হাটকুঁড়ো রাজা ও তিন রানি – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

This post is also available in: বাংলাদেশ

হাটকুঁড়ো রাজা ও তিন রানি : রাজার ছিলো তিন রানি। বিরাট রাজ্যের রাজার ছিলো অঢেল সম্পদ। কিন্তু রাজা ছিলো হাটকুঁড়ে। সবাই শুধু রাজাকে হাটকুঁড়ে কয়ে গালমন্দ কোততো। রাজা মনের দুহি কোথাও বার অতো না। রাজ্যের যত কাজ তা সব মন্ত্রী কোটালরা কোততো।

একদিন রাজমহলের ভারি লম্বা লম্বা চুল-দাড়িওয়ালা এক সন্ন্যাসী আসলো। আসে কলো, আমার দেওয়া এই পাতা বাটে খালি রাজার সন্তান অবে। তবে একটি শর্ত আছে। সন্তানদের যেদিন বার বৎসর পূর্ণ অবে সেইদিন ছোড় সন্তানকে আমার কাছে দিয়ে দিতি অবে। রাজা তহন ভাবে পায় না কি করবে। অবশেষে রাজা সন্ন্যাসীর কথায় রাজি অলো।

 

হাটকুঁড়ো রাজা ও তিন রানি - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

সন্ন্যাসী রানিদের তিনটি পাতা দিয়ে বললো, এই পাতা তিনটি বেটে তোমরা নদী থেকে স্নান করে এসে সবাই খাবে, তবেই তোমাদের সন্তান হবে।

তিনরানি তখন নদীতে গেলো স্নান করতে। কাখে তাদের কলসি। বড় রানি ও মেজ রানি ছিল খুব চালাক। তারা পথিমধ্যে ইচ্ছা করে কলসি ভেঙে ফেলে বললো, ইস, ভেঙে গেলো। তখন তারা নদীতে গিয়ে স্নান করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। ছোড়রানি কলসিতে জল ভরে কলসি নিয়ে পিছিয়ে পড়লো। তখন ছোড়রানি বললে, দিদি তোমরা যেতে থাকো আমি আসছি।

তখন বড়রানি ও মেজরানি ছোডরানিকে রেখে রাজমহলে ফিরে এসে বেটে রাখা পাতার সবটুকু খেয়ে ফেললো। ছোডরানির জন্য একটুও রাখলো না। ছোডরানি ফিরে এসে দেখে কোথাও পাতাবাটা নেই। দিদিদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বললো, ইস! আমাদের একটুও মনে নেই। কি করবি। সিল-নোড়ায় হয়ত একটু লাগানো আছে। ওগুলো ধুয়ে তুই জল খা কিছু হলে হতে পারে।

[ হাটকুঁড়ো রাজা ও তিন রানি – খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা ]

ছোড়রানি তখন মনের দুঃখে সিল-নোড়া ধুয়ে জল খেল। দিন যায় তিন রানি সন্তান সম্ভবা হয়ে ওঠে। দশ মাস দশদিন পর তিন রানি তিন ছেলে সন্তান প্রসব করলো। বড় দুই রানি ভেবেছিল, ছোডরানির সন্তান হয়তো ভালো হবে না। সেতো পাতাবাটা খেতে পারেনি। কিন্তু দেখা গেলো ছোড়রানির সন্তানই সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে। রাজ্যের চারিদিকে ধন্য ধন্য রব পড়ে গেলো।

রাজার তিন সন্তান ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। তারা পাঠশালায় যায়। সবাই সন্ন্যাসীর কথা ভুলে যায়। আস্তে আস্তে বার বছর পূর্ণ হতে চললো। যথাদিনে সন্ন্যাসী এসে হাজির হলো। এসে বললো, ছোড়রানির ছোট ছেলেকে আমাকে দিয়ে দাও। সবাই তখন কাঁদতে থাকে। ছোটছেলে তখন তার মাকে বললো, মা আমাকে হাসিমুখে বিদায় দাও। আমি কথা দিচ্ছি তোমার কাছে আবার ফিরে আসবো। ছোট রাজাকুমার তখন সন্ন্যাসীর সাথে চললো।

রুপকথা রাজকুমারী হাটকুঁড়ো রাজা ও তিন রানি - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

সন্ন্যাসী রাজকুমারকে নিয়ে গভীর জঙ্গলে হাজির হলো। রাজকুমারকে ঘরে বন্দী রেখে সন্ন্যাসী গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়। অধিক রাতে একটি মেয়ে এসে রাজকুমারকে খেতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার বাড়ি কোথায়, তোমার পরিচয় কি? রাজকুমার তখন সব খুলে বললো। মেয়েটি বললো, অমাবস্যার রাতে তোমাকে বলি দিয়ে সে শত শিশুর বলি পূর্ণ করবে এবং অমরিবর লাভ করবে।

রাজকুমার বললো, তাকে হত্যা করার কোনো উপায় আছে? মেয়েটি বললো, একটি উপায় আছে। অমাবস্যার রাতে সে যখন তোমায় বলি দিতে যাবে তখন তোমাকে মালা গলায় প্রণাম করতে হবে। তখন তুমি বলবে আমি রাজার ছেলে কোনো দিন প্রণাম করা শিখি নাই। আমাকে প্রণাম করা দেখিয়ে দাও। আর বলবে আমার একটু ইচ্ছা তোমার হাতের আংটিটা পরবো। কারণ ঐ আংটিটা তার হাতে থাকলে তার মরণ হবে না।

মেয়েটির কথামতো অমাবস্যার রাতে সন্ন্যাসী রাজকুমারের গলায় জবাফুলের মালা পরিয়ে দিয়ে বললো তোমার কোনো ইচ্ছা থাকলে বলো। রাজকুমার বললো, তোমার হাতের আংটিটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ওটা আমি একটু পরবো। সন্ন্যাসী তার হাতের আংটিটা রাজকুমারের হাতে পরিয়ে দিয়ে বললো, পূর্বদিকে প্রণাম কর।

রাজকুমার বললো, আমি রাজার ছেলে কোনো দিন প্রণাম করা শিখি নাই। আমাকে তুমি দেখিয়ে দাও কিভাবে প্রণাম করতে হয়। সন্ন্যাসী তখন গড় হয়ে প্রণাম করে রাজকুমারকে বলতে লাগল দেখে নাও এইভাবে প্রণাম করতে হয়। অমনি রাজকুমার খড়গ তুলে সন্ন্যাসীকে হত্যা করলো। সন্ন্যাসীকে হত্যা করে সে মেয়েটিকে তার বাড়িতে পৌছে দিয়ে পথ চলতে থাকলো।

হাতে তার সন্ন্যাসীর আংটি, এই আংটিকে সে যা বলবে তাই হবে। রাজকুমার বললো, আংটি, তুমি এখন কার? আংটি বললো, এখন আমি তোমার। রাজকুমার বললো, তবে আমি যা বলবো তুমি তাই করবে। রাজকুমার হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের বাইরে আসলো।

রুপকথা 2 হাটকুঁড়ো রাজা ও তিন রানি - খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় লোকগল্প, লোককাহিনী, কিসসা, রূপকথা, উপকথা

 

সে তার রাজ্য চেনে না। পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেল এক রাজ্যের রাজার সাতকন্যা পাঠশালায় যাচ্ছে। তখন রাজকুমার আংটিকে বললো, আংটি তুমি আমাকে মুমূর্ষু কুকুরের বাচ্চা বানিয়ে দাও। যে কথা অমনি কাজ। রাজকুমার মুমূর্ষু কুকুরের বাচ্চা হয়ে পথের মাঝখানে পড়ে রইল।

সাতকন্যারা পথের মাঝখানে কুকুরের বাচ্চাটাকে লাথি মেরে মেরে হাসতে হাসতে আনন্দ করতে করতে যেতে লাগল। সবার শেষে ছোট রাজকন্যা এসে কুকুরের বাচ্চাটিকে তুলে নিয়ে আদর করে রাস্তার একপাশে সরিয়ে রাখলো। তাই দেখে তার বড় দিদিরা হাসাহাসি করে।

পরের দিন ঠিক একই সময়ে রাজকুমার আংটিকে বললো, আংটি তুমি আমাকে অসুস্থ কুষ্ঠরোগী বানিয়ে দাও। রাজকুমার তখন কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত হয়ে রাস্তার মাঝে পড়ে রইল। তার সমস্ত শরীরে ঘা পুজ। এমন সময় রাজকুমারীরা সেই পথে আসলো। বড় ছয় বোনেরা অসুস্থ রাজকুমারকে ডিঙিয়ে সামনে চলে গেলো। আর ছোট রাজকুমারী রাজকুমারকে ডিঙিয়ে না গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে তার মুখে জল দিতে গেলো।

জল দেয়ার সময় তার গলার ওড়না অসুস্থ রাজকুমারের গলায় গিয়ে পড়লো। অমনি বড় ছয় বোন হাত তালি দিয়ে বললো যে, তোর বিয়ে হয়ে গেছে ওর সঙ্গে। তখন ছোটবোন নিরূপায় হয়ে রাজকুমারকে সঙ্গে নিয়ে রাজমহলে ফিরে আসলো। বড় ছয়বোন এসে রাজাকে বললো, ছোটবোন রাস্তার এক অসুস্থ কুষ্ঠরোগীকে বিয়ে করেছে। রাজা তখন বলল, আমি তাকে দেখব।

অসুস্থ রাজকুমারকে ছোট রাজকুমারীর ঘরে রাখা হলো। রাজা ঘরে এসে ঢুকলেন। এবং রাজকুমারকে দেখেই তিনি বিস্মিত হয়ে গেলেন। তহন রাজকুমার তার পরিচয় দিয়ে সব খুলে কলো, আমি আমার রাজ্য চিনিনে। তহন রাজা তার ছোট মাইয়ের সাথে রাজকুমারের বিয়ে দিয়ে ঢাক ঢোল বাদ্যি বাঁজাইয়ে রাজকুমারকে তার রাজ্যে পাঠাইয়ে দিলো। রাজকুমার ছোটরাজকুমারীকে বিয়ে করে পিতা-মাতার কাছে ফিরে আসে শান্তিতি বসবাস কোততে থাকলো।

আরও পড়ুন:

This post is also available in: বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন