রক্তঝরা ফিলিস্তিন ইতিহাস

This post is also available in: বাংলাদেশ

রক্তঝরা ফিলিস্তিন ইতিহাস: ফিলিস্তিনিরা হতভাগা প্রচুর । তারা প্রায় এক শতক ধরে নিজেদের ভূখণ্ডে দখলদার ইহুদিদের হাতে মার খাচ্ছে। প্রজন্ম পর প্রজন্ম ঝরছে ঝরাচ্ছে রক্ত। আকাশ ছুঁয়েছে লাশের পাহাড় । আজও মরছে ফিলি-স্তিনিরা। ফিলি-স্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। আরব মুসলমানেরা ছিল সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। উনিশ শতকের শেষ দিকে জায়নবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে। ইহুদিদের চোখ পড়ে আরব ভূখণ্ডে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা ফিলিস্তিনে এসে বাসা বাঁধতে থাকে। তাদের সংখ্যা ক্রমে বাড়ে। সবকিছুর উদ্দেশ্য—আরব ভূখণ্ড দখল করে ‘আবাসভূমি’ গড়ে তোলা। বিশ শতকের শুরুর দিকে অটোমান সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের প্রভাব বাড়ায়। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানদের বিরুদ্ধে আরবদের বিদ্রোহে নামায় ব্রিটিশ সরকার। ফিলি-স্তিনি ভূখণ্ডে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইহুদিদেরও গোপনে আশ্বাস দেওয়া হয়।

১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার বেলফোর ঘোষণায় ফিলিস্তিনে ‘ইহুদিদের একটি জাতীয় বাসস্থান’ প্রতিষ্ঠায় সমর্থন জানায়। অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হলে ফিলিস্তিনির ম্যানডেট পায় ব্রিটিশরা। অভিবাসী ইহুদি ফিলি-স্তিনে দলে দলে আসতে থাকে। বিরোধিতা করার পরেও সেখানে তাঁরা তাদের বসতি গড়ে তোলে। এরপর ১৯২০, ’২১, ’২৮, ’২৯ ও ’৩৬ সালে আরবদের সঙ্গে ইহুদিদের সংঘর্ষ হয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির ক্ষমতায় এলে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়। সেখানকার ইহুদিরা পালিয়ে ফিলি-স্তিনে আসে। ফিলি-স্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের তত্পরতা আরও বেড়ে যায়। ব্রিটিশ শাসন ও ইহুদি দখলদারির বিরুদ্ধে ১৯৩৬-১৯৩৯ সালে সংঘটিত হয় আরব বিদ্রোহ। ওই বিদ্রোহ দমন করা হয়। নিহত হয় পাঁচ হাজার আরব।

 

রক্তঝরা ফিলিস্তিন ইতিহাস

 

রক্তঝরা ফিলিস্তিন ইতিহাস

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর,

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলি-স্তিন নিয়ে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে বৈরিতা বেড়ে যায়। ফিলি-স্তিনের ওপর ম্যানডেট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ সরকার। একই সঙ্গে এই ভূ-ভাগ্য নির্ধারণে সদ্যগঠিত জাতিসংঘকে অনুরোধ জানানো হয়। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনিকে দ্বিখণ্ডিত করে পৃথক ইহুদি ও আরব রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দেয়। আরবদের বিরোধিতা সত্ত্বেও পরিকল্পনাটি এগিয়ে যায়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নীলনকশায় ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনির ম্যানডেট ছেড়ে দেয়। ওই দিনই ইহুদি নেতারা ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেন। পরদিন আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হয়। উপরন্তু প্রস্তাবিত আরব রাষ্ট্রের একটা বড় অংশ দখল করে ইসরায়েল। সাড়ে সাত লাখ ফিলি-স্তিনি শরণার্থী হয়।

মিত্রদের সহযোগিতা ও আশকারায় দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে ইসরায়েল। ষাটের দশকে পারমাণবিক বোমার মালিক বনে যায় তারা। দখলদারি ও বর্বরতার ব্যারোমিটার বাড়তে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরায়েলের একগুঁয়েমি ও নৃশংসতায় ফিলিস্তিনে রক্তগঙ্গা বইতে থাকে। আরব-ইসরায়েলের মধ্যে ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে আরও তিনটি যুদ্ধ হয়। এতে ফিলি-স্তিনের ভাগ্যে দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই জোটেনি।

 

রক্তঝরা ফিলিস্তিন ইতিহাস

 

মুক্তির সংগ্রাম,

মুক্তির সংগ্রামের লক্ষ্যে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও)। ১৯৬৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ইয়াসির আরাফাত ছিলেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান। তিনি ফিলিস্তিনের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দল ফাতাহরও নেতা ছিলেন। ইসরায়েলি দখলদারির অবসান ঘটিয়ে ফিলি-স্তিনকে স্বাধীন করতে ১৯৮৭ সালে গঠিত হয় হামাস। তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক শাখা রয়েছে। কট্টরপন্থী সংগঠনটি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না।

ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে ফিলিস্তিনের দুই অংশ পশ্চিম তীর ও গাজা ২০০৭ সালের আগস্টে চলে যায় দুটি দলের নিয়ন্ত্রণে। সেই থেকে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে ফাতাহ পশ্চিম তীরে ও খালেদ মেশালের নেতৃত্বে হামাস গাজা শাসন করছিল। এই অবস্থায় গত এপ্রিলে দুই দলের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। সে অনুযায়ী নতুন করে নির্বাচনের পর চলতি বছরের শেষ নাগাদ একটি জাতীয় সরকার গঠনের কথা। কিন্তু হামাস-ফাতাহর চুক্তিকে ভালোভাবে নেয়নি ইসরায়েল। তাদের মতে, হামাস একটি জঙ্গি সংগঠন। হামাস-ফাতাহ জাতীয় ঐক্যের সরকার হলে সেই সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যাবে না বলে জানিয়ে দেয় ইসরায়েল।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য,

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ পর্যন্ত নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। বরং দশকের পর দশক ধরে সেখানে নতুন মাত্রায় সংঘাত জন্ম নিয়েছে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলার সূত্রপাত ৮ জুলাই। ইসরায়েলি তিন কিশোরকে সম্প্রতি অপহরণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই হামলা শুরু হয়। হামাসই ওই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে মনে করে ইসরায়েল। তবে হামাস তা অস্বীকার করেছে। পরে ফিলি-স্তিনি এক কিশোরকে একইভাবে হত্যা ও অপহরণের পর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এরপর গাজা থেকে রকেট ছোড়া হচ্ছে—এমন দাবি তুলে ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ শুরু করে ইসরায়েল।

ফিলি-স্তিন-শাসিত গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের প্রায় একতরফা বর্বর হামলা আজ বুধবার ষোড়শতম দিনে গড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয় শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে তিন সহস্রাধিক। হতাহত ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে। ইসরায়েলের চলমান হামলার প্রেক্ষাপটে এক লাখের বেশি ফিলি-স্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরে চলছে নানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। এর আগে ২০১২ সালের নভেম্বরে গাজায় অভিযান চালায় ইসরায়েল। তখন আট দিনের মাথায় মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় ফিলিস্তিন। এর আগে তারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘পর্যবেক্ষক ভূখণ্ড’ হিসেবে যোগ দিত। কিন্তু এখন ‘সদস্য নয় এমন পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এই রায়কে সার্বভৌম ফিলি-স্তিনের ‘জন্মসনদ’ বলে অভিহিত করেছেন। ফিলি-স্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে। আর কত রক্ত ঝরলে, লাশের মিছিল কতটা দীর্ঘ হলে, তাদের ভূখণ্ড স্বপ্নের স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ধরা দেবে—তা এখনো অজানা।

 

রক্তঝরা ফিলিস্তিন ইতিহাস

 

আরও দেখুনঃ

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন