোগে কাজ করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সার্ক দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি আনার জন্য আমি কয়েকটি ব্যবস্থার ব্যাপারে পথিকৃতের কাজ করেছিলাম। এ সবের অন্যতম ছিল পার্লামেন্টারিয়ান ও জজদের মতো এক সেট লোকের জন্য সাধারণ পাসপোর্টের ব্যবস্থা যাতে তাঁরা সার্ক দেশগুলোতে কোন ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন। এ ব্যবস্থাটি আজ বাস্তবায়িত হয়েছে।

দ্বিতীয় যে জিনিসটি আমি গ্রহণ করেছিলাম ও পরবর্তীকালে যে পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয় সেটি হলো একটি অভিন্ন সার্ক এনভেলপ প্রবর্তন, যাতে সার্ক দেশগুলোর লোকেরা পূর্বে মূল্য পরিশোধিত ডাকটিকিট সম্বলিত খাম ব্যবহার করতে পারবে। আর এ খাম হবে সকল সার্ক দেশে একইরূপ।

দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল দক্ষিণ এশীয় অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক প্রথা অনুমোদন। আমি মনে করি সার্ক দেশগুলোর অভিন্ন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক ভিত্তিতে এ ধরনের অগ্রাধিকার শুল্কপ্রথা প্রয়োজনীয়।

 

Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
Benazir Bhutto, Former Prime Minister of Pakistan, File Photo, বেনজির ভুট্টো, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

আমি তো এই সম্পর্কের বিষয়টি আরও বেশি করে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতেই ভাবছিলাম।

বেনজীর ভুট্টো : আমার ধারণা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও বেশ ভাল। আমরা আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই কামনা করি। তবে পাকিস্তান ও ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষার বেলায় বাংলাদেশ একটা ভারসাম্য রাখতে চায়– আমার এ কথা ভুল হতেও পারে, তবে আমার ধারণা এটাই। আমরা একটা কনফেডারেশন করে আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারি।

আমরা বোধহয় গোটা আলোচনার শেষে পৌঁছেছি। আলোচনাটি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক সন্দেহ নেই।

 

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

 

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন