সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প : এক রাজার ছিল মাত্র এক কন্যা। নাম তার সাবিত্রী। কন্যা দিনি দিনি বড় অয়ে ওঠে। একদিন রাজা সাবিত্রীকে ডাকে কলো, মা, তুমি বড় অয়ছো। এইবার তোমার বিয়ের আয়োজন করি। সাবিত্রী কলো, ঠিক আছে বাবা তুমি স্বয়ম্বর সভার আয়োজন কর।

 

সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা
স্বয়ম্বর সভা

 

রাজা তহন সমস্ত রাজ্যে ঘোষণা দিয়ে দিলো যে তার মেয়ে সাবিত্রীর স্বয়ম্বর সভা অবে। যথাদিনি শত শত রাজপুত্র আসে রাজার সভাগৃহে স্থান করে নিলো। যহন বিভিন্ন রাজ্যের রাজপুত্ররা স্বয়ম্বর সভায় যোগ দিতি আসতিছিলো তহন রাস্তার পাশে কাঠ কাটতিলো সত্যবান। সত্যবান তারগে কাছে জিজ্ঞাসা কোললো- তোমরা সবাই কনে যাচ্ছো।

রাজপুত্ররা কয়ছে সাবিত্রীকে লাভ কোততে। সাবিত্রীকে পালি অর্ধেক রাজ্য পাব আর রাজকন্যাও পাব। তহন সত্যবান কয় তালি আমিও যাই দ্যাহে আসি স্বয়ম্বর সভা ক্যারাম করে অয়। সত্যবান তহন কাঠ কাটা কুড়োল হাতে নিয়ে হাজির অলো রাজপ্রাসাদে। প্রহরীরা তারে ঢুকতি দিতি চায় না। সত্যবান কয় আমি সবার শেষে, সবার পিছনে থাকপ চুপ করে। আমারে যাতি দ্যাও।

তহন প্রহরীরা কয়, সত্যবান ভাল ছেলে, সৎ ছেলে ও সত্য কথা কয়, ওরে যাতি দ্যাও। সত্যবান তহন ধীরে ধীরে আসে দাঁড়াল সবার পিছনে। আসে সে দেখতি পালো, শত শত রাজকুমার সোনার মুকুট পরে বসে আছে, তারগে গায় দামী দামী পোশাক। কিছুক্ষণ পরে শুরু অলো স্বয়ম্বর সভা। রাজকন্যা সাবিত্রী তার পিতাকে প্রণাম করে মালা হাতে প্রবেশ কোললো। হাতে তার মালা।

ঐ মালা সে যার গলায় পরাবে, সে তার স্বামী। আর এই রাজ্যের অর্ধেক রাজত্ব তার। রাজকন্যা সাবিত্রী ধীরে ধীরে একজন দুজন রাজকুমারকে পিছনে ফ্যালে আগোইয়ে যাতে থাহে। আর নামীদামী রাজকুমাররা ভাবে সাবিত্রীতো আমাগে পিছনে ক্যালে চলে গেল। তবে কারে সে বরণ করে নেবে? কারে সে বরমাল্য পরাবে?

 

সাবিত্রী ও সত্যবানের গল্প 1 সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

সাবিত্রী আস্তে আস্তে যায় আগোইয়ে। রাজা ভাবে মাইয়ে সাবিত্রীতো প্রায় সবাইকে পিছনে ফেলে চলে গেল। তবে কি এবারও তার বিয়ে অবে না। এদিকি সাবিত্রী রাজকুমারগে ছাড়াইয়ে চলে আসলো। সবাই ভাবে তবে কি রাজকন্যার কাউরে পচ্ছন্দ অলো না। হঠাৎ সভাগৃহে সবাই চমকে উঠল। সাবিত্রী হাঁটতি হাঁটতি আসে সবার পিছনে ও সবার শেষে কুড়োল হাতে দাঁড়াইয়ে থাহা সত্যবানের গলায় পরাইয়ে দিল বরমাল্য।

 

[ সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা ]

 

আর সভাগৃহের রাজকুমাররা অবাক অয়ে ছি! ছি! কোততি থাকল। সত্যবান কিছুই বুঝে উঠতি পাললো না। তহন রাজা আসে কলো, মা সাবিত্রী এই সামান্য কাঠুরেকে তুমি বরণ কললে, তবে তুমি যারে স্বামী হিসেবে বরণ করেছো, আমি তাই মানে নেব।

সত্যবানকে আমি আমার অর্ধেক রাজত্ব দান করবো। তহন সত্যবান কয়ছে আমি রাজত্ব চাইনে, সাবিত্রীকে পায়েই আমি ধন্য। স্বামীর কতা শুনে সাবিত্রীর হৃদয়ও গর্বে ভরে উঠলো। সত্যবান তহন সাবিত্রীকে নিয়ে জঙ্গলমাঝে তার কুটিরে আসে উপস্থিত অলো।

সাবিত্রী ও সত্যবানের গল্প 2 সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

সত্যবান সমস্তদিন বনে কাঠ কাটে। সেই কাঠ বাজারে বিক্রি করে চাল ডাল কিনে নিয়ে কুটিরে আসে। আর সাবিত্রী তা রান্না করে প্রথমে অন্ধ শ্বহুরকে খাওয়ায়। তারপর তারা দুইজনে খায়। এবং খাবা শেষে পরিশ্রান্ত স্বামীর সেবা করে। এমনি করে দিন যায়। সত্যবানের ঘরে সাবিত্রী সুহি শান্তিতি বসবাস কোততি থাহে।

একদিন সাবিত্রী সত্যবানের কাছে বায়না ধলল, কলো আমি তোমার সাথে বনে যাব কাঠ কাটতি। সত্যবান কলো, বুনোপথে তোমার যাতি কষ্ট অবে। সাবিত্রী কলো, তবুও আমি যাব। অবশেষে সত্যবান সাবিত্রীরে নিয়ে জঙ্গলমাঝে যায় কাঠ কাটতি। সত্যবান কুড়োেল দিয়ে কাটে চলে গাছের ডাল। রোদে পুড়ে তার শরীরেরতে দর দর করে ঘাম ঝোততি থাহে। আর সাবিত্রী স্বামীর দিকি তাকাইয়ে থাহে।

একসময় সত্যবান কাঠ কাটা থামাইয়ে সাবিত্রীরে আসে কলো, জল পিপাসা লাগেছে, আমি ক্লান্ত, জল খাইয়ে একটু বিশ্রাম নেব। সাবিত্রী তহন স্বামীরে জল খাতি দিয়ে শাড়ির আঁচল পাতে দিয়ে কলো, আমার কোলে মাথা রাখে এটটু বিশ্রাম ন্যাও। সত্যবান স্ত্রীর আঁচলে শুয়ে তার কোলে মাথা রাখল, আর সাবিত্রী অন্য আঁচল দিয়ে স্বামীকে বাতাস কোততি থাহে।

আস্তে আস্তে হঠাৎ তহন সত্যবান সাবিত্রীর কোলে ঘোম পড়ে পড়ল। অনেক বেলা গড়ায়ে গেল। সাবিত্রী ভাবে যে তার স্বামী আরও এটটু বিশ্রাম নিক। এমনি করে দিন গড়াইয়ে বিকাল অলো, বিকাল গড়াইয়ে সন্ধে। তবু সে স্বামীকে ডাকলো না, ভাবলো, আরও একটু ঘোম পড়ে নিক।

সাবিত্রী ও সত্যবানের গল্প 4 সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

এমন সময় হঠাৎ সাবিত্রীর সামনে আসে দাঁড়ালো বিশাল এক লোক। রঙ তার শ্যামবর্ণ। বড় বড় চোখ। সাবিত্রী তারে দেইহে কলো কে তুমি? কি চাও তুমি? লোকটি কলো আমি যমরাজ, সত্যবানের মৃত্যু অয়ছে। আমি তারে নিতি আইছি। সাবিত্রী কলো আমার স্বামীর সাথে আমিও যাব। যমরাজ কলো, সেডা অয়না। আমি সত্যবানরে নিয়ে চললাম।

সাবিত্রী যমরাজের পিছনে পিছনে চললো। যমরাজ কলো, দেহ সাবিত্রী তুমি ফিরে যাও। সাবিত্রী কলো, না আমি ফিরে যাব না। সাবিত্রী আবারও চললো যমরাজের পিছনে পিছনে। তহন যমরাজ কলো, সাবিত্রী তুমি কি চাও? তোমার স্বামীরে ফিরে পাওয়া ছাড়া। সাবিত্রী কলো, আমার শ্বহুরের অন্ধ চোখ ভালো চাই। যমরাজ কলো, তবে তাই অবে, তুমি ফিরে যাও। কিন্তু সাবিত্রী তহনও চলতি থাহে যমরাজের পিছনে পিছনে।

 

সাবিত্রী ও সত্যবানের গল্প 3 সাবিত্রী-সত্যবানের গল্প - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

তহন যমরাজ কয়, তুমি আবার যে বর চাও তাই পাবা, তুমি ফিরে যাও। সাবিত্রী কলো রাজ্যের যত অনাহারী মানুষ আছে, সবাই যানো খাতে পায়, সবার যানো থাকার আশ্রয় জোটে। যমরাজ কলো তাই অবে। তারপরও সাবিত্রী হাটতি থাহে যমরাজের পিছনে। যমরাজ কয়, তোমারে আবারও কোচছি তুমি ফিরে যাও, শেষবারের মতো কও, তুমি কি চাও?

সাবিত্রী কলো, আমি সন্তানের জননী হতি চাই। যমরাজ কলো, তাই অবে, তুমি ফিরে যাও। তহন সাবিত্রী হাসে কলো, যমরাজ, আমার স্বামীরে আপনি নিয়ে গ্যালি আমি মা অবো কি করে। আমার স্বামীরে তুমি ফিরেইয়ে দিয়ে তোমার কথা রক্ষা কর। তহন যমরাজ হাসে কলো, তোমার মতো সতী সাবিত্রীর কাছে আজ আমিও হারে গেলাম। এই নাও তোমার স্বামীরে।

তহন সাবিত্রী ও সত্যবান ফিরে আসলো তারগে ঘরে। আসে দ্যাহে তার শ্বহুরির চোখ ভালো অয়ে গেছে। রাজ্যের যতো অনাহারী মানুষ সবাই খেতে পাচ্ছে। সাবিত্রী-সত্যবান সুখে-শান্তিতে দিন পার করতে থাকলো।

আরও পড়ুন:

খুলনা জেলার কিংবদন্তি, যত সব আশ্চর্য ঘটনা

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন