সংঘাত প্রসূন [ Shanghat Prashun ] – আহমদ শরীফ [ Ahmed Sharif ]

This post is also available in: বাংলাদেশ

সংঘাত প্রসূন [ Shanghat Prashun ] – আহমদ শরীফ [ Ahmed Sharif ] : ছোটবেলায় শুনতাম “বিদেশী তাড়াও, সুখ আসবে’। বিদেশী বিতাড়িত হল, কিন্তু সুখ এল না। তারপরে শুনতাম ‘বিধর্মী হঠাও’ সুখ আসবে, দাঙ্গা-হত্যার মাধ্যমে তাও হয়েছিল আংশিকভাবে, কিন্তু সুখ এল না। শেষবার শুনলাম ‘বিভাষী বিতাড়নে সুখ আসবে। কিন্তু সুখ আসেনি, বরং যন্ত্রণা বেড়েছে নানাভাবে। ভাত-কাপড় ও নিরাপত্তার অভাব-প্রসূত যন্ত্রণাই মুখ্য। এ যন্ত্রণার মানস-উপশম নেই–কেননা, প্রবোধ পাবার আগেকার কারণগুলো অপগত। এখন যাঁদের শাসনে রয়েছি, তাঁরা আমাদের স্বদেশী স্বধর্মী স্বজাতি আত্মীয়-বন্ধু ও ভাই। না পারি পর ভারতে, না পারি গালি পাড়তে।

 

সংঘাত প্রসূন - আহমদ শরীফ
সংঘাত প্রসূন – আহমদ শরীফ

 

তাহলে শাসক বদলালেই সুখ আসে না। স্বজন হলেই স্বস্তি মেলে না। সুখের ভিত্তি ও স্বস্তির কারণ রয়েছে অন্যত্র। সেই ভিত্তি ও কারণ সম্পর্কে নানাজনের নানা মত। তবে সুখ-স্বস্তি-স্বাচ্ছন্দ্য সবার কাম্য এবং তা কালগত এ ধারণা আজকাল কমবেশি প্রায় সবাই পোষণ করে। সত্য-ন্যায়-নীতি-আদর্শ এবং রীতি-পদ্ধতির চিরন্তনতা, অনপেক্ষতা কিংবা দেশান্তরে ও কালান্তরে ঐগুলোর অভিন্নতার তত্ত্ব আজ আর বিশেষ স্বীকৃত নয়। সমস্যা যে জীবনের নিত্যসঙ্গী এবং চলমানতার অনুষঙ্গী তাও আজ আর অস্বীকৃত নয়। নতুন কাল ও নতুন জীবনমাত্রই নতুন সমস্যার নামান্তর। স্বকালে মানুষ স্ব-সৃষ্ট সমস্যার মধ্যেই বাঁচে এবং স্ব-স্বার্থে সমাধানপ্রয়াসই জীবনচেতনা-প্রসূত জীবন-ভাবনা ও জীবন প্রেরণার তথা ভাব-চিন্তা ও কর্মের প্রসূতি।

একাকীত্বের অভাব-অসহায়তা বিমোচনের জন্যে প্রাণী স্ব-শ্রেণীর সমাজ-সংলগ্ন এবং প্রাণিজগতের বিশেষ বিকাশের ফলে মানুষের সমাজ দায়িত্ব ও কর্তব্যবহুল, জটিল ও অনন্য। তাই প্রাণিজগতে মানুষের সমস্যা ও সমাধান বহু ও বিচিত্র এবং সদাবর্ধিষ্ণু। তার দেহ- মনের উৎকর্ষ তাকে করেছে কুশলী ও অপ্রাকৃত কৃত্রিম জীবন-পদ্ধতি রচনায় উদ্যোগী ও উৎসাহী। তারই ফলে স্ব-শ্রেণীর প্রাণীর মধ্যে তারা দ্বন্দ্বে-মিলনে, প্রীতি অসুয়ায়, সদ্ভাবে-সংঘাতে অসামান্য। দানে প্রতিদানে, লোভে-ত্যাগে, রাগে-বিরাগে, প্রীতি-ঘৃণায়, সহায়তায়-শত্রুতায়, উপকারে-অপকারে, আনুগত্যে-দ্রোহে, লাভে-ক্ষয়ে, সেবায়-বঞ্চনায়, আর কাড়াকাড়ি, মারামারি ও হানাহানিতে মানুষের ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক জীবন-প্রবাহ আজকের এই স্তরে রূপ নিয়েছে সবটাই হয়েছে আত্ম কল্যাণে ও শ্রেয়সের সন্ধিৎসায়।

আশ্চর্য, মানুষের কোনো পরিবর্তন কিংবা বিবর্তন আপসে ও আপ্‌সে হয়নি। চিরকাল একটি আঘাত, সংঘাত, উপপ্লব কিংবা বিপ্লব প্রয়োজন হয়েছে এবং তা ঘটেছে মড়ক-ঝঞ্ঝঞ্ঝা-প্লাবন-ভূমিকম্প-অগ্ন্যুৎপাত কিংবা জরু-জমি ঘটিত সংঘাতে অথবা সামাজিক-নৈতিক-শাস্ত্রিক বিসংবাদে বা লোভ-অসূয়াবশে বৃত্তচ্যুতির ফলে সংঘটিত সংঘর্ষ-সংগ্রাম-বিপ্লব-উপপ্লবের পরিণামে। আব্রাহাম-মুসা-গৌতম-মহাবীর ঈসা-মুহম্মদের আমল থেকে আজ অবধি মানুষের যাবতীয় কল্যাণ ও অগ্রগতি ঐ দ্বন্দ্ব সংঘাতপ্রসূত। সমস্যা ও যন্ত্রণা থেকেই জাগে মুক্তির প্রেরণা ও প্রয়াস। এজন্য সমস্যা ও যন্ত্রণা, সংঘর্ষ ও সংঘাত অভিশাপ নয়, অভিপ্রেত সুযোগ । কবির কথায় –

আমার এ ধূপ না পোড়ালে

গন্ধ কিছু নাহি ঢালে,

আমার এ দীপ না জ্বালালে

দেয় না কিছু আলো।

অতএব দুঃখ-বিপদ-সমস্যা, ক্ষয়ক্ষতি-যন্ত্রণাই মানব-প্রগতির প্রসূতি। তাই কবি বলেন—’আঘাত সে যে পরশ তব, সেই তো পুরস্কার’। এই পাপবিমোচনের জন্য দুনিয়ার বহু বহু নবী-অবতার-দেবতা-সম্রাট ছিলেন

লড়িয়ে রক্তক্ষরা সংগ্রামে নিরত। সে-যুদ্ধ ছিল হত্যার রূপকে সত্যাগ্রহ ও সত্যের উদ্বোধন। আব্রাহাম-মুসা-দাউদ-সোলায়মান-নূহ-লুৎ-হুদ-সালেহ-শোয়েব-ইন্দ্ৰ-কালী শিব-রাম-কৃষ্ণ প্রমুখের কৃতিত্বের অনেকখানি হচ্ছে প্রমূর্ত পাপরূপী নরদানব ও সমাজ বিনাশ-বিনষ্ট করা। সেই ধ্বংস দেখে কেবল নির্বোধই ভয় পেয়েছিল, পাপী-দানবই কেবল ত্রস্ত ও বিলুপ্ত হয়েছিল। প্রাজ্ঞরা জানত এ ‘প্রলয় নতুন সৃজন-বেদন’ এবং আসছে নবীন জীবনহারা অসুন্দরে করতে ছেদন। যুগে যুগে ঝঞ্ঝা-প্লাবন-মড়ক দ্রোহ-বিপ্লব-উপপ্লব-সংঘাত-সংঘর্ষ ও রক্তস্নানের মাধ্যমেই জন্ম নেয় নতুন ভাব-চিন্তা, মন-মনন, সমাজ-শাস্ত্র-রাষ্ট্র, রীতি-নীতি-আদর্শ, বিজ্ঞান-দর্শন-ইতিহাস। জেগে ওঠে নব-চেতনা, জন্ম নেয় নবমানবতা। মনুষ্য-সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং মনুষ্যত্বের বিকাশ যেখানে যতটুকু হয়েছে, তা হয়েছে এভাবেই।

 

সংঘাত প্রসূন - আহমদ শরীফ
সংঘাত প্রসূন – আহমদ শরীফ

 

য়ুরোপকেন্দ্রী আধুনিক দুনিয়ার ইতিহাস আমাদের এ ধারণাই সমর্থন করে। ইতিহাসের সাক্ষ্য থেকে পাই, নেদারল্যান্ডের মুক্তিসংগ্রাম, কৃষকবিদ্রোহ, Inquisition-এর বিরুদ্ধে Huss ও Luther-এর গণবিদ্রোহ তথ্য প্রোটেস্টান্ট মতবাদ, কপারনিকাস-গ্যালিলিও-র উচ্চারিত তথ্য ফরাসি বিপ্লব, নেপোলিওঁর দিগ্বিজয়, বিজ্ঞানবৃদ্ধি, দার্শনিক তত্ত্ব, শিল্পবিপ্লব, মার্কসবাদ প্রভৃতি বহুতর সমাজ, শাস্ত্র, রাষ্ট্র, মনন, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য প্রভৃতি সম্পর্কিত তত্ত্ব, তথ্য, আলোড়ন-আন্দোলন সংঘাত-সংঘর্ষ-বিবর্তন-পরিবর্তনই য়ুরোপ-প্রসূত ও প্রভাবিত আধুনিক বিশ্ব তৈরি করেছে।

আঠারো শতক থেকে বৈজ্ঞানিক আবিক্রিয়া দার্শনিক চিন্তাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করছে। আস্তিক্য-নাস্তিক্য এবং সংশয়বাদী ও হিতবাদী দর্শন বিজ্ঞানের প্রগতির সঙ্গে। মানসগতির যেমন সমতা রক্ষা করেছে, তেমনি কবি-সাহিত্যিকগণও মানব-মুক্তির দিশাসন্ধানী হয়েছেন। ভল্ট্যায়ার, গ্যেটে, ভিক্টর হুগো, টলস্টয়, রোমারোলা, ডস্টয়ভস্কি, এরিয়ারেমার্ক, টমাসম্যান প্রমুখ বহুতর মনীষী মানব-চিন্তায় যেমন প্রবৃদ্ধ, তেমনি মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-মাও-চেগুয়েভারা প্রভৃতিও লোকায়ত জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য বিধায়ক ও নতুন সমাজবাদের প্রয়োগ-প্রয়াসী সংগ্রামী। এই নতুন-পুরনো বীর-মনীষীরা সবাই বিপ্লব-উপপ্লবের সন্তান। সবাই দেখা দিয়েছেন উপসর্গ হিসেবে এবং পরিণামে প্রতিভাত হয়েছেন আশীর্বাদরূপে ।

এই শতাব্দীর সূর্য সংঘাত-সংগ্রামের মাধ্যমে নির্জিত-শোষিত মানুষের সর্বপ্রকার মুক্তির আশ্বাস ও বাণী নিয়েই হয়েছে উদিত। তাই আত্মপ্রত্যয় ও মুক্তি-প্রত্যাশা চেতনাকে করেছে চঞ্চল, প্রয়াসকে করেছে প্রবল। প্রথম মহাযুদ্ধের রক্ত-সাগরে জন্ম নিয়েছিল League of Nations, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দান United Nations’ Organisation, প্রথম মহাযুদ্ধের দান মার্কসীয় তত্ত্বের বাস্তব ও সার্থক রূপায়ণ। আফ্রো-এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার নির্জিত সমাজে নতুন চিন্তাচেতনার সূচনা, বলকান রাষ্ট্রগুলোর উদ্ভব, আফ্রো-এশিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করার স্পৃহার উন্মেষ, সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম ও যান্ত্রিক জীবনের বিকাশ।

 

আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature
আহমদ শরীফ, Ahmed Sharif, educationist, philosopher, critic, writer and scholar of medieval Bengali literature

 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দান আফ্রো-এশিয়ার জাতিগুলোর স্বাধীনতা অর্জন, চীনে কম্যুনিজমের প্রতিষ্ঠা, বলকান রাষ্ট্রগুলোসহ রাশিয়া-প্রভাবিত অঞ্চলসমূহে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, বলকান রাষ্ট্রগুলোসহ রাশিয়া-প্রভাবিত অঞ্চলসমূহে সমাজতন্ত্রের প্রসার ও যন্ত্র-জীবনের বিস্তার এবং ক্রুর ঔপনিবেশিক বর্বরতা ও স্থুল সাম্রাজ্যবাদের অবসান, মার্কসবাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ও পুঁজিবাদের প্রতি ঘৃণার প্রসার।

তৃতীয় মহাযুদ্ধ প্রয়োজন মানববাদের পূর্ণ স্বীকৃতির জন্যই। ছলনাময় বর্বরতা ও বঞ্চনার কবল থেকে বিশ্বমানবকে উদ্ধারের জন্যই তৃতীয় মহাযুদ্ধ আবশ্যিক। বৈনাশিক আঘাত-সংঘাতের বেদনা এবং ক্ষয়ক্ষতির অনুশোচনা ব্যতীত মনুষ্য-মন-মননের পরিবর্তন হয় না। তাই রক্তক্ষরা বেদনার প্রয়োজন, মর্মদাহী অনুশোচনা দরকার এবং দুটোই মেলে রক্তসাগরে ও জ্বলন্ত লাভাস্রোতে। ইতিহাসের সাক্ষ্যে গুরুত্ব দিলে শান্তি কপোতেরাও তা স্বীকার করবেন।

একদিন মধ্যএশিয়ায় জনবহুলতার শিকার মানুষেরা নগ্ন তরবারি হাতে তুরঙ্গসোয়ার হয়ে বিজয়ীর বেশে চারদিককার পররাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আত্মরক্ষা ও আত্মবিস্তার করেছে। বলা চলে পররক্ত পান করেই তারা নিজেদের প্রাণরস সংগ্রহ করেছে। ষোলো শতকের জনবহুল য়ুরোপ নতুন নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার করে জনসংখ্যার বৃদ্ধি প্রসূত সমস্যার সমাধান পেয়েছে। সেই বর্বরতার যুগ আর নেই যে, তেমনি বুনো পদ্ধতিতে আজকে মানবিক সমস্যার সমাধান মিলবে। আজ সমস্বার্থে, সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের অঙ্গীকারে সহযোগিতার মাধ্যমেই মানুষকে বাঁচতে হবে নহিলে নাহিরে পরিত্রাণ।’ নীতিকথায়, তত্ত্বচিন্তায় প্রীতি-মৈত্রী-করুণার আবেদনে সাড়া দিয়ে কেউ যে মানবকল্যাণে ক্ষতি স্বীকারে রাজি হবে, তেমন প্রত্যাশা সাধারণত বিড়ম্বিত হয়।

আমাদের ধারণা, আজকের এশিয়ার অপ্রতিরোধ্য জনসংখ্যা বৃদ্ধিপ্রসূত অসমাধ্য সমস্যার প্রতিকার রয়েছে তৃতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সম্ভাব্য তীব্র-তীক্ষ্ণ মানববাদী-চেতনায়। যে-চেতনা বিস্তৃত ভুবনে আনুপাতিকহারে জনবিন্যাসে ও খাদ্য বণ্টনে আপত্তি তুলবে না, জাত-জন্ম-বর্ণ-ধর্মের দ্বিধা-বাধা অতিক্রম করে মানুষকে। কেবল মানুষ হিসাবেই গ্রহণ করতে প্রবর্তনা দেবে! বাঁচার গরজই আমাদের এই স্বপ্নকে বাস্তব, এই সাধকে সাধ্যায়ত্ত করতেই হবে। অন্তত বাঁচার শেষ-প্রয়াস এ পথেই চালিত করতে হবে। সর্বপ্রকার তাৎপর্যেই জীবন মানে চলমানতা এবং পাথেয় সন্ধানের ও সঞ্চয়ের সংগ্রাম। কে না জানে, জীবন জয়ীরই ভোগ্য এবং জিতের পরিণাম মৃত্যু! জীবনের জন্যই জয় প্রয়োজন। তাই প্রাণীমাত্রই জিগীষু! আমরাও প্রত্যাশা নিয়ে বাঁচব। শতাব্দীর সূর্য আমাদের সে-প্রত্যাশাই জাগায়।

 

[ সংঘাত প্রসূন – আহমদ শরীফ ]

 

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন