লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাখো মুসল্লির কন্ঠে

This post is also available in: বাংলাদেশ

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাখো লাখো কণ্ঠে মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুক্রবার পালিত হলো পবিত্র হজ। এদিন লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর আরাফাত ময়দানে সমবেত হন। তাঁদের সকলের কণ্ঠে ছিল

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্‌দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্‌ক, লা শারিকা লাক’ (আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার)।

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাখো মুসল্লির কন্ঠে

 

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাখো মুসল্লি কন্ঠে

 

শুক্রবার সূর্যাস্তের আগপর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকেন হাজিরা। দুই মাইল দৈর্ঘ্য ও দুই মাইল প্রস্থের এ ময়দানের তিন দিক পাহাড়বেষ্টিত। ৮ জিলহজ এশার নামাজের পর আরাফাতে যাওয়ার গাড়িগুলো আসতে শুরু করে। অনেকেই পবিত্র কোরআন শরিফ, হাজি ম্যাট ও কিছু ব্যবহার্য সামগ্রী নিয়ে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওনা দেন। আরাফাতের ময়দানে হাজার হাজার তাঁবু টাঙানো আছে। তবে এগুলো অস্থায়ী।

শুক্রবার সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে রওনা হন আরাফাতের ময়দানের দিকে। ট্রেনে, বাসে ও হেঁটে তাঁরা এই ময়দানে হাজির হন। তাঁদের কণ্ঠে ছিল ওই একটাই রব, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’ আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে হাজিরা কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ সুবিধাজনক জায়গায় বসে ইবাদত করেন। কেউ যান জাবালে রহমতের কাছে। আবার কেউ যান মসজিদে নামিরায় হজের খুতবা শুনতে। মূলত (সৌদি আরবের স্থানীয় সময় অনুযায়ী শুক্রবার ) ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে হজ পালন করা হয়। এ ময়দানে উপস্থিত হওয়া হজের অন্যতম ফরজ। পবিত্র হজ ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। আর্থিকভাবে সমর্থ ও শারীরিকভাবে সক্ষম পুরুষ ও নারীর জন্য হজ ফরজ।

আরাফাতের ময়দানে হাজিরা তাঁবুর ভেতরে নামাজ আদায় করেন। সেখানেই নামাজ, দোয়া-দরুদ, কোরআন শরিফ তিলাওয়াতসহ অন্যান্য ইবাদত–বন্দেগি করেন। প্রতিটি তাঁবুর সামনেই খাওয়ার পানির পাত্র রয়েছে। কিছু দূর পরপর একসঙ্গে বেশ কয়েকটি শৌচাগার। পুরুষ ও নারীদের জন্য তা আলাদা। শৌচাগারগুলোর দুই প্রান্তে অজু করার জন্য কয়েকটি করে ট্যাপ আছে। অনেকেই ট্যাপগুলো থেকে পানি নিয়ে গোসল সেরেছেন।

আরাফাত ময়দান মিনা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এ ময়দানে অবস্থিত মসজিদটির নাম মসজিদে নামিরাহ। এই মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণকারী হাজিরা জুমার ওয়াক্তে এক আজানে দুই ইকামতের সঙ্গে একই সময় পরপর জুমা ও আসরের নামাজ আদায় করেন। নামাজের আগে ইমাম সাহেব খুতবা দেন। হাজিদের জন্য পরবর্তী কাজ ছিল, সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা দেওয়া। আরাফাত থেকে মুজদালিফা যাওয়ার পথে মাগরিবের নামাজের সময় হলেও নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। সেখানে পৌঁছার পর মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে পড়েন হাজিরা। মুজদালিফার খোলা প্রান্তরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়। কারণ, এই মুজদালিফার খোলা প্রান্তরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও আদি মাতা হজরত হাওয়া (আ.)। এ মাঠেও কিছুদূর পরপর শৌচাগার রয়েছে।

শয়তানের উদ্দেশ্যে পরপর তিন দিন ছুড়তে ৭০টি পাথর সংগ্রহ করতে মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব। ফজরের নামাজ পড়ে দোয়া–দরুদ পড়ে সূর্যোদয়ের কিছু আগে মিনার উদ্দেশে রওনা দেওয়া ও পরে বড় জামারায় গিয়ে শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপ করা তাঁদের পরবর্তী কাজ। জামারা হলো মিনা ময়দানে অবস্থিত তিনটি স্তম্ভ। এগুলোর নাম জামারাতুল উলা বা ছোট জামারা, জামারাতুল উসতা বা মধ্যম জামারা ও জামারাতুল কুবরা বা বড় জামারা। পাথর নিক্ষেপ–পরবর্তী কাজ হলো দমে শোকর বা কোরবানি করা। হাজিরা কোরবানির টাকা নির্ধারিত ব্যাংকে আগেই জমা দেওয়ায় কোরবানির জন্য নির্ধারিত স্থানে যেতে হবে না। জামারা থেকে বেরিয়ে পুরুষ হাজিদের মাথা মুণ্ডন করতে হয়।

পবিত্র মসজিদুল হারামের চত্বরের এক প্রান্ত থেকে একটা পায়ে চলা পথ জামারার দিকে চলে গেছে। রাস্তাটির বেশির ভাগ অংশ পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা টানেল। এই রাস্তার নাম আল রাহমাহ স্ট্রিট বা সহজে চেনার জন্য পায়ে হাঁটার পথ। টানেলের ভেতর পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা আছে। মাথার ওপর বিশাল আকারের ফ্যান। সেগুলো থেকে বাতাস ছড়িয়ে পড়ে। এ টানেল ছাড়াও গাড়িতে যাতায়াত করা যায়।

হাজিরা মিনায় দুই দিন অবস্থান করে নিজ তাঁবুতে সময়মতো নামাজ আদায় করবেন। হজের অন্য আনুষঙ্গিক কাজ, যেমন: প্রতিদিন জামারায় তিনটি (ছোট, মধ্যম, বড়) শয়তানকে সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করবেন। মিনার কাজ শেষে আবার পবিত্র মক্কায় বিদায়ী তাওয়াফ করে নিজ নিজ দেশে ফিরবেন। যাঁরা পবিত্র মদিনায় যাননি, তাঁরা সেখানে যাবেন।

 

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাখো মুসল্লি কন্ঠে

 

পবিত্র মসজিদে নববীর জুমার খুতবা

পবিত্র মসজিদে নববীর জুমার খুতবা দেন খতিব শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান আল–হুজাইফি। খুতবায় পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে সারা বিশ্বের মুসলমানদের আল্লাহকে ভয় করে চলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে মুসলিমরা জীবনে কল্যাণ, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মৃত্যু–পরবর্তী জীবনে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নামের সব ধরনের শাস্তি থেকে মুক্তিলাভের মাধ্যমে সফলকাম হবেন।

খুতবায় মুসলিম উম্মাহর উদ্দেশে আলী বিন আবদুর রহমান আল–হুজাইফি বলেন, ‘আজকের এই দিন আমাদের ইসলামের পূর্ণতাদানের মাধ্যমে আমাদের ওপর আল্লাহ তাআলার পূর্ণ নিয়ামতের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়।’ তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ মুখস্থ, আত্মস্থ ও আয়ত্ত করার এমন শক্তি দান করেছেন, যা আগের কোনো জাতি প্রাপ্ত হয়নি—প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।

কারণ, হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর পর আর কোনো নবী আসবেন না এবং আল্লাহর তাওহিদ ও স্বচ্ছ ইসলামি আকিদা অনুধাবন, মুখস্থ, হৃদয়ঙ্গম ও সৎ আমল করার মাধ্যমে বৃদ্ধি পায়।’ খুতবায় আরও বলা হয়, জুমার দিন হলো সাপ্তাহিক ঈদ, আর আরাফার দিন হলো ইসলামের একটি ঈদ। দিনগুলোকে আল্লাহ তাআলা ইসলামের ঈদ করেছেন, তাতে ইবাদত ও আনুগত্যমূলক আমলের বিধান দিয়ে এবং মুসলিমদের মহাসমাবেশের মাধ্যমে ইসলামের মর্যাদা ও শক্তির প্রতীকও করেছেন।

মহানবী (সা.)–এর আরাফার খুতবাকে উদ্ধৃত করে আলী বিন আবদুর রহমান আল–হুজাইফি বলেন, মহানবী (সা.) নারী অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা ইসলাম বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছে। কাজেই ইসলাম নারীকে পূর্ণ অধিকার দিয়েছে, যা তাঁর ইহকাল এবং পরকালের উপকার ও সুরক্ষা দেয়। পক্ষান্তরে মানব রচিত বিধান তাঁকে পার্থিব কিছু উপকার দিয়েছে বটে, কিন্তু তাঁকে আত্মমর্যাদা, সম্মান ও সংযম থেকে বঞ্চিত করেছে। আরাফার খুতবায় মহানবী (সা.) সব ধরনের সুদ, অন্ধকার যুগের বদলা, প্রথা ও আচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সেই সঙ্গে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাত আঁকড়ে থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, এ দুটিই পথভ্রষ্টতা থেকে সুরক্ষা দেবে।

পরিশেষে খুতবায় আলী বিন আবদুর রহমান আল–হুজাইফি মুসলিমদের প্রতি ভালো কাজের প্রতিযোগিতা ও খারাপ কাজ বর্জনের মাধ্যমে তাকওয়া অবলম্বনের আহ্বান জানান।

 

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাখো মুসল্লি কন্ঠে

 

আরও দেখুনঃ

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন